জ্বরে আক্রান্ত ৯৮% রোগীর ছিল চিকুনগুনিয়া

২০২৫ সালে দেশে চিকুনগুনিয়া ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে পুরুষদের তুলনায় নারীরা বেশি আক্রান্ত হন। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে প্রথম দিকে সাধারণ জ্বর হিসেবে শনাক্ত হলেও পরে তা চিকুনগুনিয়া হিসেবে নিশ্চিত হয়। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালে জ্বরে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ৯৮ শতাংশ পরবর্তীতে মশাবাহিত এই গুরুতর রোগে আক্রান্ত হন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকার পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ডেল্টা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মোট ৪৪২ জন রোগীর ওপর বহুমাত্রিক ক্রস-সেকশনাল গবেষণাটি পরিচালিত হয়, যা গত বছরের আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে সম্পন্ন করা হয়েছে।

গত ১৭ এপ্রিল জার্মানির মিউনিখে অনুষ্ঠিত ইউরোপীয় সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (ইএসসিএমআইডি) এর বৈশ্বিক সম্মেলনে গবেষণাটি উপস্থাপন করা হয়। এটি পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশনের প্রাতিষ্ঠানিক পর্যালোচনা বোর্ডের অনুমোদনও পেয়েছে। গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ফলে জীবনমানের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব বিশ্লেষণ করা। গবেষণায় দেখা যায়, রোগীদের মধ্যে ৪৩৩ জন অর্থাৎ প্রায় ৯৮ শতাংশ আগে জ্বরে আক্রান্ত ছিলেন। এসব রোগীর জ্বর সর্বনিম্ন তিন দিন থেকে শুরু করে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হয়, এবং ২২ শতাংশ রোগীকে পুরোপুরি শয্যাশায়ী অবস্থায় থাকতে হয়েছে।

গবেষণায় চিকুনগুনিয়ায় কাবু হওয়া রোগীদের মধ্যে ৭১ শতাংশের মাঝে হাঁটু, গোড়ালি ও অস্থিসন্ধিতে গুরুতর প্রভাবিত করার প্রমাণ মিলেছে। অন্য উপসর্গের মধ্যে ৫৯ শতাংশ রোগীর পেশি ব্যথা, ৫৩ শতাংশের ফুসকুড়ি, ৪২ শতাংশের বমি, ১৫ শতাংশের ডায়রিয়া, চোখের পেছনে ব্যথা ১৩ শতাংশের, মুখের ঘা ১২ দশমিক ২ শতাংশের এবং মাথাব্যথা পাওয়া গেছে সাড়ে ৭ শতাংশের। আরটি-পিসিআর পজিটিভ মিলেছে ২৭ শতাংশের। পেটে ব্যথা ৯ দশমিক ৭ শতাংশ, ৬ শতাংশ রোগী পেট ফোলা থাকার তথ্য-প্রমাণও মিলেছে। রোগটি নিয়ে মাঝারিভাবে বিষণ্ণ ছিলেন ৫০ শতাংশ।

রোগীদের অস্থিসন্ধি আক্রান্ত হওয়ার অনুপাত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশের ছিল হাঁটুতে ব্যথা। ৫৮ শতাংশের গোড়ালি, ছোট জয়েন্টগুলোতে ৪৮ শতাংশের, ৩০ শতাংশের ব্যথা ছিল কনুইয়ে। গবেষকরা জানান, এসব রোগীর মধ্যে শুধু শরীরের গিঁটে ব্যথায় কাতর হয়েছে সর্বোচ্চ ৯৭ শতাংশ। ৭১ শতাংশের শরীরে মিলেছে অস্থিসন্ধিতে দুলুনি ও স্পর্শকাতরতা। এ ছাড়া আক্রান্তদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৭৬ শতাংশই টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং আইজিএম পজিটিভ ৭৪ শতাংশের। রোগটি নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন ও বিষণ্ণ ছিলেন ৪৯ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে ট্রপিক্যাল ডিজিজ অ্যান্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ডা. মোহাম্মদ জাহিদ হাসান বলেন, চিকুনগুনিয়া রোগীদের মহামারি সংক্রান্ত বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করা এই গবেষণার প্রধান লক্ষ্য ছিল। চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. আবু সাইফ মোহাম্মদ লুৎফুল কবির বলেন, ২০২৫ সালের জুলাই-আগস্টের দিকে চট্টগ্রামে টানা কয়েক মাস চিকুনগুনিয়ার ভয়াবহতা দেখা যায়। হঠাৎ কেন এত বেশি রোগী রোগটিতে আক্রান্ত হয়েছে তার বিস্তারিত তুলে ধরতেই গবেষণাটির উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা ভবিষ্যতে চিকিৎসা সেবা প্রদানে বড় ভমিকা রাখবে।

ডা. এইচ এম হামিদুল্লাহ মেহেদী বলেন, গবেষণায় পুরুষদের চেয়ে নারীরা চিকুনগুনিয়ায় বেশি আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্তদের জীবনযাত্রার মানের উল্লেখযোগ্য অবনতিও ঘটেছে, যেখানে নারীরা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রমাণ মিলেছে। রোগীরা শরীরের প্রতিটি জয়েন্টে অতিমাত্রায় ব্যথায় কাতর হওয়ার একাধিক তথ্য পেয়েছি গবেষণায়।

গবেষণার নেতৃত্ব দেন ট্রপিক্যাল ডিজিজ অ্যান্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ডা. মোহাম্মদ জাহিদ হাসান, ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক মো. শাহাবুল হুদা চৌধুরী, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুনা ইসলাম, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. আবু সাইফ মোহাম্মদ লুৎফুল কবির, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এইচ এম হামিদুল্লাহ মেহেদী, ডেল্টা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের প্রধান সাদিয়া ইসলাম, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেসিডেন্ট (ল্যাবরেটরি মেডিসিন) তানজিন নাহার, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ডা. জান্নাতুল ফারদৌস, আশিয়ান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক রিফায়া তাসনিম, পপুলার মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক কাজী তরিকুল ইসলাম ও আসিফ আহমেদ, সাউদার্ন মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক মো. আতিকেল ইসলাম চৌধুরী, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জুনিয়র কনসালট্যান্ট মাধবী কর্মকার, পিআই রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট মো. মাহির ফয়সাল আকাশ এবং জুনিয়র কনসালট্যান্ট মহিউদ্দিন শরীফ।