সালাম মুর্শেদীর ৫৫ কোটি টাকার আয় গোপন

আওয়ামী লীগ-সমর্থিত সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) ও ব্যবসায়ী নেতা আব্দুস সালাম মুর্শেদী ৫৫ কোটি টাকার বেশি মূল্যের সম্পদ ও আয় গোপন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারা জানান, ফিক্সড ডিপোজিট রিসিট (এফডিআর) ও নিজের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া অর্থের তথ্য না দেখিয়ে তিনি এই বিপুল পরিমাণ সম্পদ গোপন করেছেন।

এনবিআরের আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট ২০১৮-১৯ করবর্ষ থেকে শুরু করে এই সম্পদ গোপনের প্রমাণ পেয়েছে। তথ্যানুযায়ী, গোপন করা এফডিআর ও আমানতের পরিমাণ ২৩ কোটি টাকা থেকে ক্রমান্বয়ে বেড়ে ২০২৪-২৫ করবর্ষে ৩৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। তদন্তে আরও উঠে এসেছে, মুর্শেদী কয়েক বছর ধরে এনভয় গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কোম্পানি থেকে নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রায় ৩৩ কোটি টাকা গ্রহণ করেছেন, কিন্তু আয়কর রিটার্নে এই আয়ের কোনো তথ্য উল্লেখ করেননি।

এনবিআর হিসাব অনুযায়ী, কর ও জরিমানা মিলিয়ে এ ঘটনায় প্রায় ৩২ কোটি টাকা কর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে আরও কোনো গোপন সম্পদ ও আয় আছে কি না, জানতে তার স্ত্রী এবং দুই সন্তানের আয়কর রিটার্ন ও আর্থিক লেনদেনও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া মুর্শেদীকে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গ্রেপ্তার করা হয়। তখন থেকেই তিনি কারাগারে রয়েছেন। আয়কর গোয়েন্দা বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন, এ তদন্তের পরিপ্রেক্ষিতে তারা ইতিমধ্যে প্রায় ৯ কোটি ৭৬ লাখ টাকা কর হিসেবে আদায় করেছেন। ওই কর্মকর্তা জানান, মুর্শেদী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, এমন বিভিন্ন কোম্পানি থেকে তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রায় ৩৩ কোটি টাকা স্থানান্তরের প্রমাণ পেয়েছেন তদন্তকারীরা।

তিনি বলেন, ‘আমরা বিপুল পরিমাণ সম্পদ গোপন ও কর ফাঁকির আরও প্রমাণ পাব বলে আশা করছি।’ তবে মুর্শেদীর মেয়ে ব্যারিস্টার শেহরিন সালাম বলেন, প্রায় ২২ কোটি টাকার সম্পদের বিষয়ে কর কর্তৃপক্ষের দাবির কথা তাদের পরিবার জানত; পরবর্তীতে তারা মাসিক কিস্তিতে সেই অর্থ পরিশোধ করা শুরু করেছেন। শেহরিন বলেন, ‘কর কর্তৃপক্ষ প্রায় ১২ কোটি টাকা দাবি করেছিল। আমরা ইতিমধ্যে প্রায় ১০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছি।’ এর বাইরে তাদের পরিবার কর পরিশোধের আর কোনো দাবি বা নোটিশ পায়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন। পরিবারের অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধে নতুন কোনো তদন্তের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না দাবি করে তিনি বলেন, কর্তৃপক্ষ তাদের কাছে নতুন এই দাবির বিষয়ে কিছু জানায়নি।

আমরা এ বিষয়ে কিছুই জানি না। আর তারা [এনবিআর] নিজেদের মতো একটা হিসাব বসিয়ে দিয়েছে। অঙ্কটা এখনো ১০০ কোটি টাকায় পৌঁছায়নি, তা ভেবেই আমি অবাক হচ্ছি, বলেন তিনি। শেহরিন আরও বলেন, কর তদন্ত নিয়ে এমন প্রচারণা করদাতাদের নিয়ম মেনে কর প্রদানে নিরুৎসাহিত করতে পারে। তিনি বলেন, তাদের পরিবার কর্তৃপক্ষের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সব ধরনের সহযোগিতা করে আসছে। ওই আয়কর গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, করদাতা বা তার পরিবারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা তাদের ইউনিটের দায়িত্ব নয়।তিনি বলেন, গোপন করা আয় এবং ফাঁকি দেওয়া করের পরিমাণ চূড়ান্ত করার পর আমরা সেই তথ্য সংশ্লিষ্ট কর কার্যালয়ে পাঠিয়ে দিই। এরপর তারাই করদাতার সাথে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ করে থাকে।

