বিটিসিএলের এক প্রকল্পে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও টেন্ডারের শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে বিটিসিএলের চুক্তি বাতিল করে হুয়াওয়েকে কালো তালিকাভুক্ত করার সুপারিশ করেছে দুদকের অনুসন্ধানকারী দল। তবে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও সেই হুয়াওয়ের অর্থে দুই কর্মকর্তাকে চীন সফরে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে বিটিআরসি। অথচ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অর্থে বিদেশ সফরে সরকারের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা উপেক্ষা করে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের আতিথেয়তা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিটিআরসি সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২৪-২৬ জুন চীনের সাংহাইয়ে অনুষ্ঠেয় ‘মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস সাংহাই ২০২৬’ এবং নীতিনির্ধারক ফোরামে অংশ নিতে বিটিআরসির চেয়ারম্যানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে হুয়াওয়ে টেকনোলজিস (বাংলাদেশ) লিমিটেড। হুয়াওয়ের সেই আমন্ত্রণে চীনে যাওয়ার জন্য বিটিআরসি চেয়ারম্যানের অনুমোদনক্রমে সংস্থাটির দুজন কর্মকর্তাকে মনোনীত করা হয়েছে। তারা হলেন লিগ্যাল অ্যান্ড লাইসেন্সিং বিভাগের কমিশনার আবদুর রহমান সরদার এবং সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহজাদ পারভেজ মহিউদ্দিন।
গত ১৫ জুন বিটিআরসি থেকে মনোনীত দুই কর্মকর্তার চীন সফরের জন্য সরকারি আদেশ (জিও) জারির অনুরোধ জানিয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে একটি চিঠি পাঠানো হয়। ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, সাংহাইয়ে অনুষ্ঠেয় একটি সম্মেলনে অংশ নিতে বিটিআরসি চেয়ারম্যানকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছে হুয়াওয়ে টেকনোলজিস (বাংলাদেশ) লিমিটেড এবং এই সফরের সব খরচ বহন করবে প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে বলা হয়, ওই সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল গ্লোবাল সিস্টেম ফর মোবাইল কমিউনিকেশনস অথরিটি (জিএসএমএ), যার আমন্ত্রণের ভিত্তিতে সফরের পরিকল্পনা করা হয়। পরে চেয়ারম্যানের পাশাপাশি নিজেদের খরচে প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহানা আসিফ আসাদকেও সফরে নেওয়ার প্রস্তাব দেয় বিটিআরসি, এবং পুরো সফরের ব্যয় নিজস্ব অর্থায়নে বহনের কথা উল্লেখ করে তাদের জন্য জিও জারির অনুরোধ জানানো হয়।
গত ২৭ এপ্রিল বিটিআরসির পরিচালক (সেবা) লে. কর্নেল মো. কামরুল হাসান মামুন স্বাক্ষরিত এক নথিতে দেখা যায়, সংস্থাটি তাদের প্রস্তাবিত প্রতিনিধিদলের অনুকূলে জিও জারির জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানায়। যদিও শেষ পর্যস্ত সে প্রস্তাবটি অনুমোদন হয়নি। বিটিআরসির ওই নথিতে বলা হয়েছিল, এই সফরের সব খরচ বিটিআরসির সংশ্লিষ্ট খাত থেকে বহন করা যেতে পারে। অর্থাৎ, নিজেদের টাকায় চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাকে চীন সফরে নিতে চেয়েছিল বিটিআরসি।
বিটিআরসি সূত্রে জানা গেছে, শুরুতে এই সম্মেলনে সংস্থাটির নিজস্ব অর্থায়নে আইসিটি উপদেষ্টাসহ চেয়ারম্যানের চীন সফরের একটি প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল। তবে সরকারি অর্থায়নে বিদেশ ভ্রমণ বন্ধ থাকায় এবং সরকারি বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে নিজস্ব খরচে সফরের প্রস্তাব ঘিরে প্রশ্ন ওঠে। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত না হওয়ায় শেষ মুহূর্তে বিতর্কিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের অর্থায়নে কর্মকর্তাদের চীন পাঠানোর নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে জানা গেছে। দুদকের কালো তালিকাভুক্তির সুপারিশের মুখে থাকা একটি প্রতিষ্ঠানের অর্থে এই সফর নিয়ে কমিশনের ভেতরেও নানা প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ‘অপরিহার্য জাতীয় স্বার্থ ছাড়া’ বিদেশ ভ্রমণ নিরুৎসাহিত করা হলেও এবং ঠিকাদার বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে বিদেশ ভ্রমণ পরিহারের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও বিটিআরসির এই উদ্যোগ সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এ বিষয়ে জানতে বিটিআরসির প্রশাসন বিভাগের মহাপরিচালক মো. মেহেদী-উল-সহিদের সরকারি নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। পরে সংস্থাটির জনসংযোগ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে তিনি লিখিতভাবে প্রশ্ন পাঠাতে বলেন। প্রশ্ন পাঠানো হলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। এদিকে