তদবির ঠেকাতে কঠোর নির্দেশনা সরকারের

প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে এক প্রতিমন্ত্রীর দপ্তরের সামনে সংসদ সদস্য, জেলা পরিষদের প্রশাসকসহ কয়েক কুড়ি মানুষের ভিড়। দপ্তরের ভেতরে তিল ধারণের জায়গা নেই। বাইরে অপেক্ষমাণ মানুষের ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন প্রতিমন্ত্রীর কর্মীরা। এক সংসদ সদস্য এক কর্মকর্তাকে দেখিয়ে প্রতিমন্ত্রীকে বলেন, ‘উনি আমার আত্মীয়, আমার এলাকায় তাকে পোস্টিং দেন। এখন যিনি আছেন, তিনি কথা শুনছেন না।’ সেখানে উপস্থিত আরেক সংসদ সদস্য বলেন, ‘আমার জেলার প্রকৌশলীটা চেঞ্জ করে দেন। সে কোনো কাজের না।’ এতে বিরক্ত হয়ে প্রতিমন্ত্রী স্বগতোক্তি করেন, ‘ভাই! আমি এখন কী করব? এক এমপির অনুরোধে পোস্টিং দিলে অন্য এমপি বলেন বাতিল করেন। বাধ্য হয়ে সেটাও করতে হয়! আর পারছি না।’ একই চিত্র দেখা গেছে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়েও।

প্রতিদিন এ মন্ত্রণালয়ে বদলি, পদায়ন ও চলতি দায়িত্ব দেওয়ার জন্য অন্তত ২০০টির বেশি আবেদন জমা পড়ে। তবে এসব আবেদন নথিজাত করা হয় না। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা বা দুই সচিবের যেকোনো একজনের সুপারিশ থাকা আবেদনই শুধু বিবেচনায় নেওয়া হয়। দৈবচয়নের মাধ্যমে যাচাই করা সাতটি আবেদনের মধ্যে চারটি ছিল নার্স বদলির আবেদন। এসব আবেদনে সুপারিশ করেছেন একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী। বাকি তিনটি আবেদনের ক্ষেত্রেও ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী মন্ত্রী, হুইপ বা প্রতিমন্ত্রীদের কেউ না কেউ সুপারিশ করেছেন। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত তদবির বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার। সরকারি কর্মচারীদের চাকরি-সংক্রান্ত বিষয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত তদবির করা হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। একই সঙ্গে কোনো কর্মচারীর পক্ষে অন্য ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের করা তদবিরের বিস্তারিত তথ্য ডোসিয়ারে (চাকরি-সংক্রান্ত নথি) সংরক্ষণ করতে বলা হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা দিয়ে সব সিনিয়র সচিব ও সচিব, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) কাছে চিঠি পাঠানো হয়। এতে বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারীরা কী ধরনের আচরণ করবেন তা ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’-এর সংশ্লিষ্ট বিধিতে উল্লেখ রয়েছে। সম্প্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, সরকারি কর্মচারীদের কেউ কেউ চাকরি-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে তদবির করার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গকে বিভিন্ন দপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে পাঠাচ্ছেন। এ ধরনের কর্মকাণ্ড ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’-এর বিধি ২০-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’-এর ২(খ) অনুযায়ী অসদাচরণের শামিল।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জানিয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী তার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমে চাকরি-সংক্রান্ত বিষয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত তদবির করলে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে এ ধরনের যেকোনো তদবিরের বিস্তারিত তথ্য ডোসিয়ারে সংরক্ষণ করতে হবে। তবে কোনো কর্মচারী চাকরি-সংক্রান্ত বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তার নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে পারবেন। এ ধরনের আবেদন সর্বোচ্চ এক মাসের মধ্যে যৌক্তিকভাবে নিষ্পত্তি করতে হবে। চিঠিতে এ বিষয়ে নিজ নিজ নিয়ন্ত্রণাধীন দপ্তর ও সংস্থাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করা হয়েছে।

সরকারের এমন উদ্যোগকে সাধুবাদ জানালেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার। তিনি গতকাল বললেন, ‘আমি সরকারের এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। কারণ সিভিল সার্ভিস নষ্ট করার অন্যতম প্রধান কারণ তদবিরবাজি। অতীতে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ফলপ্রসূ হয়নি। সরকার যদি সত্যিই তদবিরবাজি বন্ধ করতে চায়, তাহলে যার পক্ষে তদবির করা হবে তাকে ‘অযোগ্য’ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। শুধু আর্থিকভাবেই সৎ হলে হবে না, নৈতিকভাবেও সৎ থাকতে হবে।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিক্ষায় সবচেয়ে বেশি অবৈধ লেনদেন ও তদবির চলে বদলি-বাণিজ্যে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভবন অবকাঠামো অনুমোদন করানোর নামেও চলে তদবির। এই তদবিরে যুক্ত হন রাজনৈতিক দলের নেতারাও। তদবিরবাজরা কখনো সাংবাদিক, কখনো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কিংবা রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার করছেন। তদবিরবাজদের থেকে বাঁচতে নিজ দপ্তর থেকে রাগ করে বের হওয়ার একাধিক নজির রয়েছে শিক্ষা সচিবের। প্রায় অভিন্ন চিত্র গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোতেও। নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, বিভাগীয় মামলার নিষ্পত্তি ও দরপত্রের বিল তুলে দেওয়াসহ নানা কাজে প্রকাশ্যে তদবির হচ্ছে।

তদবিরের চাপ সামাল দিতে হচ্ছে স্বরাষ্ট্র, ভূমি, জনপ্রশাসন, আইন, যোগাযোগ এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কেও। এসব মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিবসহ গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের দপ্তরে সকাল ১০টা থেকেই তদবিরের চাপ শুরু হয়। সাধারণ মানুষের তুলনায় দলীয় পরিচয়ে তদবিরই বেশি। কেউ মন্ত্রীর লোক, কেউ এমপি বা দলীয় নেতা, আবার কেউ এমপির আত্মীয়স্বজনের পরিচয় দিয়ে তদবির করছেন। স্বাভাবিক তদবিরের পাশাপাশি প্রভাবশালী মহলের চাপেও বিপাকে পড়েছেন আমলারা। পছন্দের কর্মকর্তাকে পোস্টিং দিতে গিয়ে নানামুখী তদবিরের চাপে হিমশিম খাচ্ছে মন্ত্রণালয়। ডিসি, ইউএনও ও প্রেষণ পদসহ গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে পোস্টিং নিয়ে সবচেয়ে বেশি তদবির হচ্ছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। বিশেষ করে লোভনীয় পদে পোস্টিং পেতে কর্মকর্তাদের অনেকে নিজ নিজ মাধ্যমে জোর তদবির চালাচ্ছেন।