ঋণখেলাপি অ্যাপোলো ইস্পাত এখন পুঁজিবাজারের বোঝা

একসময় ঢেউটিনের বাজারে পরিচিত ব্র্যান্ড ছিল ‘রানি মার্কা ঢেউটিন’। এই ব্র্যান্ডের মাধ্যমে দেশের বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিল অ্যাপোলো ইস্পাত কমপ্লেক্স লিমিটেড। তবে সময়ের সঙ্গে সেই অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। একদিকে ঋণের চাপ, অন্যদিকে উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকও কাজে লাগাতে না পারায় ধীরে ধীরে আর্থিক সংকটে পড়ে কোম্পানিটি। একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায় উৎপাদন, প্রতিষ্ঠানটি হয়ে পড়ে ঋণখেলাপি। বিপুল ঋণের বোঝা নিয়ে বর্তমানে পুঁজিবাজারের জন্যও দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে অ্যাপোলো ইস্পাত।

অ্যাপোলো ইস্পাতের যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৭ সালে। প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান ছিলেন সিটি ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান দীন মোহাম্মদ। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বিমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সিকিউরিটিজ, টেক্সটাইল ও পোশাক খাতে একাধিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন তিনি। যাত্রা ‍শুরুর সময় অ্যাপোলো ইস্পাতের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন মো. আনসার আলী। তিনিও ষাটের দশক থেকেই আমেরিকা, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া থেকে জিপি ও সিআই শিট আমদানি করে দেশে টিনের ব্যবসা করে আসছিলেন। এই দুজনের নেতৃত্বে অ্যাপোলো হয়ে উঠে ইস্পাত খাতের বৃহৎ প্রতিষ্ঠান।

১৯৯৪ সালে ঢাকার তেজগাঁওয়ে জাপানি প্রযুক্তিতে ‘অ্যাপোলো স্টিল মিলস’ নামে করোগেটেড আয়রন বা সিআই শিটের কারখানা স্থাপন করে অ্যাপোলো ইস্পাত। সেখান থেকে উৎপাদিত ঢেউটিনই ‘রানি মার্কা’ নামে বাজারে জনপ্রিয়তা পায়। চাহিদা বাড়ায় ১৯৯৪ সালে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইলে আধুনিক কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৯৭ সালের জুলাইয়ে প্রথম কন্টিনিউয়াস গ্যালভানাইজিং লাইন (সিজিএল) দিয়ে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়। ২০০২ সালে দ্বিতীয় সিজিএল এবং ২০০৫ সালের জানুয়ারিতে আমদানিনির্ভরতা কমাতে কোল্ড রোলিং (সিআরএম) ইউনিট চালু করে প্রতিষ্ঠানটি।

ঋণের ভার নিয়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভু্ক্তি

২০১০ সালের ৩০ মার্চ পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয় অ্যাপোলো ইস্পাত। এর আগেই প্রতিষ্ঠানটির ঘাড়ে জমেছিল বিপুল ঋণের বোঝা। তালিকাভুক্তির আগের কয়েক বছরের আর্থিক হিসাব বলছে, ব্যবসার পরিধি বাড়লেও সেই প্রবৃদ্ধির বড় ভিত্তি ছিল ঋণ। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ২৬০ কোটি টাকা টার্নওভারের বিপরীতে কোম্পানিটি ২০ কোটি ১৫ লাখ টাকা লোকসান করে। ওই বছর দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩১৫ কোটি ৭ লাখ টাকা, বিপরীতে শেয়ারহোল্ডারদের ইকুইটি ছিল মাত্র ১৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ ইকুইটির তুলনায় ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২১ গুণ। ২০০৯-১০ হিসাববছরে ৪৫ কোটি ৬৯ লাখ এবং ২০১০-১১ সালে ৩৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা সুদ পরিশোধের তথ্য পাওয়া যায়। কোম্পানিটির নগদ প্রবাহের চিত্রও ছিল উদ্বেগজনক। ২০০৭-০৮ থেকে ২০১০-১১ পর্যন্ত টানা চার বছর পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহ ছিল ঋণাত্মক। অর্থাৎ হিসাবের খাতায় মুনাফা থাকলেও সেই অনুপাতে নগদ অর্থ আসছিল না। ফলে ব্যবসা পরিচালনায় নতুন ঋণের ওপর নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছিল।

প্রসপেক্টাসের তথ্য যাচাই করে দেখা যায়, ২০১২-১৩ হিসাববছরে কোম্পানির ৫০৬ কোটি রেভিনিউয়ের বিপরীতে নিট মুনাফা ছিল ৩৬ কোটি টাকা। আর মোট দায় ছিল ৪২৮ কোটি টাকা। শেয়ারপ্রতি আয় ২ টাকা ৪২ পয়সা। পরিশোধিত মূলধন ১৫০ কোটি ও মোট ইকুইটি ৩৭৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এমন অবস্থায় কোম্পানিটি ২০১৩ সালের ১৫ নভেম্বর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে এবং ১৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের লেনদেন শুরু হয় ওই বছরের ২৪ ডিসেম্বর। প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে ২২০ কোটি টাকা উত্তোলন করে অ্যাপোলো ইস্পাত। আইপিওতে ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের সঙ্গে ১২ টাকা প্রিমিয়াম যোগ করে শেয়ারের দাম নির্ধারণ করা হয় ২২ টাকা। ২০১২ সালের ৩০ জুন পুনর্মূল্যায়নসহ শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য ছিল ২২ টাকা ৭৮ পয়সা।

