দেশে ইনফ্লুয়েঞ্জা ক্রমেই বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে উঠছে। ২০ বছরের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সাধারণ জ্বর-কাশি ও তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের প্রায় ১৩ শতাংশ ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত। একই সঙ্গে দেশে এভিয়েন ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লুর উপস্থিতিও উদ্বেগজনক বলে উঠে এসেছে। ২০০৭ সাল থেকে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) দেশে ইনফ্লুয়েঞ্জার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আসছে। এ কাজে তাদের সহায়তা করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)। মঙ্গলবার আইইডিসিআরের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে দুই প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা তাঁদের দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের তথ্য তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে আইইডিসিআর, আইসিডিডিআরবি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সিডিসির প্রতিনিধিদের পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, কয়েকটি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতাল, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং সরকারি-বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি ও আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালক তাহমিদ আহমেদ বলেন, আইইডিসিআর ও আইসিডিডিআরবির যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ইনফ্লুয়েঞ্জা পর্যবেক্ষণ ও নজরদারি ব্যবস্থা বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এ কার্যক্রম বিশ্বজুড়ে রোগ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাকেও সহায়তা করছে। তিনি বলেন, ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রতিরোধে টিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, মাস্ক ব্যবহার ও নিয়মিত হাত ধোয়ার মতো অভ্যাসও জরুরি। একই সঙ্গে ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রতিরোধে জনসচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
কোথায় পর্যবেক্ষণ, কী পর্যবেক্ষণ
মূল উপস্থাপনায় আইইডিসিআরের সহযোগী অধ্যাপক মোনালিসা ইনফ্লুয়েঞ্জা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পটভূমি, পদ্ধতি, গুরুত্ব, উদ্দেশ্য বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ২০১৯ সালে দেশে ইনফ্লুয়েঞ্জায় ২ লাখ ৩৬ হাজার ৩৮০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। ২০১১-১২ সালে দেশে ইনফ্লুয়েঞ্জায় ১৬ হাজার ৮০৪ জনের মৃত্যু হয়। তিনি বলেন, ইনফ্লুয়েঞ্জা দেশের অর্থনীতির জন্য বোঝা। বিশ্বে ১৩৮টি দেশে ১৫৭টি ন্যাশনাল ইনফ্লুয়েঞ্জা সেন্টার আছে। এর মধ্যে আইইডিসিআর একটি।
অনুষ্ঠানে বলা হয়, ১৫টি সরকারি ও একটি বেসরকারি হাসপাতালে ২০ বছর ধরে ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো অসুস্থতা এবং মারাত্মক তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ নিয়ে আসা রোগীর পর্যবেক্ষণ করেছে আইইডিসিআর ও আইসিডিডিআরবি। এর মধ্যে আছে: ঠাকুরগাঁও, নওগাঁ, সাতক্ষীরা, নরসিংদী, হবিগঞ্জ, কক্সবাজার, জয়পুরহাট ও পটুয়াখালী জেলা হাসপাতাল; যশোর ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল; ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, গাজীপুরে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। আর আছে সিলেটের বেসরকারি জালালাবাদ রাগিব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
ইনফ্লুয়েঞ্জা হচ্ছে ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ। ইনফ্লুয়েঞ্জায় জ্বর, কাশি, মাথাব্যথা, শরীরে ব্যথা হয়। ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত মানুষের হাঁচি, কাশি থেকে বা আক্রান্ত মানুষের সংস্পর্শে এলে ইনফ্লুয়েঞ্জা হয়। ওই হাসপাতালগুলোতে গত ২০ বছরে ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো অসুস্থতা বা তীব্র শ্বাসজনিত সংক্রমণ নিয়ে আসা ১ লাখ ৭২ হাজার ৭৯২ জন রোগীকে পর্যবেক্ষণের আওতায় নেওয়া হয়। তাঁদের প্রত্যেকের নমুনা ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়। তাতে দেখা গেছে, ২২ হাজার ২৮৪ জনের বা ১৩ শতাংশের ইনফ্লুয়েঞ্জা। ৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের ইনফ্লুয়েঞ্জা বেশি হয়। তবে মৃত্যু বেশি হয় ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের।
ইনফ্লুয়েঞ্জার মৌসুম
সাধারণভাবে ধারণা করা হয়, শীত মৌসুমে ইনফ্লুয়েঞ্জা বেশি দেখা দেয়। এই ধারণা ভুল। ২০ বছরের তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে আইসিডিডিআরবির সহযোগী বিজ্ঞানী ফাহমিদা চৌধুরী বলেন, এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর ইনফ্লুয়েঞ্জার মৌসুম। ইনফ্লুয়েঞ্জা সবচেয়ে বেশি দেখা দেয় জুন-জুলাই মাসে। এই বিজ্ঞানী বলেন, পাঁচ ধরনের মানুষের ইনফ্লুয়েঞ্জার ঝুঁকি বেশি। এর মধ্যে আছে: স্বাস্থ্যকর্মী, গর্ভবতী নারী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, একই সঙ্গে একাধিক দীর্ঘস্থায়ী রোগে ভোগা মানুষ এবং ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষ।
মার্চে ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা
ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা নিয়ে সেমিনারে লম্বা সময় ধরে আলোচনা হয়। গবেষকেরা এবং সেমিনারের মুক্ত আলোচনা পর্বে অংশগ্রহণকারীরা ঝুঁকি বেশি এমন পাঁচ ধরনের মানুষের টিকা দেওয়া বা টিকার আওতায় আনার ব্যাপারে বক্তব্য দেন। তবে দেশের সব মানুষকে ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা দেওয়ার ব্যাপারে নানা মত শোনা যায়। কেউ বলেন, প্রতিবছর ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকা দেওয়ার দরকার হয়। দেশের সব মানুষকে প্রতিবছর টিকা দিতে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন। কেউ বলেন, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে এই টিকা অন্তর্ভুক্ত করা যৌক্তিক হবে না।
আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী ফাহমিদা চৌধুরী জানান, ইনফ্লুয়েঞ্জার মৌসুম শুরুর প্রায় এক মাস আগে টিকা নেওয়া সবচেয়ে যৌক্তিক। সে হিসেবে মার্চ মাসকে ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা দেওয়ার উপযুক্ত সময় হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। অনুষ্ঠানের সভাপতি ও আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জাকির হোসেন হাবিব বলেন, হাসপাতালগুলোতে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যাপক ব্যবহার দেখা যাচ্ছে, যা উদ্বেগের বিষয়। এ ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী যৌক্তিকভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি। এছাড়া বক্তব্য দেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গ্লোবাল হেলথ ইমার্জেন্সি রেসপন্স বিভাগের মহাপরিচালক সৈয়দা জেসমিন সুলতানা, যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসির ঢাকার কর্মকর্তা মনোয়ার মোর্শেদ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইমার্জেন্সি মেডিক্যাল অফিসার আইরিন ইসিবুর।