কোম্পানির পরিশোধিত অর্থের কর নির্ধারণ

এনবিআরের আয়কর নীতি অনুবিভাগের সাবেক সদস্য অপূর্ব কান্তি দাস বলেন, কোনো কোম্পানি থেকে তার পরিচালককে দেওয়া অর্থের ধরনের ওপর ভিত্তি করে সেটিকে লভ্যাংশ আয় হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে এর ওপর ১৫ শতাংশ হারে কর প্রযোজ্য হতে পারে। তিনি বলেন, ‘অর্থ গ্রহণকারী ব্যক্তি যদি তার আয়কর রিটার্নে এই তথ্য গোপন করেন, তবে তাকে প্রযোজ্য করের পাশাপাশি জরিমানাও গুনতে হবে।’ তবে করের প্রকৃত হিসাব কেমন হবে, তা নির্ভর করে ওই অর্থ লভ্যাংশ হিসেবে নাকি ঋণের মতো অন্য কোনো ব্যবস্থার আওতায় নেওয়া হয়েছে, তার ওপর। সাবেক আয়কর কমিশনার বজলুল কবির ভূঞা বলেন, প্রচলিত আইনি বিধান অনুযায়ী কোনো কোম্পানির পরিচালক কোম্পানিকে ঋণ দিতে পারেন, কিন্তু কোম্পানি থেকে নিজে ঋণ নিতে পারেন না।

গুলশানের সম্পত্তি নিয়ে পৃথক মামলা

এদিকে ঢাকার গুলশান-২ এলাকায় ২৭ কাঠা সরকারি সম্পত্তি আত্মসাতের অভিযোগে মুর্শেদীসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে দায়ের করা একটি মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে।অভিযোগপত্র অনুযায়ী, আসামিরা নিজেদের পদের অপব্যবহার করে গুলশান আবাসিক এলাকার ওই প্লট-সংক্রান্ত জাল নথিপত্র তৈরি করেছিলেন। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত এক গেজেটে ওই সম্পত্তিটি ‘খ’ তালিকাভুক্ত পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে নথিভুক্ত ছিল। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, আসামিরা সম্পত্তিটি পরিত্যক্ত তালিকা থেকে বাদ না দিয়েই ভুয়া নথিপত্র তৈরি করেন। পরে হস্তান্তরের অনুমতি ও নামজারির মাধ্যমে তারা সেটি আত্মসাৎ করেন।

১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে সালাম মুর্শেদী বাংলাদেশের খ্যাতিমান ফুটবলার ছিলেন। পরে তিনি ব্যবসায় নামেন এবং তৈরি পোশাক রপ্তানি খাতে অবস্থান গড়ে তোলেন। তিনি ২০১০-১১ মেয়াদে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

** গুলশানের সেই বাড়ি ছাড়তে হবে সালাম মুর্শেদীকে
** সালাম মুর্শেদীসহ ১৩ জনের বিচার বিষয়ে সিদ্ধান্ত ৬ জুলাই
** স্ত্রীসহ সালাম মুর্শেদীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা
** গুলশানে প্লট দখল: সালাম মুর্শেদীর জামিন নামঞ্জুর
** সালাম মুর্শেদীর দখল করা বাড়িকে ‘পরিত্যক্ত সম্পত্তি’ ঘোষণা
** সালাম মুর্শেদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন ২৯ সেপ্টেম্বর
** সালাম মুর্শেদীর ২২ কোটি টাকা করফাঁকি, ব্যাংক হিসাব জব্দ
** সালাম মুর্শেদীর পরিবারের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চায় দুদক
** গুলশানে প্লট দখল: সালাম মুর্শেদীর জামিন নামঞ্জুর
** সালাম মুর্শেদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন পেছাল