আইপিওর মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের বড় অংশ নতুন সম্প্রসারণে না গিয়ে ব্যাংকঋণ পরিশোধে ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল অ্যাপোলো ইস্পাতের। প্রসপেক্টাসে জানানো হয়, পুঁজিবাজার থেকে তোলা ২২০ কোটি টাকার মধ্যে ১৫৩ কোটি টাকা ব্যাংকঋণ পরিশোধে ব্যয় করা হবে। উচ্চ সুদজনিত দায় কমাতে ২০টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনা নেয় কোম্পানিটি। পাশাপাশি উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে পণ্যের মান বাড়াতে এনওএফ প্রকল্প স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ প্রকল্পে মোট ৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা ছিল। এর মধ্যে আইপিও তহবিল থেকে ৬৩ কোটি এবং বাকি অর্থ নিজস্ব তহবিল থেকে জোগানের কথা জানানো হয়। তালিকাভুক্তির পর কয়েক বছর ব্যবসায় কিছুটা ইতিবাচক ধারা দেখা গেলেও ২০১৫-১৬ হিসাববছর ছিল কোম্পানিটির ভালো সময়গুলোর একটি। ওই বছর রেভিনিউ ৫৩০ কোটি টাকা এবং নিট মুনাফা ৭৫ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।

সুদ দিতেই মুনাফা শেষ, উৎপাদন নেমে আসে অর্ধেকে

২০১৬ সালের পর কোম্পানিটি ডুবতে থাকে। ২০১৭-১৮ হিসাববছরে রেভিনিউ এক লাফে ৩২ শতাংশ কমে যায়। কোম্পানির ব্যাখ্যা ছিল আন্তর্জাতিক বাজারে এইচআর কয়েল ও জিংক ইনগটের দাম বেড়ে যাওয়া এবং সেই অনুপাতে দেশের বাজারে পণ্যের দাম সমন্বয় করতে না পারায় রেভিনিউ পতন ঘটেছে। এ সময় বড় ধাক্কা লাগে কোম্পানির মুনাফায়। নিট মুনাফা প্রায় ৯৫ শতাংশ কমে দাঁড়ায় মাত্র ২ কোটি টাকায়। রিটার্ন অন ইকুইটি ১০ শতাংশ থেকে হয় শূন্য দশমিক ২৭ শতাংশ। পাশাপাশি শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য ৩১ টাকা ৩৭ পয়সা থেকে কমে হয় ২০ টাকা ১৯ পয়সা।

অ্যাপোলো ইস্পাতের আর্থিক অবস্থা নিয়ে সর্বশেষ তথ্য পাওয়া ২০২০-২১ অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেনে। সেই তথ্য অনুযায়ী ২০২০-২১ হিসাববছর শেষে ৪০১ কোটি মূলধনের কোম্পানিটির মোট দায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৭৪৯ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে ব্যাংকঋণের পরিমাণ ৬৯৫ কোটি ৮২ লাখ টাকা যা মোট দায়ের প্রায় ৯৩ শতাংশ। অর্থাৎ কোম্পানিটির দায়ের বড় অংশই ব্যাংকঋণ। একই সময়ে কোম্পানিটির মোট সম্পদের পরিমাণ ৯০১ কোটি টাকা। এর বিপরীতে শেয়ারহোল্ডারদের মোট ইকুইটি ছিল ১৫২ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। আর পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ প্রায় ৪৮৩ কোটি টাকা।

কোম্পানিটির পতনের পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ ছিল অতিরিক্ত সুদ ব্যয়। এর পাশাপাশি উৎপাদন সক্ষমতার কম ব্যবহারও সংকটকে আরও গভীর করে। বার্ষিক ১ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন সিআই শিট উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি সর্বোচ্চ ৫০ থেকে ৫৩ শতাংশ সক্ষমতা ব্যবহার করতে পেরেছে। তালিকাভুক্তির পর উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে এবং সর্বশেষ তা নেমে আসে মাত্র ২৩ শতাংশে। প্রতিষ্ঠাতা দীন মোহাম্মদ জীবিত থাকা অবস্থাতেই কোম্পানিটি সংকটে পড়ে। মূলত ২০১৬ সালের শেষ দিক থেকেই উৎপাদন অনিয়মিত হয়ে পড়ে। ২০২১ সালের এপ্রিলে কোম্পানির চেয়ারম্যান দীন মোহাম্মদ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনসার আলী মারা যান। এরপর দীন মোহাম্মদের ছেলে মোহাম্মদ শোয়েব এবং দুই মেয়ে মেহেরুন হক ও ইভানা ফাহমিদা কোম্পানিটি বিক্রি এবং নতুন বিনিয়োগ আনার চেষ্টা করলেও তা সফল হয়নি।

কোম্পানি নিয়ে পরিচালনা পর্ষদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। দীন মোহাম্মদের ছেলে ও ফিনিক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শোয়েবের মোবাইলে একাধিকবার ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিলেও সাড়া দেননি। কোম্পানির রেজিস্টার্ড করপোরেট অফিস তেজগাঁওয়ের ফিনিক্স টাওয়ারে গেলে অফিস বন্ধ পাওয়া যায়। তবে ভবনের নিরাপত্তা প্রহরীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুজন কর্মচারী অ্যাপোলো ইস্পাতের কাজ করেন। আজিজুল ইসলাম নামে তাদের একজনের নম্বরে ফোন দিলে তিনি জানান, কোম্পানির কোনো কর্মকর্তা বা কার্যক্রম নেই।