৪৬ লাখ শিশুকে বাদ রেখে হামের টিকা কার্যক্রম

হাম–রুবেলার জাতীয় টিকাদান ক্যাম্পেইনে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ত্রুটি ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে; একটি হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৪৬ লাখ শিশুকে বাদ রেখেই দেশজুড়ে টিকা দেওয়া হয়েছে, যা বিশেষজ্ঞদের মতে মার্চের শুরুতে শুরু হওয়া প্রাদুর্ভাব চার মাস পরও নিয়ন্ত্রণে না আসার অন্যতম কারণ হতে পারে। এদিকে গতকাল শনিবারও তিন শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ, ফলে দেশে হামে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫৩ জনে।

হাম নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার এপ্রিল থেকে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। ৫ এপ্রিল ঝুঁকিপূর্ণ ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলা ও পৌরসভায় হাম–রুবেলার জাতীয় ক্যাম্পেইনের সূচনা হয়। পরে ১২ এপ্রিল ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ, ময়মনসিংহ এবং বরিশাল সিটি করপোরেশনে কার্যক্রম চালু করা হয়। ২০ এপ্রিল থেকে এটি দেশব্যাপী বিস্তৃত হয়ে সব উপজেলা, জেলা, শহর ও সিটি করপোরেশনে শুরু হয় এবং ২০ মে শেষ হয়। তবে ২৮ জুন ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন শুরু হলে একই বয়সসীমার শিশুদের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। এই কর্মসূচির আওতায় ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য ২ কোটি ২৬ লাখকে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) অনুযায়ী নিয়মিত টিকাদানে শিশুর ৯ মাস বয়সে হামের প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়। তবে হাম–রুবেলার জাতীয় ক্যাম্পেইন শুরুর আগে সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী দেশের সব শিশুকে টিকার আওতায় আনা হবে। ইপিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ বয়সসীমায় দেশে মোট ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ জন শিশু রয়েছে এবং গত শুক্রবার পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তর লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে এই সংখ্যাই ব্যবহার করে আসছিল।

ভিটামিন এ এবং হাম–রুবেলার ক্ষেত্রে একই বয়সী শিশুদের সংখ্যায় পার্থক্য ৪৬ লাখ। এ ব্যাপারে ইপিআইয়ের উপপরিচালক হাসানুল মাহমুদ ৭ জুলাই বলেন, ৫ এপ্রিল টিকাদানের শুরুতে ৩০টি উপজেলায় শিশুর সংখ্যা ছিল অনুমিত। বাকি শিশুর সংখ্যা নির্ধারিত হয় ‘মাইক্রোপ্ল্যানিংয়ের’ ওপর ভিত্তি করে। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সংখ্যার সঙ্গে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সংখ্যার মিল আছে। তারপরও সংখ্যার পার্থক্যের বিষয়টি আমরা অনুসন্ধান করে দেখছি।’

বাগেরহাটের এক উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জানান, হাম–রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির আগে তড়িঘড়ি করে মাইক্রোপ্ল্যানিং করা হয়েছিল, ফলে কিছু শিশু বাদ পড়া অস্বাভাবিক নয়। ইপিআই সহায়িকা অনুযায়ী, মাইক্রোপ্ল্যানিংয়ে প্রতিটি উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের নাম, আয়তন, জনসংখ্যার তথ্য, টিকাদানের সংখ্যা, আগের বছরের উপাত্ত এবং মাঠকর্মীদের বিবরণ অন্তর্ভুক্ত থাকে। পাশাপাশি ওয়ার্ডভিত্তিক প্রতিটি টিকাকেন্দ্রের আওতাধীন এলাকার মোট জনসংখ্যা এবং টিকা পাওয়ার যোগ্য শিশুদের সংখ্যা সরেজমিনে যাচাই করে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।

বাস্তবে শিশু কত

টিকা কর্মসূচি ও ভিটামিন ‘এ’ কর্মসূচি—দুটিই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পৃথক দপ্তরের অধীনে পরিচালিত হলেও রাজধানীর মহাখালীতে এ দুই দপ্তরের দূরত্ব ২০০ গজেরও কম; তবু শিশু সংখ্যায় এত বড় পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভিটামিন ‘এ’ কর্মসূচি বাস্তবায়ন হয় জাতীয় পুষ্টি কর্মসূচির আওতায়। এ কর্মসূচির পরিচালক মো. ইউনূস আলী জানান, বিভিন্ন বয়সী শিশুদের হালনাগাদ তথ্য প্রতিটি জেলার সিভিল সার্জন কার্যালয়ে সংরক্ষিত থাকে। ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন শুরুর আগে তারা সব জেলার সিভিল সার্জনদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সেই ভিত্তিতেই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন, যেখানে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ২৬ লাখ।

মো. ইউনূস আলীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৭ জুলাই পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার ৯৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ শিশুকে ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়েছে। সংখ্যার হিসাবে ২ কোটি ২৩ লাখ। এর অর্থ ওই বয়সী ২ কোটি ২৩ লাখ শিশু আছেই। এদিকে গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে টিকার কোনো হিসাব দেওয়া হয়নি। আগের দিন অর্থাৎ ১০ জুলাই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ১০৩ শতাংশ শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হয়েছে, অর্থাৎ যত শিশুকে টিকা দেওয়ার কথা তার চেয়ে ৩ শতাংশ বেশি টিকা দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪টি শিশু। টিকা পেয়েছে ১ কোটি ৮৪ লাখ ৭৯ হাজার ৩৫৯টি শিশু।

জনস্বাস্থ্যবিদ ও টিকা বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের টিকাদানে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা যথাযথ ছিল না। ইপিআইয়ের সাবেক উপপরিচালক তাজুল এ বারি বলেন, ২০১০ সালের হাম–রুবেলার জাতীয় ক্যাম্পেইনে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ শিশু, তখন বয়সসীমা ছিল ৯ মাস থেকে ৫ বছর; বর্তমানে বয়সসীমা ৬ মাস থেকে ৫ বছর হওয়ায় শিশু সংখ্যার আরও বেশি হওয়ার কথা। অন্যদিকে জনস্বাস্থ্যবিদ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে–নজির আহমেদ মনে করেন, এখনো হাম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসার একটি বড় কারণ হলো সব শিশু টিকার আওতায় আসেনি। তাঁর মতে, ৪৬ লাখ শিশুর বাইরে থেকে যাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং এটি প্রমাণ করে যে জাতীয় পর্যায়ের এই দুর্যোগ মোকাবিলায় দায়িত্বপ্রাপ্তদের কাজে ঘাটতি ছিল। তিনি পুরো ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।