** প্লেট, নেকলেস, ফুলদানি, ঘড়ি, বাটি, ব্যাগ, পার্স, রিং, কলম, ইস্ত্রি, খেলনা, চামচ, ম্যাট ইত্যাদিকে ওষুধের কাঁচামাল দেখিয়ে অবৈধ রেয়াত নেয় এসিআই
** মাত্র দুইটি বিল অব এন্ট্রিতে অবৈধ রেয়াত নিয়েছে প্রায় ১ কোটি ৮ লাখ টাকা
** ব্যয় বা কেনাকাটার ক্ষেত্রেও সঠিকভাবে উৎসে ভ্যাট দেয় না, নেয় অবৈধ রেয়াত
** প্রমোশনাল আইটেমকে ভ্যাট আইন অনুযায়ী সেবামূলক কার্যক্রম বলছে এসিআই
ওষুধের প্রচার ও বিক্রি বাড়াতে চিকিৎসকদের দেওয়া হচ্ছে উপহার। সেই উপহারের তালিকায় ‘নেকলেস’ থেকে ‘প্লেট’-এমন কোন পণ্য বাদ নেই। উপহার হিসেবে দেওয়া এসব পণ্য ‘প্রমোশনাল আইটেম’ হিসেবে আমদানি করা হয়েছে। উপহারের এসব পণ্য ওষুধ তৈরির কোন উপাদান বা কাঁচামাল নয়, তবুও ওষুধের উপাদান দেখিয়ে নেয়া হয়েছে অবৈধ রেয়াত। দেশের বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী অ্যাডভান্স কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ (এসিআই) লিমিটেডের বিরুদ্ধে এই অবৈধ রেয়াত নিয়েছে। শুধু অবৈধ রেয়াত নয়, প্রতিষ্ঠানের ব্যয় বা কেনাকাটার ক্ষেত্রেও উৎসে ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আওতাধীন বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ)-মূসক এই অবৈধ রেয়াত ও ভ্যাট ফাঁকির প্রমাণ পেয়েছে। একটি মামলায় অবৈধ রেয়াত বাতিল করে চূড়ান্ত দাবিনামা জারি করা হয়েছে। এছাড়া অপর মামলায় উৎসে মূসক ফাঁকি ও অবৈধ রেয়াত নেয়ায় দাবিনামা সম্বলিত কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়েছে।
এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, ৫, ১০ ও ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিলে রেয়াত নেয়া যায়। এসিআই মাত্র দুইটি বিল অব এন্ট্রিতে আমদানি করা প্রমোশনাল আইটেমে প্রায় কোটি টাকার বেশি অবৈধ রেয়াত নিয়েছে। তার মানে কি পরিমাণ পণ্য আমদানি করা হয়েছে। এসব উপকরণ ওষুধের কোন কাঁচামাল নয়, তবুও প্রতিষ্ঠানটি অবৈধভাবে রেয়াত নিয়েছে। এনবিআরের নির্দেশনা অনুযায়ী, ওষুধের কোন উপাদান না হওয়ায় প্রমোশনাল আইটেমে রেয়াত নেয়ার সুযোগ নেই। তবে এসিআই কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রমোশনাল আইটেম চিকিৎসকদের প্রণোদনা ও পণ্য পরিচিতির অন্যতম হাতিয়ার। প্রমোশনাল প্রদান কার্যক্রমটি মূসক আইন অনুযায়ী একটি সেবামূলক কার্যক্রম হওয়ায় রেয়াত গ্রহণে বাধা নেই।
এনবিআর সূত্রমতে, এসিআই লিমিটেডের বিরুদ্ধে প্রমোশনাল আইটেমে অবৈধ রেয়াত নেয়ার অভিযোগ পায় এলটিইউ। এরই প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটির দাখিলপত্র বা ভ্যাট রিটার্ন যাচাই করে তার সত্যতা পান ভ্যাট কর্মকর্তারা। চলতি বছরের ১২ মার্চ কর্মকর্তারা এলটিইউ এর কমিশনারকে একটি প্রতিবেদন হয়। যার প্রেক্ষিতে ২ এপ্রিল দাবিনামা সম্বলিত কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়। এসিআই এর পক্ষ থেকে লিখিত জবাব দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসিআই