পণ্য খালাসে ১৩ দিন, বিল অব এন্ট্রিতেই ৭ দিন

চট্টগ্রাম বন্দর

চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ পৌঁছানোর পর আমদানি পণ্য খালাস করে বন্দর থেকে বের করতে গড়ে ১৩ দিন সময় লাগছে। এর মধ্যে ইমপোর্ট জেনারেল ম্যানিফেস্ট (আইজিএম) থেকে বিল অব এন্ট্রি বা আগামপত্র দাখিল করতেই সময় লাগছে গড়ে ৭ দিন ৯ ঘণ্টা। অথচ কাস্টমস আইন অনুযায়ী, বন্দরে পণ্য পৌঁছানোর পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে বিল অব এন্ট্রি দাখিল করার বিধান রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এ প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় আমদানি পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) উদ্যোগে চলতি বছরের এপ্রিলে পরিচালিত ‘বর্ডার ক্লিয়ারেন্স টাইম’ শীর্ষক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে।

আইজিএম বা ম্যানিফেস্ট হলো জাহাজে থাকা পণ্যের প্রাথমিক তথ্য বিবরণী। জাহাজ বন্দরে আসার আগে বা পৌঁছার পর পরই কোন আমদানিকারকের কী পণ্য, কী পরিমাণ পণ্য রয়েছে—এসব তথ্য অনলাইনে কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে জমা দেয় আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলো। এরপর আমদানিকারক বা তার মনোনীত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট পণ্য খালাসের জন্য কাস্টমসের কাছে বিল অব এন্ট্রি দাখিল করে।

এনবিআরের গবেষণায় ৩ হাজার ১৯১টি বিল অব এন্ট্রির তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। বিবেচনায় নেয়া হয় খাদ্যপণ্য, মেশিনারিজ ও কমার্শিয়াল গুডস—এ তিন ক্যাটাগরির পণ্যের খালাস প্রক্রিয়াকে। তাতে দেখা যায়, আইজিএম থেকে আগামপত্র দাখিল করতেই চলে যায় গড়ে ৭ দিন ৯ ঘণ্টা। আগামপত্র দাখিল থেকে শুল্কায়ন পর্যন্ত গড়ে সময় লাগছে দুদিন। এরপর রাজস্ব পরিশোধ থেকে এক্সিট নোট পেতে সময় লাগে গড়ে ১ দিন ২ ঘণ্টা। এক্সিট নোট পাওয়ার পর বন্দর থেকে পণ্য খালাস নিতে আরো ২১ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট সময় লাগছে। অর্থাৎ আইজিএম দাখিল থেকে পণ্য বন্দর থেকে বের হওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে দীর্ঘ সময় ব্যয় হচ্ছে। আর এসব কাজে আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ম্যানিফেস্ট দাখিলের পরও প্রয়োজনীয় নথি হাতে পেতে দেরি হওয়াই বিল অব এন্ট্রি দাখিলে দীর্ঘ সময় লাগার অন্যতম কারণ। বিশেষ করে বিল অব লেডিং, ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্টসহ আমদানি-সংক্রান্ত বিভিন্ন নথি ব্যাংক থেকে পাওয়ার পর তা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের কাছে পাঠানো হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ম্যানিফেস্টে সংশোধনের প্রয়োজন হলে প্রক্রিয়াটি আরো দীর্ঘ হয়।

প্রিমিয়ার সিমেন্ট পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক বলেন, ‘ম্যানিফেস্ট সাবমিশনের পরও বিল অব লেডিং, ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্টসহ অন্যান্য ডকুমেন্ট ব্যাংক থেকে পেতে হয়। এসব নথি হাতে পাওয়ার পর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টকে পাঠানো সম্ভব হয়। ফলে ম্যানিফেস্ট সাবমিশন হয়ে গেলেও ব্যাংক থেকে ডকুমেন্ট পেতে দেরি হওয়ায় বিল অব এন্ট্রি দাখিলে সময় লাগে।’ তিনি বলেন, ‘কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইজিএম সাবমিশনে সংশোধনের প্রয়োজন হয়। আবার শিপিং এজেন্ট ম্যানিফেস্ট দাখিল করলেও কাস্টমসের রেজিস্ট্রেশনে সময়ক্ষেপণ হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আরো শক্তিশালী অনলাইন ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।’

সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের প্রয়োজনীয় নথিপত্র পেতেই অনেক সময় লেগে যায় বলে জানান আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে যুক্ত ব্যবসায়ী ও পোর্ট সার্ভ ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী খায়রুল আলম সুজন। তিনি বলেন, ‘শুক্র ও শনিবার কাস্টমসের আমদানি কনটেইনারের শুল্কায়নসংক্রান্ত কার্যক্রম বন্ধ থাকে। একই সময়ে এলসি খোলার ব্যাংকের নিয়মিত কার্যক্রমও বন্ধ থাকে। ফলে এসব দিনে বিল অব লেডিং যাচাই করা সম্ভব হয় না এবং সিঅ্যান্ডএফের পক্ষ থেকেও বিল অব এন্ট্রি দাখিল করা হয় না।’ খায়রুল আলম আরও বলেন, ‘অন্যান্য দিনেও ব্যাংক প্রক্রিয়া শেষ করে যেদিন নথিপত্র হস্তান্তর করে, তার একদিন পর চট্টগ্রামের বাইরের আমদানিকারকের প্রতিনিধি সেটি হাতে পান। এভাবে প্রায় দেড় দিন সময় লেগে যায়। তবে ম্যানিফেস্ট জমা দেওয়া থেকে বিল অব এন্ট্রি দাখিলের সময় তিন দিনের মধ্যে নামিয়ে আনা সম্ভব, যদি বাধ্যতামূলক পরীক্ষা না পড়ে। তাহলে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট যেদিন নথিপত্র হাতে পাবেন, চাইলে পরদিনই পণ্য ডেলিভারি নিতে পারবেন।’

এনবিআরের ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তা বলেন, কাস্টমস আইনে বন্দরে পণ্য অবতরণের পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে বিল অব এন্ট্রি দাখিলের বিধান থাকলেও বাস্তবে তা যথাযথভাবে পরিপালন হচ্ছে না। দ্রুত পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে যেসব দেশের উদাহরণ দেয়া হয়, সেসব দেশে কনটেইনার বন্দরে পৌঁছার আগেই প্রয়োজনীয় তথ্য ইলেকট্রনিকভাবে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে যায়। বাংলাদেশেও এ ব্যবস্থা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা গেলে রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট ও অন্যান্য ক্লিয়ারেন্স-সংক্রান্ত কার্যক্রম কাস্টমস কর্মকর্তারা আগেই সম্পন্ন করতে পারতেন। তাই প্রি-অ্যারাইভাল প্রসেস শতভাগ বাস্তবায়ন করা জরুরি।

এ ছাড়া অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এপিআই ইন্টিগ্রেশনের মাধ্যমে আমদানিকারকের এলসি ও ইনভয়েসের তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ড্যাশবোর্ড থেকে সরাসরি যাচাই করা যাচ্ছে। তবে শুল্কায়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দলিল পুরোপুরি ডিজিটালাইজড না হওয়ায় পুরো শুল্কায়ন ও খালাস প্রক্রিয়াকে এন্ড-টু-এন্ড অটোমেটেড করা সম্ভব হচ্ছে না। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দলিলও ডিজিটাল মাধ্যমে পাওয়া গেলে এবং সিস্টেমের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই করা সম্ভব হলে আমদানিকারকের দাখিল করা তথ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্রস-ভেরিফিকেশন করা যাবে। এতে শুল্কায়ন প্রক্রিয়ায় কাগজপত্রের ওপর নির্ভরতা ও ম্যানুয়াল যাচাই অনেকটাই কমে আসবে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের কমিশনার মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘একটি আমদানি চালানের খালাসকে শুধু কাস্টমসের কার্যক্রম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ম্যানিফেস্ট থেকে পণ্য ডেলিভারি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় একাধিক সংস্থার কার্যক্রম পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। কোথাও নথি প্রস্তুত ও দাখিল, কোথাও মূল্যায়ন, কোথাও সরকারি ছাড়পত্র, আবার কোথাও অর্থ পরিশোধ ও বন্দর থেকে পণ্য সরিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়া রয়েছে। এসব ধাপের সমন্বিত কার্যক্রমই শেষ পর্যন্ত মোট সময়কে দীর্ঘ করছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘জাহাজ বন্দরে পৌঁছার পর কাস্টমসে পণ্যের আইজিএম বা ম্যানিফেস্ট জমা দিলেই পণ্যটির আগমন আনুষ্ঠানিকভাবে রেকর্ড হয়। এর আগে কাস্টমসের পক্ষ থেকে কার্যক্রম শুরু করার সুযোগ নেই।’