নেত্রকোনা জেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটার মৌসুম এখন পুরোদমে চলছে। তবে চারদিকে সোনালি ধানের সমারোহ থাকলেও কৃষকদের মুখে হাসি নেই। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতির পর এবার ধান বিক্রিতে ওজনে কারচুপির অভিযোগে তারা নতুন করে বিপাকে পড়েছেন। অতিরিক্ত ওজন নেওয়ার প্রবণতা ও কম দামের চাপে কৃষকরা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন, ফলে তারা তাদের ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
জানা গেছে, এবার অতিবৃষ্টিতে কলমাকান্দার গুড়াডোবা, মেদাবিল; মদনের গোবিন্দশ্রী, উচিতপুর; মোহনগঞ্জের ডিঙাপোতা; খালিয়াজুরির কীর্তনখোলা, নন্দের পেটনা, লক্ষ্মীপুর, চুনাই, কাটকাইলেরকান্দা, বৈলং, লেপসাই, চৈতারাসহ বিভিন্ন হাওরের নিচু ধানক্ষেতে জমে থাকা পানিতে প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমির আধা পাকা বোরো ধান নষ্ট হয়েছে।
খালিয়াজুরি, মদন ও মোহনগঞ্জের বিভিন্ন হাওর ঘুরে দেখা গেছে, কৃষক-কৃষাণীদের ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চলছে। কোথাও কোথাও ধান এখনো আধা পাকা থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেতেই পাকা ধান বাতাসে দুলছে। এসব ধান কাটার ধুম পড়েছে। হাওরে জিরাতি (অস্থায়ী ঘর) তৈরি করে ধান কাটা চলছে। শ্রমিকদের পাশাপাশি যন্ত্রের সাহায্যেও ধান কাটা হচ্ছে। শ্রমিকরা ধানের বোঝা মাথায় করে এনে সড়কের পাশে স্তূপ করছেন। কেউ আবার মেশিনে মাড়াই করা ধান স্থানীয় মহাজনদের কাছে বিক্রি করছেন। এসব ধান ট্রাক, লরি, টমটম ও ইজিবাইকে করে বিভিন্ন স্থানে নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কেউ কেউ কাটা ধানের আঁটি আঙিনায় এনে মেশিনে মাড়াই করছেন এবং জমির পাশে বা বাড়ির সামনে ধান সিদ্ধ ও শুকানোর ব্যবস্থা করছেন।
কৃষকদের অভিযোগ, দেশে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ৪০ কেজিতে এক মণ ধরা হলেও স্থানীয় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ৪২ থেকে ৪৫ কেজিতে এক মণ হিসেবে ধান কিনছেন। এতে প্রতি মণে কয়েক কেজি ধান অতিরিক্ত দিতে হচ্ছে, যা সরাসরি তাদের ক্ষতির কারণ হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে দরকষাকষির সুযোগ কম থাকায় অনেক কৃষক বাধ্য হয়েই এ শর্তে ধান বিক্রি করছেন। স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক দফা শিলাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টিতে হাওরের নিম্নাঞ্চলের অনেক জমির ধান তলিয়ে গেছে, ফলে উৎপাদন ব্যাহত হয়ে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা। এর সঙ্গে শ্রমিক সংকট ও ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণে চাষাবাদ ও ধান কাটার খরচও বেড়েছে। সব মিলিয়ে মৌসুমের শুরু থেকেই কৃষকরা চরম চাপের মধ্যে রয়েছেন।
একাধিক কৃষক বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আগেই তারা নতুন করে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। সরকারি ক্রয় কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় বাজারে ন্যায্যমূল্যও পাচ্ছেন না। ফলে কম দামে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে, তার ওপর আবার ওজনের কারচুপি। সব মিলিয়ে লোকসান আরও বাড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ বছর ১০ উপজেলায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে ৪১ হাজার ১২০ হেক্টর জমিতে আবাদ করা হয়েছে। হাওরপাড়ের মানুষদের একমাত্র ফসলই হচ্ছে বোরো। এ ফসলের ওপরই নির্ভর করে কৃষকদের সন্তানদের লেখাপড়া, চিকিৎসাসহ সারা বছরের সংসার খরচ। গত রোববার ক্ষেতের পাকা ধান কাটতে শুরু করেন কৃষকরা। হাওরে উৎপাদিত বোরো ধানের বাজারমূল্য প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। এই বিপুল পরিমাণ ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে স্থানীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খালিয়াজুড়ির চাকুয়া গ্রামের কৃষক গফুর মিয়া বলেন, আমাদের এলাকায় রাস্তাঘাট নেই। সরকারও ধান কিনছে না। বাধ্য হয়ে কম দামে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে কম দামে ধান নিচ্ছে, আবার ওজনেও ঠকাচ্ছে। আমাদের কষ্ট দেখার কেউ নেই। মোহনগঞ্জ উপজেলার গাগলাজুর গ্রামের কৃষক কাজল চৌধুরী বলেন, আমাদের উপজেলায় যাওয়ার সড়কটি তিন বছর ধরে বন্ধ। হাওরের খারাপ রাস্তার কারণে শহরে ধান নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাই ৭৫০ থেকে ৮২০ টাকা দরে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। আবার প্রতি মণে ৫ কেজি পর্যন্ত ‘ঢলক’ কেটে নেওয়া হয়। কৃষকের ক্ষতি দেখার কেউ নেই।
এ বিষয়ে জেলা খাদ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, এখনো সরকারিভাবে ধান-চাল কেনার নির্দেশনা জারি হয়নি। তবে দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। ওজনে বেশি নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মোয়েতাছেমুর রহমান বলেন, বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। কৃষকদের যেন কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে না হয়, সেজন্য সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলা হবে। নেত্রকোনা-১ আসনের এমপি ও সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, ‘ওজনে বেশি নেওয়ার বিষয়টি শুনেছি। কৃষকদের কষ্টার্জিত ফসল ওজনে বেশি নিয়ে ঠকানো হচ্ছে। কৃষকদের সমস্যা সমাধানের জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।’