লিমিটেডের ২০২৫ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসের দাখিলপত্র যাচাই করা হয়েছে। যাতে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি এই দুইমাসে বেশ কয়েকটি প্রমোশনাল আইটেমে ১ কোটি ৮ লাখ ৩৮ হাজার ৩৯৮ টাকা রেয়াত নেয়া হয়েছে, যা বিধি বর্হিভূতভাবে রেয়াত নেয়া হয়েছে। কারণ, মূসক আইন ও এনবিআরের নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রমোশনাল আইটেমে রেয়াত গ্রহণ করা যায় না। যাচাইয়ে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি দুইটি বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ প্রমোশনাল আইটেম পণ্য আমদানি করেছে। যার মধ্যে রয়েছে-প্লেট, ইমিটেশন নেকলেস, ফটো ফ্রেম, ফুলদানি, দেয়াল ঘড়ি, কাঁচের বাটি সেট, ব্যাগ, মহিলাদের পার্স, ইমিটেশনের রিং, ছোট কলম, বৈদ্যুতিক খেলনা (আগ্নেয়গিরি), মশা প্রতিরোধক, মাল্টিপ্লাগ, বৈদ্যুতিক ইস্ত্রি, চামচ সেট, টেবিল ম্যাট, চপিং বোর্ড, ইমিটেশন ও পাথরের নেকলেস, আর্টিফিশিয়াল ফ্লাওয়ার, বলপেন, সাইড ব্যাগ, ট্রাভেল ব্যাগ, বালিশের কাভার ও আর্টিফিশিয়াল ট্রি ইত্যাদিতে অবৈধ রেয়াত গ্রহণ করেছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এনবিআরের ২০২১ সালের ২৭ ডিসেম্বর জারি করা চিঠি অনুযায়ী প্রমোশনাল আইটেম ওষুধ তৈরির কোন উপাদান নয়। ফলে এসব আইটেম ক্রয়ে পরিশোধিত মূসক রেয়াত নেয়ার সুযোগ নেই। প্রতিষ্ঠানটি অবৈধভাবে রেয়াত গ্রহণ করায় মূসক আইন ও বিধি অনুযায়ী তা বাতিলযোগ্য।
এনবিআর সূত্রমতে, মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ এর ৪৬ ধারা অনুযায়ী রেয়াত (উপকরণ কর রেয়াত) নেয়া যায়। ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যবহৃত পণ্য বা সেবা ক্রয়ের সময় যে মূসক (ভ্যাট) পরিশোধ করা হয়, সেই ভ্যাটের সম্পূর্ণ অংশই রেয়াতযোগ্য হতে পারে, যদি আইনগত শর্ত পূরণ হয়। অর্থাৎ রেয়াতের জন্য নির্দিষ্টভাবে ৫, ১০ ও ১৫ শতাংশ-এমন কোনো একক হার নির্ধারিত নেই। বরং যে হারে বৈধভাবে ইনপুট ভ্যাট পরিশোধ করা হয়েছে, সেই ভ্যাট রেয়াত হিসেবে সমন্বয় করা যায়। তবে সাধারণত আমদানিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট পরিশোধ করা হলেও সেই ভ্যাট প্রতিষ্ঠানগুলো রেয়াত নিতে পারে।
অপরদিকে, এসিআই লিমিটেড লিখিত জবাবে এলটিইউকে জানায়, প্রমোশনাল আইটেম প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় বৃদ্ধি বা ব্যবসা প্রসারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফলে রেয়াত বিধি বর্হিভূত হওয়ার কোন যৌক্তিক কারণ নেই। একটি পণ্যের উৎপাদন শুধু উপকরণ সংগ্রহ নয় ও ফ্যাক্টরিতে পণ্য তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং তা বিক্রয়ের মাধ্যমে ভোক্তার নিকট পৌঁছানো পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রমোশনাল আইটেম চিকিৎসকদের প্রণোদনা ও পণ্য পরিচিতির প্রদানের অন্যতম হাতিয়ার। প্রতিষ্ঠানের এই প্রমোশনাল আইটেম প্রদান