আমন্ত্রণের বিষয়ে জানতে চাইলে হুয়াওয়ে কমিউনিকেশন অফিসার তানভীর আহমেদ ইমেইলে প্রশ্ন পাঠাতে বলেন এবং প্রশ্ন পাঠানোর পর তিনি জানান, এ বিষয়ে তারা কোনো মন্তব্য করবেন না। যদিও এর আগে তিনি বলেছিলেন, বিটিআরসিকে চীনে অনুষ্ঠেয় একটি কনফারেন্সে অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবং হুয়াওয়ের আমন্ত্রণে যাওয়ায় সফরের ব্যয় বহনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে; এখন তারা যাবে কি যাবে না, তা সম্পূর্ণ বিটিআরসির সিদ্ধান্ত বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, বিটিআরসির দুই কর্মকর্তা চীন সফরের জন্য জিও জারির আবেদন করেছেন। তবে সেটি এখনও অনুমোদন করা হয়নি। বিটিআরসি কর্মকর্তাদের চীন সফরের প্রস্তাবের বিষয়ে জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব বিলকিস জাহান রিমি বলেন, ‘এ ধরনের কোনো সফরের প্রস্তাব যদি পাঠানো হয়েও থাকে, তবে মন্ত্রণালয় তা কোনোভাবেই অনুমোদন করবে না। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে কোনো সরঞ্জাম কেনা হলে তা পরীক্ষার জন্য বিদেশ যাওয়ার সুযোগ আছে। এ ছাড়া অন্য কোনো কারণে ঠিকাদারের টাকায় যাওয়া সম্ভব নয়।’
হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ
বিটিসিএলের ‘ফাইভ-জি উপযোগীকরণে অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক উন্নয়ন’ প্রকল্পে চীনা প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে ভয়াবহ অনিয়ম ও রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়ের প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সাম্প্রতিক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩০ সাল পর্যন্ত বিটিসিএলের ব্যান্ডউইথ চাহিদা যেখানে মাত্র ২৬ টেরাবাইট, সেখানে হুয়াওয়ে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তা পাঁচ গুণ বাড়িয়ে ১২৬ টেরাবাইট সক্ষমতার যন্ত্রপাতি সরবরাহ করেছে। এতে রাষ্ট্রের প্রায় ৩২৬ কোটি টাকা অপচয় হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞ সুপারিশ এবং দুদকের স্পষ্ট আপত্তি উপেক্ষা করা হয়েছিল বলেও জানানো হয়েছে।
দুদকের প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, হুয়াওয়ে চুক্তির শর্ত ভেঙে ফ্যাক্টরি প্রোডাকশন অ্যাকসেপ্টেন্স টেস্ট (এফপিএটি) সম্পন্ন হওয়ার আগেই নিয়মবহির্ভূতভাবে পণ্য বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে। সরঞ্জাম বন্দরে এনেই ১০০ কোটি টাকার পেমেন্টের জন্য একটি ব্যাংককে অনৈতিকভাবে চাপ দেওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। দুদকের মতে, হুয়াওয়ে টেন্ডার প্রক্রিয়ার গোপন তথ্য সংগ্রহ এবং নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে অনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করেছে। এই দুর্নীতির পেছনে তৎকালীন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট কাজ করেছে বলে দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, যার মূলহোতা হিসেবে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, হুয়াওয়ের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণে আর্থিক সুবিধা নিয়ে তিনি টেন্ডার দলিল ও চুক্তির শর্তের বাইরে গিয়ে হুয়াওয়েকে অযৌক্তিক সুবিধা দিয়েছেন।
হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে আরও বেশ কয়েকটি অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এসব প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। অনুসন্ধানে হুয়াওয়ের টেন্ডার মূল্যায়ন ও অনুমোদন-সংক্রান্ত এমন কিছু তথ্য উপস্থাপনের বিষয়টি উঠে এসেছে, যা সাধারণত গোপনীয় হিসেবে বিবেচিত। দুদকের অনুসন্ধানকারী দলের মতে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে অনৈতিক যোগাযোগ ছাড়া এসব তথ্য জানার সুযোগ ছিল না। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, হুয়াওয়ে বিভিন্ন চিঠিপত্র ও যোগাযোগের মাধ্যমে চলমান ক্রয় প্রক্রিয়ার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে, যা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬-এর সংশ্লিষ্ট বিধান লঙ্ঘনের শামিল। এ অবস্থায় হুয়াওয়ের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাতিল এবং প্রতিষ্ঠানটিকে কালো তালিকাভুক্ত করার জন্য সিপিটিইউ (বর্তমান বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি) ও বিটিসিএলকে সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ও পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
** হুয়াওয়ের চুক্তি বাতিল ও কালো তালিকাভুক্তির সুপারিশ
** টেলিটক-হুয়াওয়ে প্রকল্প: ঘুষ লেনদেন ২০ কোটি টাকা
** হুয়াওয়ের ফোনে ‘জি-বক্স’, ঝুঁকিতে গ্রাহকের তথ্য
