কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, গাজীপুরের সহকারী কমিশনার মো. আইয়ুবের বিরুদ্ধে তিনটি সচল পাসপোর্ট ব্যবহার করে গত আট বছরে অন্তত ২৫ বার বিদেশ ভ্রমণের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব বিদেশযাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অনুমতিও নেওয়া হয়নি। তাঁর ঘন ঘন বিদেশ ভ্রমণ, একাধিক পাসপোর্ট ব্যবহার এবং বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগের সঙ্গে অর্থপাচারের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়ে সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৮ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মো. আইয়ুব ভারত, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), চীন, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর—এই ছয় দেশে অন্তত ২৫ বার ভ্রমণ করেছেন। এর মধ্যে ভারতে ১২ বার, থাইল্যান্ডে সাত বার, সংযুক্ত আরব আমিরাতে দুই বার, চীনে দুই বার এবং মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে একবার করে ভ্রমণের তথ্য পাওয়া গেছে।কাকতালীয়ভাবে হোক বা অন্য কোনো কারণে, দুদকে অভিযোগ দাখিলের কয়েক দিনের মধ্যেই মো. আইয়ুবকে গাজীপুরের কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহার করা হয়। পরে তাঁকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে ‘বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা’ (ওএসডি) হিসেবে সংযুক্ত করা হয়েছে। গত ২৭ আগস্ট রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব মিজাবে রহমত স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়।
তিন পাসপোর্টে ২৫ বিদেশযাত্রা
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মো. আইয়ুবের নামে তিনটি পাসপোর্ট ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে BP03795 নম্বরের পাসপোর্টটি সবচেয়ে পুরোনো। এই পাসপোর্ট ব্যবহার করে ২০১৮ সালের আগস্ট থেকে ২০২০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সাতবার ভারতে ভ্রমণের রেকর্ড রয়েছে। এরপর A033271 নম্বরের পাসপোর্ট ব্যবহার করে ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারত, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১০টি বিদেশ ভ্রমণের তথ্য পাওয়া গেছে। সর্বশেষ A091834 নম্বরের পাসপোর্ট ব্যবহার করে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত থাইল্যান্ড, চীন ও সিঙ্গাপুরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও আটটি বিদেশ ভ্রমণের রেকর্ড পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, তিনটি পাসপোর্টে মোট অন্তত ২৫টি বিদেশ ভ্রমণের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
সরকারি কর্মকর্তা, পাসপোর্টে ‘প্রাইভেট সার্ভিস’
অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মো. আইয়ুব সরকারি চাকরিতে থাকা সত্ত্বেও তাঁর ব্যক্তিগত পাসপোর্টে পেশা হিসেবে ‘প্রাইভেট সার্ভিস’ উল্লেখ করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, তাঁর বর্তমান পাসপোর্টটি ‘সাধারণ’ পাসপোর্ট হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। A091834 নম্বরের এই পাসপোর্টটি ১৩ নভেম্বর ২০২৪ ইস্যু করা হয় এবং এর মেয়াদ ১১ নভেম্বর ২০৩৪ পর্যন্ত। সম্প্রতি বিশ্ব মাস্টার্স অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিতে এনবিআরের অনুমোদনসংক্রান্ত চিঠিতেও তাঁর এই পাসপোর্ট নম্বর উল্লেখ করা হয়। ওই চিঠিতে আগের পাসপোর্ট নম্বর হিসেবে A033271-এর উল্লেখ রয়েছে। তবে প্রাথমিক অনুসন্ধানে BP03795 নম্বরের আরেকটি পাসপোর্ট ব্যবহারের তথ্যও পাওয়া গেছে।
অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিতে এনবিআরের অনুমতি
মো. আইয়ুবের বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে প্রশ্নের মধ্যে তাঁর সাম্প্রতিক দক্ষিণ কোরিয়া সফরের বিষয়টিও সামনে এসেছে। বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের মনোনয়নে দক্ষিণ কোরিয়ার দেগুতে অনুষ্ঠিত ২০২৬ ওয়ার্ল্ড মাস্টার্স অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিতে এনবিআরের দুই সহকারী কমিশনারকে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের একজন ছিলেন মো. আইয়ুব।রাজস্ব ভবন থেকে গত ৩ আগস্ট জারি করা এক চিঠিতে বলা হয়, ২০ আগস্ট থেকে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেগুতে অনুষ্ঠিতব্য ওই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে মো. আইয়ুব ও ঢাকা (দক্ষিণ) কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের সহকারী কমিশনার মো. শফিকুল ইসলামকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে মো. আইয়ুবের বর্তমান পাসপোর্ট নম্বর A091834 উল্লেখ করা হয় এবং আগের পাসপোর্ট নম্বর হিসেবে A033271-এর তথ্য দেওয়া হয়।
অনুমতি ছাড়াই বিদেশ ভ্রমণের অভিযোগ
সরকারি চাকরিজীবীদের ব্যক্তিগত বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি, ছুটি এবং ক্ষেত্রবিশেষে সরকারি আদেশের প্রয়োজন হয়। তবে দুদকে দেওয়া অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, মো. আইয়ুব তাঁর একাধিক বিদেশ ভ্রমণের আগে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় অনুমতি গ্রহণ করেননি। অভিযোগকারীর দাবি, একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে অনুমোদন ছাড়া একাধিকবার বিদেশ ভ্রমণের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এসব ভ্রমণের ব্যয় কীভাবে বহন করা হয়েছে এবং বিদেশে অবস্থানকালে কোনো আর্থিক লেনদেন বা সম্পদ অর্জনের ঘটনা ঘটেছে কি না, তাও খতিয়ে দেখার আবেদন জানানো হয়েছে।
অর্থপাচারের অভিযোগও তদন্তের দাবি
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে মো. আইয়ুবের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ অর্জন এবং সেই অর্থের একটি অংশ বিদেশে পাচারের অভিযোগ তোলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো প্রমাণিত নয়। অভিযোগে তাঁর ব্যাংক হিসাব, আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, বিদেশযাত্রার ব্যয়, আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন এবং বিদেশে কোনো বিনিয়োগ বা সম্পদ রয়েছে কি না—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে। বিশেষ করে একই ব্যক্তির নামে একাধিক পাসপোর্ট ব্যবহারের বিষয়টি কীভাবে হয়েছে, বিভিন্ন সময়ে পাসপোর্টে পেশাগত পরিচয়ের তথ্য কেন ভিন্ন ছিল এবং সরকারি অনুমোদন ছাড়াই বিদেশ ভ্রমণের অভিযোগের সত্যতা কতটা—এসব বিষয় যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
অভিযোগের পরেই বদলি, তবে যোগসূত্রের প্রমাণ নেই
দুদকে অভিযোগ দাখিলের কয়েক দিনের মধ্যে মো. আইয়ুবকে গাজীপুর কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট থেকে প্রত্যাহার করে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে সংযুক্ত করার বিষয়টি নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ এবং পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপের মধ্যে সরাসরি কোনো যোগসূত্র রয়েছে—এমন তথ্য বা সরকারি বক্তব্য পাওয়া যায়নি। উত্থাপিত এসব অভিযোগের বিষয়ে মো. আইয়ুবের বক্তব্য জানতে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এই প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
