সরকারি চাকরিতে ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে কোনো কর্মচারী স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ বা পদত্যাগ করলে তিনি পেনশন সুবিধা পাওয়ার অধিকারী হবেন না—এমনটি রায়ে স্পষ্ট করেছে আপিল বিভাগ। পাশাপাশি আদালত উল্লেখ করেছে, সরকারি চাকরি স্বল্পমেয়াদি জীবিকার মাধ্যম নয়; বরং এটি একটি সুসংগঠিত পেশাজীবন, যেখানে ধারাবাহিকতা, জবাবদিহি এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি স্থায়ী আনুগত্য অপরিহার্য।
বাংলাদেশ সার্ভিস রুলসের যে বিধানে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলে পেনশন সুবিধা না পাওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেটিকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করে দেওয়া হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সরকারের করা আপিল মঞ্জুর করে তা বাতিল করেছেন সর্বোচ্চ আদালত। সম্প্রতি বিচারপতি মো. রেজাউল হকের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আপিল বিভাগ এ রায় দেন। গত ১১ মার্চ ঘোষিত এই রায়ের ২৮ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি গত বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। রায়টি লিখেছেন বিচারপতি ফারাহ মাহবুব। বিষয়টি আজ রোববার গণমাধ্যমে আসে।
রায় ঘোষণার দিন আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ, অনীক আর হক ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ। এছাড়া রিট আবেদনের পক্ষে রিটকারী মো. মাহবুব মোরশেদ নিজেই শুনানি করেন। পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণে আপিল বিভাগ বলেছেন, নির্ধারিত ২৫ বছরের যোগ্যতাসম্পন্ন চাকরিকাল পূর্ণ হওয়ার আগেই যদি অবসর ভাতা (পেনশন) ও অন্যান্য অবসর-সুবিধা অবাধে প্রদান করা হয়, তবে তা সরকারি চাকরিতে প্রত্যাশিত শৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকারকে দুর্বল করে দিতে পারে।
সরকারি চাকরিতে ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে স্বেচ্ছায় পদত্যাগে পেনশন নয়, এর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে আপিল বিভাগ বলেছেন, যদি কর্মকর্তারা নির্ধারিত সময়ের আগেই চাকরি থেকে পদত্যাগ করেও পূর্ণ পেনশন ও অবসর-সুবিধা ভোগ করতে পারেন, তবে কেউ কেউ সরকারি চাকরিকে কেবল অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ, মর্যাদা বা আর্থিক নিরাপত্তা অর্জনের একটি সাময়িক মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য চাকরি ত্যাগ করতে উৎসাহিত হতে পারেন। এর ফলে অকাল পদত্যাগের প্রবণতা বৃদ্ধি পেতে পারে, জনবল পরিকল্পনা ব্যাহত হতে পারে, অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদি সরকারি কর্মজীবনের সঙ্গে ঐতিহ্যগতভাবে যুক্ত দায়িত্ববোধ ও শৃঙ্খলা ক্ষুণ্ন হতে পারে। তাই ২৫ বছরের যোগ্যতাসম্পন্ন চাকরিকালের শর্তটি সরকারি চাকরিতে দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার, শৃঙ্খলা, সুশৃঙ্খল প্রশাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা রক্ষার লক্ষ্যে গৃহীত একটি যৌক্তিক ও নীতিগত সিদ্ধান্ত।
নথিপত্র অনুযায়ী, অতিরিক্ত জেলা জজ মাহবুব মোরশেদ (বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী) ১৯ বছর চাকরি শেষে ২০১১ সালে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে একই বছরের ৩১ জানুয়ারি থেকে তার পদত্যাগ কার্যকর করা হয়। পরে এককালীন পেনশন ও আনুতোষিক পাওয়ার জন্য তিনি আইন মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। এর প্রেক্ষিতে ২০১৫ সালে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কাছে চিঠি পাঠানো হয়। তবে ওই বছরের ২৫ মার্চ প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয় পেনশনসংক্রান্ত বিষয়টি ফেরত পাঠিয়ে আইন মন্ত্রণালয়কে জানায়।
ওই চিঠিতে বলা হয়, সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করলে আগের চাকরিকাল বাজেয়াপ্ত (যতদিন চাকরিতে ছিলেন) হবে। অর্থাৎ, পেনশনের জন্য তা গণনাযোগ্য হবে না (বিএসআর প্রথম খণ্ডের বিধি-৩০০, সেকশন-৩)। পেনশনারের (মাহবুব মোরশেদ) চাকরিকাল ২৫ বছর পূর্ণ হয়নি। তিনি ২৫ বছর পূর্তি সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট বিধানের আলোকে পেনশনের জন্য কোনো আবেদন করেননি বলে পেনশনপ্রাপ্ত নন (১৯৭৪ সালের গণকর্মচারী অবসর আইনের ধারা-৯)।
এ অবস্থায় বিধি-৩০০ এবং ওই চিঠির বৈধতা চ্যালেঞ্জে করে মাহবুব মোরশেদ ২০১৬ সালে রিট করেন। পরবর্তীতে শুনানি নিয়ে ২০১৬ সালের ৮ মে হাইকোর্ট রুল জারি করেন। এরপর রুলের শুনানি শেষে হাইকোর্ট ২০২১ সালের ১৮ মার্চ রায় দেন। রায়ে সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগের কারণে পেনশন না পাওয়াসংক্রান্ত বাংলাদেশ সার্ভিস রুলসের (বিএসআর) প্রথম খণ্ডের বিধি-৩০০ (এ) অংশটুকু সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে ঘোষণা করেন আদালত। পাশাপাশি ২০১৫ সালের ২৫ মার্চের ওই চিঠি আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও বাতিল ঘোষণা করেন।
রায়ে আরও বলা হয়, রায়ের অনুলিপি প্রাপ্তির ৯০ দিনের মধ্যে মাহবুব মোরশেদের চাকরির মেয়াদ অনুযায়ী পেনশনসহ অন্যান্য বকেয়া সুবিধা হিসাব করে মঞ্জুর করতে সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সার্ভিস রুলসের বিধি ৩০০ (এ) অনুযায়ী, কেউ স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলে কিংবা অসদাচরণ, দেউলিয়াত্ব, অদক্ষতা বা নির্ধারিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থতার কারণে চাকরি থেকে বরখাস্ত বা অপসারিত হলে তার চাকরি বাজেয়াপ্ত হিসেবে গণ্য হবে। তবে বিধি ৩০০ (বি)-তে উল্লেখ আছে, অন্য কোনো পেনশনযোগ্য চাকরিতে যোগদানের উদ্দেশ্যে দেওয়া পদত্যাগকে সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ হিসেবে বিবেচনা করা হবে না।
পরবর্তীতে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। আপিল বিভাগে করা ওই আবেদনে হাইকোর্টের দেয়া রায় বাতিল চাওয়া হয়। এরপর চলতি বছরের ১১ মার্চ রাষ্ট্রপক্ষের আপিল মঞ্জুর করে হাইকোর্টের রায় বাতিল করে দেন সর্বোচ্চ আদালত। আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর রিট আবেদনকারী মাহবুব মোরশেদ আজ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আপিল বিভাগের পুরো রায় এখনও হাতে পাইনি। রায় দেখার পর পর্যালোচনা করে রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’
