৬৫০০ কোটি ব্যয়েও বন্দরে ভিড়ছে না মাদার ভেসেল

পায়রা বন্দর

দক্ষিণাঞ্চলের বহুল আলোচিত উন্নয়ন প্রকল্প পায়রা বন্দর ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে একসময় কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের বড় আশা তৈরি হয়েছিল। সেই প্রত্যাশায় কৃষক, জেলে ও সাধারণ মানুষ প্রায় সাত হাজার একর কৃষিজমি ছেড়ে দেন বন্দরের জন্য। ২০১৬ সালে কাজ শুরু হলেও এখনো প্রথম টার্মিনালে যাওয়ার সড়ক ও সেতুর নির্মাণ সম্পন্ন হয়নি। এদিকে রাবনাবাদ চ্যানেলে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ক্যাপিটাল ড্রেজিং করা হয়, যার লক্ষ্য ছিল ৭৫ কিলোমিটার চ্যানেলকে ১০ দশমিক ৫ মিটার গভীর করে মাদার ভেসেল চলাচলের উপযোগী করা।

নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্রের দাবি, গত দুই বছরে পায়রা বন্দরে কোনো মাদার ভেসেল ভিড়েনি। বর্তমানে চ্যানেলের নাব্য অনেক স্থানে কমে ৫ থেকে ৬ দশমিক ৫ মিটারে নেমে আসায় বড় জাহাজ প্রবেশ করতে পারছে না। বন্দর সূত্র জানায়, সর্বশেষ গত ১৯ মার্চ ‘ডেজার্ট ভিক্টোরি’ নামের একটি কয়লাবাহী মাদার ভেসেল চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছে, সেখান থেকে লাইটারিংয়ের মাধ্যমে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে নেওয়া হয়। অর্থাৎ পায়রায় সরাসরি বড় জাহাজ ভিড়তে পারছে না। এদিকে স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পটি কার্যত রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়ের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও তার প্রত্যাশিত সুফল মিলছে না। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে একটি সিন্ডিকেট এই অনিয়মে জড়িত—এমন অভিযোগও উঠেছে।

বন্দরসংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এত টাকা খরচ করে ক্যাপিটাল ড্রেজিং না করে যদি নিজস্ব ড্রেজার কেনা হতো, তবে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে চ্যানেলটি জাহাজ চলাচলের উপযোগী নাব্য বজায় রাখা সম্ভব হতো। বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ফার্স্ট টার্মিনাল পর্যন্ত ছয় লেন সড়কের কাজ শেষ পর্যায়ে। আন্ধারমানিক নদীর ওপর চার লেন সেতুর কাজও প্রায় ৭৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। সব ঠিক থাকলে ২০২৬ সালের শেষ দিকে স্থলপথে সরাসরি পণ্য খালাসের কার্যক্রম চালুর আশা করা হচ্ছে।

রাবনাবাদ চ্যানেলের ড্রেজিং কাজ ২০২১ সালে শুরু হয়ে ২০২৩ সালে শেষ হয়। বেলজিয়ামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জান-ডি-লুন এই খননকাজ সম্পন্ন করে। তবে ছয় মাসের মধ্যেই দ্রুত পলি জমে চ্যানেলের নাব্য কমে যাওয়ায় ড্রেজিংয়ের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বর্তমানে কোথাও কোথাও নাব্য কমে সাড়ে ৫ মিটারের কাছাকাছি নেমে এসেছে। পায়রা বন্দরের ওয়েবসাইটে মে মাসের তথ্য অনুযায়ী, চ্যানেলের গড় নাব্য ৫ দশমিক ৪ থেকে ৫ দশমিক ৯ মিটারের মধ্যে ওঠানামা করছে। জোয়ারের সময় কিছুটা গভীরতা বাড়লেও ভাটায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়, ফলে এই নাব্য দিয়ে বড় ড্রাফটের জাহাজ চ্যানেলে প্রবেশ করতে পারছে না।

লালুয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শওকত হোসেন তপন বিশ্বাস বলেন, ‘২০২১ সালে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের সিদ্ধান্তটি বাস্তবসম্মত ছিল না। এটি ছিল নিজস্ব গোয়ার্তুমির ফল। টাকাটাই জলে গেছে।’ পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইট অনুসারে, হিমালয় থেকে আসা বছরে ৪০ কোটি ঘনমিটার পলি এই চ্যানেল ভরাট করে দেয়। এটি বড় প্রযুক্তিগত ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ। সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১২ লাখ ঘনমিটার রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিং করে নাব্য ৯ মিটারে তোলার লক্ষ্য নিয়েছে এবং এই বছরের শেষের দিকে বন্দরটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

জাহাজের চালকরা জানান, ছোট কার্গো জাহাজ চলাচলের জন্যও অন্তত ৮ দশমিক ৭ মিটার গভীরতা প্রয়োজন। আর বড় জাহাজের জন্য দরকার ১২ মিটারের বেশি। সেখানে বর্তমান নাব্য তার অনেক নিচে। ফলে পায়রা বন্দরের কোনো জেটিতে মাদার ভেসেল সরাসরি ভিড়তে পারে না। স্থানীয় জেলে আফসার আলী বলেন, ‘এটি পলি বহনকারী নদী এলাকা। এখানে প্রতিদিন নতুন পলি জমে। নিয়মিত খনন না করলে দ্রুত চর জেগে ওঠে।’ ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর সদস্যসচিব ও ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক শরীফ জামিল বলেন, গঙ্গা-মেঘনা অববাহিকা থেকে আসা বিপুল পলি এসে রাবনাবাদ চ্যানেলটি দ্রুত হয়ে যাবে।

তবে সেই সময় প্রকৃত পরিস্থিতি বিবেচনায় না নিয়েই গভীর সমুদ্রবন্দর ও ভারী শিল্প স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে পায়রা বন্দরে বড় জাহাজ প্রবেশ করতে না পারায় পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় সরকার নতুন করে রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১২ লাখ ঘনমিটার খননের মাধ্যমে নাব্য ৯ মিটারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি নিজস্ব ড্রেজার কেনার পরিকল্পনাও রয়েছে।

** পায়রা বন্দরে অতিরিক্ত ব্যয় ১,৪৪৫ কোটি টাকা