ব্যাংকিং খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পুঁজিবাজার ও বিকল্প অর্থায়নের উৎস হিসেবে বন্ড মার্কেটকে শক্তিশালী করার কথা বলা হলেও, নতুন অর্থবছরের বাজেটে জিরো কুপন বন্ড থেকে প্রাপ্ত আয়ের ওপর কর আরোপের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিএনপি সরকারের হয়ে প্রথমবার অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেটকে গতিশীল করার ওপর জোর দিয়ে আসছেন। বাজেট বক্তব্যেও নতুন বন্ড চালুর পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
অন্যদিকে গত দুই দশক ধরে জিরো কুপন বন্ড হতে আয়ের ওপর ব্যক্তিশ্রেণির করদাতারা যে কর অব্যাহতি পেয়ে আসছিলেন তা তুলে নেওয়া হয়েছে আগামী অর্থবছরের অর্থবিলে। এরজন্য আয়কর আইন ২০২৩ এর ষষ্ঠ তফসিলে সংশোধন আনার প্রস্তাবও করা হয়েছে। বর্তমানে জিরো কুপন বন্ড হতে কোনো আয়ের ওপর কোনো কর দিতে হয় না একজন বিনিয়োগকারীকে।
তফসিল অনুযায়ী, ব্যাংক, বীমা বা অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া কোনো ব্যক্তি জিরো কুপন বন্ড থেকে যে আয় পান, তা তার মোট আয়ের সঙ্গে যুক্ত করা হয় না—অর্থাৎ এ আয়ের ওপর কর প্রযোজ্য নয়। এ ধরনের বন্ড ইস্যুর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক বা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের পূর্বানুমোদন নিয়ে কোনো ব্যাংক, বীমা বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তা ইস্যু করতে হয়। তবে একইভাবে পূর্বানুমোদন সাপেক্ষে এসব প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্য কোনো সংস্থা থেকেও জিরো কুপন বন্ড ইস্যু করা হলে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতারা একই সুবিধা পেয়ে থাকেন। কিন্তু অর্থবিল ২০২৬-এ এই কর-সুবিধা বিলুপ্ত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
জিরো কুপন বন্ড হল এমন এক ধরনের ঋণপত্র, যার বিপরীতে নির্দিষ্ট কোনো নিয়মিত সুদ (কুপন) দেওয়া হয় না বরং এর পরিবর্তে বন্ডটি অভিহিত মূল্যের চেয়ে কম দামে (ডিসকাউন্টে) বিক্রি করা হয়। মেয়াদ শেষে পুরো অভিহিত মূল্য ফেরত দেওয়া হয়। এই ক্রয়মূল্য ও মেয়াদ শেষে পাওয়া মূল্যের পার্থক্যের মাধ্যমে যে আয় হয় সেটিই হচ্ছে বিনিয়োগকারীর আয় বা মুনাফা। ২০০৭-০৮ অর্থবছরের অর্থ আইনে বিনিয়োগকারীদের জন্য জিরো কুপন বন্ড হতে আয়ের ওপর কর অব্যাহতি চালু করা হয়েছিল, যা ১ জুলাই ২০০৭ থেকে কার্যকর হয়।
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণক সংস্থা-বিএসইসির বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১১টি কোম্পানি জিরো কুপন বন্ড ‘ইস্যুর’ মাধ্যমে ৬ হাজার ৬৭৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই ধরনের বন্ডের মাধ্যমে একটি কোম্পানি ১৭১ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। সবশেষ মার্চ মাসে দায়দেনা পরিশোধ এবং চিনি শিল্পে বিনিয়োগের জন্য বাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা তুলতে বন্ড ছাড়ার অনুমোদন পায় দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী সিটি গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান সিটি সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড।
আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজকে জিরো কুপন বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের অনুমোদন দিয়েছে বিএসইসি। একই সময়ে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ‘অরেঞ্জ বন্ড’ নীতিমালা প্রণয়নের পর প্রথমবারের মতো অনুমোদন পায় বেসরকারি ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান সাজেদা ফাউন্ডেশনের বন্ড। এক থেকে তিন বছর মেয়াদি এ বন্ডটি রূপান্তরযোগ্য নয় এবং এটি শতভাগ নগদায়নযোগ্য, অরক্ষিত অরেঞ্জ জিরো কুপন বন্ড হিসেবে বিবেচিত। নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতে, এই বন্ড থেকে সংগৃহীত অর্থ নারী উদ্যোক্তাদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও ক্ষমতায়নে ব্যয় করা হবে। তবে বাজেটে সরকারের নতুন সিদ্ধান্তের ফলে নারী উদ্যোক্তা এবং বিকল্প অর্থায়নের মাধ্যম হিসেবে বন্ড বাজার—উভয় ক্ষেত্রেই প্রভাব পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
