প্রস্তাবিত অর্থ আইন সংশোধনের আওতায় স্বর্ণ বা স্বর্ণালংকার বিক্রি থেকে আয় দেখালে করদাতাদের ওপর শিগগিরই ১৫ শতাংশ মূলধনি মুনাফা কর (ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স) আরোপ করা হতে পারে। কর কর্মকর্তাদের মতে, কর ফাইলে অতিরিক্ত স্বর্ণের মজুত দেখিয়ে অঘোষিত সম্পদ বৈধ করার প্রবণতা ঠেকাতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
কর্মকর্তাদের মতে, বাংলাদেশে অনেক করদাতার কর ফাইলে স্বর্ণকে ‘ভৌতিক সম্পদ’ হিসেবে দেখানো হয়। সাধারণত ৩০ থেকে ৪০ ভরি স্বর্ণ দেখানো হলেও তার মূল্য হিসেবে ‘মূল্য অজানা’ উল্লেখ করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। অথচ বাস্তবে অনেকের কাছে দুই–তিন ভরি স্বর্ণ থাকে, আবার কারও ক্ষেত্রে একেবারেই থাকে না। কর্মকর্তাদের দাবি, ভবিষ্যতে অজানা উৎসের অর্থ বা সম্পদ কর পরিশোধ না করেই বৈধ করার সুযোগ রাখতে অনেকে কর ফাইলে অতিরিক্ত স্বর্ণ দেখান, পরে সেটিকে স্বর্ণালংকার বিক্রির আয় হিসেবে প্রদর্শন করা হয়।
যারা কর ফাইলে প্রকৃত স্বর্ণালংকারের তুলনায় অনেক বেশি স্বর্ণ দেখিয়েছেন এবং পরবর্তীতে অজানা, বৈধ বা অবৈধ উৎস থেকে আসা অর্থ-সম্পদকে স্বর্ণ বিক্রির আয় হিসেবে দেখিয়ে কর ফাইল পূরণ করছেন, মূলত তাদের করের আওতায় আনতেই সরকার এই উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবিত অর্থ আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি স্বর্ণ বিক্রি করে আয় দেখালে তা মূলধনি মুনাফা বা ক্যাপিটাল গেইন হিসেবে গণ্য হবে। এক্ষেত্রে স্বর্ণের বর্তমান বাজারমূল্য থেকে অর্জনকালীন বাজারমূল্য বাদ দেওয়ার পর যে মুনাফা থাকবে, তার ওপর ১৫ শতাংশ হারে কর আরোপ করা হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, অনেকের বাস্তবে স্বর্ণ নেই। কিন্তু অজানা উৎস থেকে সম্পদ এলে কর ফাঁকি দেওয়ার জন্য সেটিকে স্বর্ণ বিক্রির অর্থ হিসেবে দেখানো হয়। মূলত কর ফাঁকি দিতেই এটি করা হয়। তিনি বলেন, যারা কর ফাইলে থাকা স্বর্ণ বিক্রি থেকে আয় দেখান—প্রকৃতপক্ষে ওই আয় স্বর্ণ বিক্রি থেকে আসুক বা না আসুক—এবার তাদের ওপর ১৫ শতাংশ গেইন ট্যাক্স আরোপের প্রস্তাব আনা হয়েছে অর্থবিলে আনা প্রস্তাব অনুযায়ী, স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকারের পাশাপাশি রৌপ্য, রত্ন, হীরা, ধাতব মুদ্রা, মূল্যবান ধাতু, ডিজিটাল মুদ্রা, চিত্রকর্ম, অ্যান্টিকস এবং ক্লাবের সদস্যপদও এই মূলধনি মুনাফা করের আওতায় আসতে পারে।
গেইন ট্যাক্স কীভাবে হিসাব হবে
এনবিআর কর্মকর্তাদের মতে, কর ফাইলে কোনো নির্দিষ্ট বছরে স্বর্ণ অর্জনের তথ্য থাকলে সেই বছরের বাজারমূল্যকে ভিত্তি ধরা হবে। আর যে বছরে স্বর্ণ বিক্রি থেকে আয় দেখানো হবে, সেই বছরের বাজারমূল্য অনুযায়ী হিসাব করা হবে। এরপর বিক্রির বছরের বাজারমূল্য থেকে অর্জনের সময়কার সমমূল্য স্বর্ণের বাজারমূল্য বাদ দিয়ে যে পার্থক্য থাকবে, সেটিই মূলধনি মুনাফা হিসেবে গণ্য হবে এবং এর ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপ করা হবে। তবে এ সুবিধা পেতে সংশ্লিষ্ট সম্পদ কমপক্ষে পাঁচ বছর ধরে রাখতে হবে। পাঁচ বছরের কম সময় ধরে রাখা সম্পদ বিক্রি করলে তা নিয়মিত আয়কর হার অনুযায়ী করের আওতায় আসবে, যেখানে ব্যক্তির ক্ষেত্রে বর্তমান সর্বোচ্চ হার ৩০ শতাংশ, যা ২০২৮-২৯ করবর্ষে ৩৫ শতাংশে উন্নীত হবে।
কর্মকর্তাদের মতে, বিশ্বব্যাপী মূলধনি মুনাফা কর সাধারণত প্রায় ১৫ শতাংশ হারে আরোপ করা হয়, যা বাংলাদেশেও প্রয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো ব্যক্তি যদি ২০১০ সালে তার কর ফাইলে ৩০ ভরি স্বর্ণ দেখিয়ে থাকেন এবং তখন প্রতি ভরি স্বর্ণের বাজারমূল্য প্রায় ৪২ হাজার টাকা ধরা হয়, তাহলে পরবর্তীতে তিনি যদি স্বর্ণ বিক্রির আয় হিসেবে ২০ লাখ টাকা ঘোষণা করেন, তবে কর বিভাগ সেটিকে ভিত্তি করে মূলধনি মুনাফা নির্ধারণ করবে। বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম প্রায় ২ লাখ ২২ হাজার টাকা হলে ২০ লাখ টাকার সমপরিমাণ স্বর্ণ প্রায় ৯ ভরি হয়। এই ৯ ভরি স্বর্ণের বর্তমান মূল্য ২০ লাখ টাকা থেকে ২০১০ সালের অর্জনমূল্য ৩ লাখ ৭৮ হাজার টাকা বাদ দিলে মূলধনি মুনাফা দাঁড়ায় ১৬ লাখ ২২ হাজার টাকা। এই মুনাফার ওপর ১৫ শতাংশ হারে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার টাকা গেইন ট্যাক্স পরিশোধ করতে হবে।
