খোলাবাজারে ৪৮ কোটি টাকার কাপড়-এক্সেসরিজ বিক্রি

এমএইচসি ওয়্যারস লিমিটেড

** ২০২৫ সালে ১৭৭টি বিল অব এন্ট্রিতে আমদানি করা ৪৫২ মেট্রিক টন কাপড় ও এক্সেসরিজ বিক্রি করে দিয়েছে
** ৪৭টি ব্যাক টু ব্যাক এলসিতে প্রায় ১০ লাখ ডলারের এক্সেসরিজ সংগ্রহ করেছে, সেই এক্সেসরিজও বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে

বন্ড সুবিধায় আমদানি করা হয়েছে কাপড় ও এক্সেসরিজ পণ্য। কিন্তু শুল্কমুক্ত সুবিধার এই কাঁচামাল দিয়ে কোন পণ্য বা পোশাক তৈরি করা হয়নি। এমনকি রপ্তানিও করা হয়নি। সব কাপড় ও এক্সেসরিজ সরাসরি খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। তাও আবার এক বা দুই মেট্রিক নয়- প্রায় ৪৫২ মেট্রিক টন। এই কাপড় ও এক্সেসরিজ বিক্রির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান প্রায় সাড়ে ২৭ কোটি টাকা শুল্ককর ফাঁকি দিয়েছে। এখানে শেষ নয়, প্রতিষ্ঠানটি ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে প্রায় ১০ লাখ ডলারের এক্সেসরিজ পণ্য ক্রয় করলেও তা প্রতিষ্ঠানটির ওয়্যারহাউজে প্রবেশ করেনি। অর্থাৎ এই এক্সেসরিজ পণ্য সরাসরি খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে। যাতে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি মাত্র একবছরে প্রায় ২৯ কোটি শুল্ককর ফাঁকি দিয়ে এই বিপুল পরিমাণ বন্ডের কাঁচামাল বিক্রি করে দিয়েছে গাজীপুরের টঙ্গী এলাকার প্রতিষ্ঠান এমএইচসি ওয়্যারস (প্রা.) লিমিটেড। ঢাকা উত্তর কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের অভিযানে বন্ডের কাঁচামাল বিক্রি ও শুল্ককর ফাঁকি উঠে এসেছে। এনবিআর সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

সূত্রমতে, ২০১৪ বন্ড লাইসেন্স পায় গাজীপুরের টঙ্গী সাতাইশ এলাকার পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স এমএইচসি ওয়্যারস (প্রা.) লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি লাইসেন্স পাওয়ার পর থেকে-ই প্রতিষ্ঠানটি বন্ড সুবিধার কাঁচামাল বিক্রি করে আসছে। সম্প্রতি অভিযোগ ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকা উত্তর কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের একটি প্রিভেন্টিভ টিম প্রতিষ্ঠানটিতে অভিযান পরিচালনা করে। টিমের সদস্যরা প্রতিষ্ঠানটির ২০২৫ সালে ১৭৭টি বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে আমদানি করা ৪ লাখ ৫২ হাজার ৪৮৫ কেজি বা ৪৫২ মেট্রিক টন কাপড় ও এক্সেসরিজ ওয়্যারহাউজে পায়নি। এছাড়া এই কাপড় ও এক্সেসরিজ প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করেছে-প্রতিষ্ঠানের বন্ড রেজিস্ট্রারে এমন প্রমাণ পায়নি। এই কাপড় ও এক্সেসরিজ দিয়ে পোশাক তৈরি করে রপ্তানি করা হয়েছে-এমন প্রমাণও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা দেখাতে পারেনি। এই কাপড় ও এক্সেসরিজ প্রতিষ্ঠান বন্ড সুবিধায় আমদানি করে শুল্ককর ফাঁকি দিতে সরাসরি খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছেন বলে ধারণা করছেন কর্মকর্তারা। প্রিভেন্টিভ টিমের সদস্যরা এই নিয়ে প্রতিবেদন দিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমএইচসি ওয়্যার প্রা. লিমিটেড ২০২৫ সালে ১৬৩টি ও ২০২৬ সালে ১৪টিসহ মোট ১৭৭টি বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে শুল্কমুক্ত সুবিধায় ৪ লাখ ৫২ হাজার ৪৮৫ কেজি বা ৪৫২ মেট্রিক টন কাপড় ও এক্সেসরিজ আমদানি করেছে। যার শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ৩৫ কোটি ৯২ লাখ ৬৮ হাজার ৬৫৮ টাকা। যাতে প্রযোজ্য শুল্ককর ২৭ কোটি ৪৭ লাখ ৮ হাজার ১৪০ টাকা, যা প্রতিষ্ঠানটি ফাঁকি দিয়েছে। কাস্টমস আইন লঙ্ঘন ও বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করায় প্রতিষ্ঠানকে সম্প্রতি বন্ড কমিশনারেট থেকে দাবিনামা সম্বলিত কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়েছে।

