পোশাক রপ্তানির ২৬ গুণ কাচামাল আসে চীন থেকে

যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানির ভলিউমে চীন ও ভিয়েতনামকে ছাড়িয়ে শীর্ষ অবস্থানে থাকলেও বাংলাদেশ এই বিপুল উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের বড় অংশই আমদানি করে, যার নিরঙ্কুশ উৎস চীন। রপ্তানিমুখী শিল্পের মোট কাঁচামালের প্রায় অর্ধেকই আসে দেশটি থেকে, বিশেষ করে ওভেন পোশাকের সুতা, কাপড় ও রাসায়নিকসহ বিভিন্ন উপকরণ আমদানিতে চীনই প্রধান ভরসা। এছাড়া শিল্পের ভারী যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে নানা ভোক্তাপণ্য পর্যন্ত প্রায় সবই আসে চীন থেকে, ফলে বাংলাদেশের মোট আমদানির ২৫ থেকে ২৭ শতাংশই আসে দেশটি থেকে। তবে বিপরীতে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি অত্যন্ত সীমিত, যা মোট রপ্তানির ২ শতাংশেরও কম।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এবারের চীন সফরে বাণিজ্য ও বিনিয়োগে কিছুটা অগ্রগতি আশা করছেন দেশের উদ্যোক্তা রপ্তানিকারকরা। সফরে এ-সংক্রান্ত ১৩টি সমঝোতা (এমওইউ) ও দুটি চুক্তি ও একটি প্রটোকল সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে চীনের জন্য আরও দুটি বিশেষ বাণিজ্য অঞ্চল নির্মাণ, ২০টি বৃত্তিমূলক কারিগরি শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, বাংলাদেশে চীনা ব্যাংক স্থাপন, প্রযুক্তি সহায়তা ইত্যাদি সম্পর্কিত বিষয় রয়েছে। ৪ দিনের চীন সফর আগামীকাল শুরু হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ চীন থেকে ১ হাজার ৮২০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে, যেখানে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী একই সময়ে চীনে রপ্তানি মাত্র ৬৯ কোটি ৪৫ লাখ ডলার। ফলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৫১ কোটি ডলার, অর্থাৎ বাংলাদেশ চীনে যে পরিমাণ রপ্তানি করে তার প্রায় ২৬ গুণেরও বেশি আমদানি করে। অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য চীনা বাজারে শতভাগ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার থাকা সত্ত্বেও রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি; ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে এই সুবিধা কার্যকর হয়, এর আগে ২০২০ সালে ৯৭ শতাংশ এবং ২০২২ সালে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যসহ আরও কিছু পণ্য যুক্ত করে ৯৮ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া হয়েছিল, আর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত চীন–আফ্রিকা ফোরামের সম্মেলনে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) জন্য শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধার ঘোষণা দেন।

ইপিবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত ১১ মাসে বাংলাদেশ চীনে ৭৪ কোটি ২৫ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যা ওই সময়ের মোট রপ্তানি আয়ের মাত্র ১ দশমিক ৭০ শতাংশ হলেও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেশি। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে মোট রপ্তানি ছিল ৬৯ কোটি ৪৫ লাখ ডলার, আর ২০২৩–২৪ অর্থবছরে তা ছিল ৭১ কোটি ৫৪ লাখ ডলার। পণ্যের মধ্যে চীনে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয় পাট ও পাটজাত পণ্য, যা চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে প্রায় ১৩ কোটি ডলারের; এরপর নিট পোশাক ৬ কোটি ৩৫ লাখ ডলার, হোম টেক্সটাইল ৮০ লাখ ডলারের কিছু কম, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য ৭ কোটি ডলারের কিছু বেশি এবং পাদুকা ১ কোটি ৪৯ লাখ ডলারের রপ্তানি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য-উপাত্ত বলছে, বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি আমদানি করে থাকে চীন থেকে। চীন থেকে আমদানি করা প্রধান পণ্যের মধ্যে রয়েছে শিল্প ও উৎপাদন খাতের কাঁচামাল, তৈরি পোশাকের ফেব্রিক্স, সুতাসহ প্রয়োজনীয় রাসায়নিক পণ্য, শিল্পের ভারী যন্ত্রপাতি ও ক্যাপিটাল মেশিনারিজ, রাসায়নিক ও সার, বড় অবকাঠামো নির্মাণের ভারী যন্ত্রপাতি ও স্টিল, বৈদ্যুতিক ও সব ধরনের ভোক্তাপণ্য। শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও চীনে কেন রপ্তানি বাড়ছে না জানতে চাইলে বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সভাপতি খোরশেদ আলম গতকাল বলেন, চীন সুবিধা দিয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষ থেকে গাফিলতি আছে। শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার পর এই সুবিধা কাজে লাগাতে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ইপিবি কিংবা বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং রপ্তানিকারকদের পক্ষ থেকে চীনা বাজারে প্রবেশ বাড়াতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, চীনা ভোক্তাদের চাহিদা নিয়ে কোনো গবেষণাও নেই। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, গত ১০ জুন চীনের কুনমিং শহরে অনুষ্ঠিত চীন–দক্ষিণ এশিয়া প্রদর্শনীতে বাংলাদেশকে বিনা মূল্যে ১০০টি স্টল বরাদ্দ দেওয়া হলেও সেখানে রপ্তানিযোগ্য মূলধারার পণ্য উপস্থাপন করা হয়নি; বরং সাধারণ হস্তশিল্প পণ্যই প্রদর্শিত হয়েছে, যার মধ্যে শুধু নকশিকাঁথার স্টলই ছিল ২০টি। এ ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে চীনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও প্রতিযোগিতামূলক বাজারে প্রবেশ সম্ভব নয় বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, চীনে রপ্তানি বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত কৌশল প্রয়োজন, এবং প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন চীন সফরে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ খাতে অগ্রগতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।