কার্যক্রমটি মূল্য সংযোজন ও সম্পূরক শুল্ক শুল্ক আইন, ২০১২ এর ধারা ২(১৮ক) অনুযায়ী একটি সেবামূলক কার্যক্রম হওয়ায় এর উপর রেয়াত গ্রহণে বাধা নেই। এছাড়া ধারা ২(১৮) এর সংজ্ঞায় রেয়াত বর্হিভূত পণ্য ও সেবাসমূহের একটি তালিকা প্রদান করা হয়েছে, যেখানে এই প্রমোশনাল আইটেমের উল্লেখ নেই। আবার রেয়াত গ্রহণে আইনের ধারা ৪৬-এ প্রমোশনাল আইটেমের রেয়াত গ্রহণের বিষয়টি বারিত করা হয়নি। আইন অনুসারে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি প্রমোশনাল সেবা কার্যক্রম হিসেবে এর উপর রেয়াত নেয়া হয়েছে, যা আইন বর্হিভূত নয়। অপরদিকে, প্রতিষ্ঠানের জবাব ও শুনানি এবং প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এলটিইউ কমিশনার সম্প্রতি চূড়ান্ত দাবিনামা জারি করে। যাতে বলা হয়, প্রমোশনাল আইটেম ওষুধ তৈরির উপকরণ নয় বিধায় পরিশোধিত মূসক রেয়াত গ্রহণের সুযোগ নেই। ফলে এই রেয়াত বাতিল এবং প্রতিষ্ঠানের নিকট আদায়যোগ্য। আইনের ধারা ১২৭(১) অনুযায়ী অবৈধ এই রেয়াতের উপর সুদ আরোপ হবে।
অন্যদিকে, এসিআই এর ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ভ্যাট সংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই এবং নিরীক্ষা করে মূসক নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (ভ্যাট গোয়েন্দা)। সে প্রতিবেদন অনুযায়ী সম্প্রতি দাবিনামা সম্বলিত কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করে এলটিইউ। যাতে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছর বিভিন্ন ব্যয় বা কেনাকাটায় উৎসে ভ্যাট পরিশোধ করেনি। এই দুই অর্থবছর প্রতিষ্ঠানটির প্রযোজ্য উৎসে মূসক ১৪১ কোটি ৭৫ লাখ ৮৩ হাজার ২৪৮ টাকা। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি ৫৪ লাখ ২ হাজার ৪৫২ টাকা পরিশোধ না করে ফাঁকি দিয়েছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি এই দুই অর্থবছর মোট ২২৩ কোটি ৫৯ লাখ ৭৪ হাজার ৬৪৬ টাকা রেয়াত গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে ২১ লাখ ৭ হাজার ৭৫৮ টাকা অবৈধ রেয়াত গ্রহণ করেছে। এই উৎসে মূসক ও অবৈধ রেয়াত গ্রহণের বিষয়ে কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়েছে।
এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে অ্যাডভান্স কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ (এসিআই) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. আরিফ দৌলাকে ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। বক্তব্যের বিষয় তার ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে লিখে দেওয়া হলেও কোন জবাব দেয়নি। এছাড়া অ্যাডভান্স কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ (এসিআই) লিমিটেডের চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার (সিএফও) মো. মনির হোসেন খানকে ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে বক্তব্যের বিষয় লিখে দেওয়া হলেও তিনি কোন জবাব দেননি।