অপরদিকে, প্রিভেন্টিভ টিমের সদস্যরা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের সময় দেখতে পান, প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫ সালে ৪৬টি ও ২০২৬ সালে একটিসহ মোট ৪৭টি ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে ১০ লাখ ২৪ হাজার ৫৪ ডলার এক্সেসরিজ কাঁচামাল সংগ্রহ করেছে। কিন্তু বন্ড কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানের বন্ড রেজিস্ট্রারে এই কাঁচামাল প্রবেশের কোন প্রমাণ পায়নি। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি এই কাঁচামাল সংগ্রহ করলেও তা ওয়্যারহাউজে প্রবেশ না করিয়ে খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছেন। অথবা প্রতিষ্ঠান এক্সেসরিজ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজস করে ভুয়া ব্যাক টু ব্যাক এলসি দেখিয়েছে। সংগ্রহ করা এই এক্সেসরিজ কাঁচামালের ওপর প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ ২৮ হাজার ৬৭২ টাকা ভ্যাট প্রতিষ্ঠানটি ফাঁকি দিয়েছে। ফাঁকি দেওয়া এই ভ্যাট পরিশোধে সম্প্রতি বন্ড উত্তর কমিশনারেট প্রতিষ্ঠানকে দাবিনামা সম্বলিত কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করেছে। একইসঙ্গে ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে সংগ্রহ করা এই কাঁচামাল কোথায় ব্যবহার করা হয়েছে-তাও জানতে চেয়েছে। আবার প্রিভেন্টিভ টিমের সদস্যরা পরিদর্শনের সময় দেখতে পান যে, প্রতিষ্ঠানটি অননুমোদিত শেড ও স্থানে বন্ডেড সুবিধার কাঁচামাল সংগ্রহ করেছে-যা ওয়্যারহাউ লাইসেন্সিং বিধিমালা, ২০২৪ এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এই বিষয়েও ব্যাখ্যা দিতে প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়েছে।

ঢাকা উত্তর কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই প্রতিষ্ঠানটি মাত্র এক বছরে আমদানি করা এই বিপুল পরিমাণ কাপড় ও এক্সেসরিজ বিক্রি করে দিয়েছে। এছাড়া ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে সংগ্রহ করা এক্সেসরিজও বিক্রি করে দিয়েছে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কমিশনারেট থেকে প্রিভেন্টিভ টিম পরিদর্শনে যাওয়ার পর এই ফাঁকি বের হয়েছে। এই ধরনের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। তবে এই প্রতিষ্ঠান অন্যান্য বছর একইভাবে বন্ড সুবিধার কাঁচামাল বিক্রি করে দিয়েছে কিনা-তা খতিয়ে দেখা হবে। অপরদিকে, এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে এমএইচসি ওয়্যারস (প্রা.) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদুল হক এর ব্যক্তিগত নাম্বারে একাধিক দিন ফোন দেওয়া হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।