আয়ের চেয়ে দ্বিগুণ ব্যয়ে রেলওয়ে

নিরাপদ ও আরামদায়ক যাত্রার কারণে মানুষের প্রথম পছন্দ হয়ে থাকে রেলপথ। সারা বছরই রেল টিকিটের ব্যাপক চাহিদা দেখা যায়। তবে যাত্রীর চাপ বেশি থাকা সত্ত্বেও রেলওয়ের লোকসান ক্রমেই বাড়ছে। সর্বশেষ আর্থিক হিসাব অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ১ টাকা আয় করতে গড়ে ২ টাকা ৫৮ পয়সা ব্যয় করছে, অর্থাৎ ব্যয় আয়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। এতে প্রতি বছর প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার লোকসান গুনতে হচ্ছে রেলওয়েকে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, সবশেষ অর্থবছরেও রেলের লোকসানের পরিমাণ প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী পরিবহন এবং মালবাহী ট্রেনের চলাচল থাকলেও কেন এ লোকসান তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেলের এ সংকটের মূলে রয়েছে গভীরে গেঁথে থাকা দুর্নীতি ও অপরিকল্পিত ব্যয়। এ ছাড়া যাত্রী টিকিট পেলেও সেই আয়ের একটি বড় অংশ মাঝপথেই উধাও হয়ে যাচ্ছে।

সূত্রমতে, ট্রেনের জ্বালানি চুরি এবং ইঞ্জিন ও বগির খুচরা যন্ত্রাংশ কেনাকাটায় অতিমূল্য দেখানোর অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। গত এক দশকে রেলওয়ের উন্নয়নে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হলেও তার বড় অংশই অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হয়েছে, যা সরাসরি আয় বৃদ্ধিতে তেমন ভূমিকা রাখছে না। পাশাপাশি রাজনৈতিক বিবেচনায় কিছু স্টেশনে ট্রেনের বিরতি দেওয়ার কারণে যেখানে যাত্রী সংখ্যা কম, সেখানেও সেবা চালু রাখা হচ্ছে। ফলে রেলের পরিচালন ব্যয় আয়কে ছাড়িয়ে গেছে। এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, জনবল কাঠামোর ভার, পুরোনো ইঞ্জিনের উচ্চ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং জ্বালানি অপচয়ের কারণে ১ টাকা আয় করতে গড়ে ২ টাকা ৫৮ পয়সা খরচ হচ্ছে, যা কোনো সুস্থ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জন্য টেকসই নয়। তিনি আরও বলেন, একসময় লাভজনক এই খাত এখন ধারাবাহিকভাবে লোকসানে চলছে।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ১৫ বছরে রেলে বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি এবং লোকসান হয়েছে ২১ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ রেলকে প্রতি বছর গড়ে লোকসান গুনতে হয়েছে দেড় হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে বর্তমানে রেলের আয়ের চেয়ে ব্যয় আড়াই গুণের বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেলওয়ের লোকসানের অন্যতম কারণ দুর্নীতি ও অপরিকল্পিত ব্যয়। এ ছাড়া বিনা টিকিটে ভ্রমণ এবং প্রায় সব ট্রেনে অর্ধেকের কম কোচ (বগি) নিয়ে চলাচলের কারণে লোকসানের পরিমাণ বেড়েছে। অর্থাৎ শতভাগ কোচ নিয়ে যদি ট্রেন চলত এবং জনপ্রিয় রুটে যদি ট্রেনের সংখ্যা বাড়ত, তাহলে অপারেটিং রেশিও কমে যেত।

রেলের আয় বাড়াতে পণ্য পরিবহনের পরিসর আরও সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, অপারেশন বাড়াতে পারলে রেলের আয়ের পরিমাণও বৃদ্ধি পাবে। অপারেটিং রেশিও হলো একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক, যা মোট ব্যয়কে মোট আয় দিয়ে ভাগ করে নির্ধারণ করা হয়। এই অনুপাত যত কম থাকে, প্রতিষ্ঠান তত বেশি লাভজনক হিসেবে বিবেচিত হয়, আর বেশি হলে পরিচালন দক্ষতা দুর্বল বলে ধরা হয়। এ বিষয়ে পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, রেলের আর্থিক লাভজনকতা বাড়াতে ঢাকামুখী পণ্য পরিবহনে কন্টেইনার ব্যবস্থার আরও উন্নয়ন প্রয়োজন ছিল। তার মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে রেলের লোকসান কমানো সম্ভব হতো, তবে বর্তমানে এ ক্ষেত্রে তেমন অগ্রগতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, ‘বিগত সরকার আমলে রেলের উন্নয়নে কোনো মনোযোগ ছিল না। লুটপাট ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য। বর্তমান সরকার রেলের উন্নয়নে কাজ করবে। অপচয় ও দুর্নীতি কমাতে আমরা কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে একটি লোকসানি প্রতিষ্ঠান। এখানে ১ টাকা রোজগারের জন্য আড়াই টাকার মতো খরচ হয়। এটার পেছনে দুটি কারণ-রেলের দুর্নীতি ও অপচয়। এ অপচয় ও দুর্নীতি কমাতে আমরা কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছি।’