টিআইএন জালিয়াতিতে ২০ কোটি টাকার কর ফাঁকি

করদাতা হিসেবে নিবন্ধন নেন ২০২২ সালে। অথচ এর পাঁচ বছর আগে থেকেই নিয়মিত আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। অসম্ভব হলেও কর অঞ্চল-৫-এর এক কর্মচারীকে ম্যানেজ করে এমন জালিয়াতি করেছেন করদাতা সদরুল হাসান ও তার সাবেক স্ত্রী উর্মি হাসান। তদন্তে তাদের সম্পদ গোপন ও বিপুল অঙ্কের কর ফাঁকির তথ্য শনাক্ত করেছে আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট। একই সঙ্গে পরিবারের চার সদস্যের নামে থাকা প্রায় ২৬ কোটি টাকার এফডিআর জব্দ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বিশেষায়িত ইউনিট। কর অঞ্চল-৫ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সদরুল হাসান ও উর্মি হাসান দুজনেই কর অঞ্চল-৫-এর ৯৪ সার্কেলের করদাতা। সদরুলের করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) ৮৯০২৯০৬৭০৪৪৫ এবং উর্মির টিআইএন ১৬৪৪৩১৯৭৪০৯৭। উর্মির টিআইএন ইস্যু হয় ২০২২ সালের ২৬ জুলাই। অথচ ওই টিআইএন ব্যবহার করে ২০১৭-১৮ করবর্ষের রিটার্ন দাখিলের তারিখ দেখানো হয়েছে ২০১৭ সালের ৭ নভেম্বর। একইভাবে ২০১৮-১৯ করবর্ষের রিটার্ন ২০১৮ সালের ১৯ নভেম্বর, ২০১৯-২০ করবর্ষের রিটার্ন ২০১৯ সালের ২০ নভেম্বর, ২০২০-২১ করবর্ষের রিটার্ন ২০২০ সালের ২৬ নভেম্বর এবং ২০২১-২২ করবর্ষের রিটার্ন ২০২১ সালের ২৮ নভেম্বর দাখিলের তথ্য রয়েছে। অর্থাৎ টিআইএন ইস্যুর আগেই ওই নম্বর ব্যবহার করে একাধিক রিটার্ন দাখিল করা হয়েছে। অন্যদিকে, সদরুলের ২০১৬-১৭ থেকে ২০১৯-২০ করবর্ষের রিটার্নে করদাতার স্বাক্ষর নেই। নিয়ম অনুযায়ী, করদাতার স্বাক্ষর ছাড়া রিটার্ন দাখিলের সুযোগ নেই।

ঘটনা যাচাইয়ে জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়েন ২০১৭ সাল থেকে কর্মরত সাবেক কর্মচারীরা। পরবর্তীতে সার্কেলের সাবেক কর্মী গাজী আমিনুল ইসলাম জালিয়াতির বিষয় স্বীকার করেন। তিনি জানিয়েছেন, করদাতা সদরুলের ২০১৬-২০১৭ হতে ২০২১-২০২২ করবর্ষের রিটার্নগুলো ২০২১ সালের ২৩ নভেম্বরের রিটার্ন রেজিস্ট্রারের ফাঁকা জায়গায় এন্ট্রি করেছেন। এছাড়া উর্মির ২০১৬-২০১৭ থেকে ২০২১-২০২২ করবর্ষের রিটার্নগুলো ২০২২ সালে রিটার্ন রেজিস্ট্রারের ফাঁকা জায়গায় এন্ট্রি করেছেন। এছাড়া তদন্তে কর আইনজীবীর সংশ্লিষ্টতাও উঠে এসেছে।

২০২৩ সালের আয়কর আইনের ২৭২ ধারায় আয়, সম্পদ, দায়, ব্যয় বা করযোগ্যতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ভুলভাবে উপস্থাপন করে কর ফাঁকি দিলে জরিমানার বিধান রয়েছে। কর ফাঁকির পরিমাণ ও তা শনাক্ত করতে যে সময় লাগে, তার ভিত্তিতে জরিমানার অঙ্ক নির্ধারণ করা হয়। একই আইনের ৩১২ ধারায় ইচ্ছাকৃতভাবে কর ফাঁকির চেষ্টা, আয় গোপন কিংবা সম্পদ, দায় ও ব্যয় সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য দেওয়াকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর ও সর্বনিম্ন ছয় মাস কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া ৩১৩ ধারায় জেনেশুনে মিথ্যা হিসাব বা বিবৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রেও কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে। ফলে রিটার্ন জালিয়াতি ও সম্পদ গোপনের ঘটনায় ফৌজদারি মামলা হতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চল এ বিষয়ে ফৌজদারি মামলা করার বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে জানা গেছে।

ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা, রিটার্নে নেই

সদরুলের ব্যাংক ও আর্থিক তথ্য বলছে, ২০১৯-২০ থেকে ২০২৫-২৬ করবর্ষ পর্যন্ত বিপুল এফডিআর পাওয়া গেছে। ২০১৯-২০ করবর্ষে ১১ কোটি ৮৮ লাখ ৯৭ হাজার ৪৬৮ টাকা, ২০২০-২১ করবর্ষে ১২ কোটি ৫৪ লাখ ২৭ হাজার ৪৫১ টাকা, ২০২১-২২ করবর্ষে ১৪ কোটি ৩০ লাখ ৯ হাজার ১১৫ টাকা, ২০২২-২৩ করবর্ষে ১৩ কোটি ৭০ লাখ ৭৭ হাজার ৩১৩ টাকা, ২০২৩-২৪ করবর্ষে ১৪ কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার ৯০০ টাকা, ২০২৪-২৫ করবর্ষে ১৪ কোটি ২৯ লাখ ৬৯ হাজার ১৯১ টাকা ও ২০২৫-২৬ করবর্ষে এফডিআর স্থিতি ছিল ১৮ কোটি ১৭ লাখ ৮১ হাজার ৭৭৯ টাকা। এফডিআরের বাইরে অন্যান্য ব্যাংক হিসাবেও অর্থের সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব অর্থও আয়কর নথিতে প্রদর্শিত হয়নি বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে। উর্মি হাসানও ব্যাংক-আর্থিক তথ্য গোপন করেছেন।

কর ফাঁকি ২০ কোটি টাকা

সদরুলের ২০১৯-২০ থেকে ২০২৫-২৬ করবর্ষ পর্যন্ত আয় ৩৬ কোটি ৮৪ লাখ ৯৪ হাজার ৯৭৪ টাকা। এর বিপরীতে কর ফাঁকি ১১ কোটি ২২ লাখ ৫৩ হাজার ৪৫৭ টাকা ও জরিমানা ৫ কোটি ৬৯ লাখ ৭৪ হাজার ৩১৩ টাকা। তার কাছ থেকে সরকারের পাওনা ১৬ কোটি ৯২ লাখ ২৭ হাজার ৭৭০ টাকা। এর মধ্যে ২০২২-২৩ করবর্ষেই ৭ কোটি ৪১ লাখ ৭১ হাজার ৪০৩ টাকা। উর্মির ২০২৩-২৪ করবর্ষেই আয় ৫ কোটি ৪৫ লাখ ৩২ হাজার ৬৪১ টাকা। এর বিপরীতে কর ফাঁকি ১ কোটি ৭৩ লাখ ৭ হাজার ৪৫৫ টাকা ও জরিমানা ৫১ লাখ ৯২ হাজার ২৩৬ টাকা। ২০২৪-২৫ করবর্ষে আয় ৫৯ লাখ ৩৫ হাজার ৬৬৬ টাকা। এই দুই বছরে তার কর ফাঁকি দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৩০ লাখ ৯৩ হাজার ২৫৭ টাকা।

পরিবারের এফডিআর ২৬ কোটি

সদরুল ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে ২৬ কোটি ৭ লাখ ৭১ হাজার ৫৭৮ টাকার এফডিআর আছে। এর মধ্যে রাইসা হাসানের নামে ৭৫ লাখ ১৪ হাজার ৭৬ টাকা, পারিসা হাসানের নামে ৭৫ লাখ ১৪ হাজার ৭৬ টাকা, উর্মি হাসানের নামে ৩ কোটি ৪১ লাখ ৮৬ হাজার ৯৩৪ টাকা ও সদরুল হাসানের নামে ২১ কোটি ১৫ লাখ ৫৬ হাজার ৪৯২ টাকা এফডিআর রয়েছে। এই এফডিআরের সবগুলো হিসাব জব্দ করে রেখেছে আয়কর গোয়েন্দা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আয়কর বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, একজন কর্মচারীর দায় স্বীকারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তার একার পক্ষে এসব রিটার্ন নথিভুক্ত করা সম্ভব, নাকি সংশ্লিষ্ট সার্কেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের তাদের অনুমোদনেই এসব এন্ট্রি হয়েছিল-তা খতিয়ে দেখা দরকার। একইসঙ্গে কর আইনজীবী জাল রিটার্ন তৈরির বিষয়ে জানতেন কি না। নথিতে থাকা স্বাক্ষর ও দাখিলের তথ্য কীভাবে যাচাই করা হয়েছিল ও রিটার্ন নেয়ার সময় কোনো কর্মকর্তা এসব অসঙ্গতি শনাক্ত করেছিলেন কি না-তাও তদন্তের দাবি রাখে। জালিয়াতির বিষয় জানতে করদাতা সদরুল হাসান ও উর্মি হাসানের সঙ্গে মুঠোফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি।