জুলাই থেকে ভ্যাট রিটার্নের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া অনলাইনে

এনবিআর চেয়ারম্যান

আগামী জুলাই মাস থেকে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি অনলাইনে বাধ্যতামূলক করতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান। একই সঙ্গে শুল্কায়ন, কর আদায় এবং অভ্যন্তরীণ নজরদারির ক্ষেত্রে বিদেশি সফটওয়্যার কোম্পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় প্রযুক্তি ও নিজস্ব প্রকৌশলীদের ওপর ভরসা করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার বলেও জানান তিনি।

শনিবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে এনবিআর চেয়ারম্যান রাজস্ব প্রশাসনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার এই রূপরেখা তুলে ধরেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) যৌথ উদ্যোগে ‘সবার আগে বাংলাদেশ: রোডম্যাপ ফর ট্রেড, গ্রোথ অ্যান্ড ইকোনমিক ডিপ্লোমেসি ২০২৬’ শীর্ষক এই কনফারেন্সের আয়োজন করা হয়। ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণকে সামনে রেখে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণ ও অর্থনৈতিক কূটনীতির প্রসার নিয়ে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে রাজস্ব খাতে অটোমেশনের নানা দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে এনবিআর চেয়ারম্যান জানান, রাজস্ব প্রশাসনে বর্তমানে অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু করাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তবে এই প্রযুক্তিগত রূপান্তরে বিদেশি কোম্পানির চেয়ে দেশের নিজস্ব জনবল, বিশেষ করে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে পাস করা সফটওয়্যার প্রকৌশলীদের কাজে লাগানোর ওপর জোর দিচ্ছেন তিনি। অর্থ মন্ত্রণালয়ে কাজ করার সময় সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা নির্ধারণের ‘আইবাস’ সিস্টেম এবং বর্তমানে আয়কর দেওয়ার ‘ই-রিটার্ন’ সিস্টেম দেশীয় প্রযুক্তিতে সফলভাবে সচল থাকার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, দেশীয় সফটওয়্যার হওয়ার কারণে যেকোনো প্রয়োজনে বা কারিগরি ত্রুটিতে খুব দ্রুত ডেভেলপারদের সাথে যোগাযোগ করা যায়। সরকারের নীতিগত কোনো পরিবর্তন এলে প্রয়োজন অনুযায়ী সিস্টেমে দ্রুত রদবদল আনা সম্ভব হয়।

অন্যদিকে, ভেন্ডর-নির্ভর ‘ই-ভ্যাট’ সিস্টেমে ছোটখাটো পরিবর্তন আনতে গেলেও অনেক সময় ও জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এই সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করতেই আগামী জুলাই থেকে ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের পুরো প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অনলাইনে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল ও আধুনিক করতে এনবিআর ‘স্ট্রেনদেনিং ডোমেস্টিক রেভিনিউ মোবিলাইজেশন প্রজেক্ট’ নামে একটি নতুন ফ্যাসিলিটিজ ডিজিটালাইজেশন প্রকল্পের কাজ শুরু করেছে। এনবিআর চেয়ারম্যান স্পষ্ট করেন, নতুন এই ডিজিটাল আর্কিটেকচারের মূল দর্শন হবে ‘সরকার একটাই’।

এরইমধ্যে কাস্টমসের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ‘অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড’-এর সাথে আয়করের ‘ই-রিটার্ন’ এবং ভ্যাটের ‘ই-ভ্যাট’ সিস্টেমের সংযোগ স্থাপনের কাজ এগিয়ে চলছে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহজ করতে প্রণীত ‘ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো’ সিস্টেমকেও অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডের সাথে সমন্বিত করা হচ্ছে। দেশের কাস্টমস বা শুল্ক স্টেশনগুলোতে আমদানি-রপ্তানি পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে ফিজিক্যাল এক্সামিনেশন বা কায়িক পরীক্ষার জন্য ঝুঁকিভিত্তিক নির্বাচন পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কোন পণ্যগুলো কায়িক পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হবে, তা নির্ধারণ করা হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত ডেটা বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে।

অ্যাসাইকুডা সিস্টেমে থাকা গত ৩০ বছরের আমদানি-রপ্তানির বিপুল তথ্যভাণ্ডার সংরক্ষিত ডেটাকে কাজে লাগিয়ে এই এআই-নির্ভর কার্যকর রিস্ক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম তৈরি করা হচ্ছে। তবে আঙ্কটাডের তৈরি অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে কোনো পরিবর্তনের অনুরোধ পাঠালে তা কার্যকর হতে অন্তত তিন মাস সময় লেগে যায়। এই দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো থেকে অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে ডেটা স্থানান্তরের কাজ চলছে। এই কাজ শেষ হলেই এআই-নির্ভর ফিজিক্যাল এক্সামিনেশন প্রক্রিয়া পুরোদমে শুরু করা যাবে বলে জানান তিনি।

ডিজিটালাইজেশনের এই সুবিধা কেবল সেবাগ্রহীতাদের জন্যই নয়, বরং এনবিআরের নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেশাগত জবাবদিহি নিশ্চিতেও ব্যবহার করা হবে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা সরকারি আইন ও বিধিবিধান কতটা যথাযথভাবে মেনে চলছেন এবং তাদের কাজে কোনো বিচ্যুতি ঘটছে কি না তার প্রতিটি বিষয় ডিজিটালি রেকর্ড করা হবে। পরবর্তীতে এই ‘পারফরম্যান্স মেজারমেন্ট সিস্টেম’-এর রেকর্ডের ভিত্তিতেই তাদের কাজের মূল্যায়ন করা হবে।