প্রধানমন্ত্রীর সফরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নতুন প্রত্যাশা

সড়কের পাশে মানুষের দীর্ঘ সারি। কেউ ব্যস্ত ছবি তুলতে, কেউ অপেক্ষায় প্রধানমন্ত্রীকে একনজর দেখার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গাড়িবহর থামতেই ছড়িয়ে পড়ে উচ্ছ্বাস। গাড়ি থেকে নেমে সাধারণ মানুষের সঙ্গে হাত মেলান তিনি। কারও কাছে এটি জীবনের বিশেষ মুহূর্ত, আবার কারও কাছে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের উপলক্ষ। তবে ব্যক্তিগত আনন্দের বাইরেও প্রধানমন্ত্রীর এ সফর ঘিরে স্থানীয় মানুষের বড় প্রত্যাশা রয়েছে। তাদের আশা, এ সফরের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে, মোংলা বন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে এবং তৈরি হবে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ।

বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) এক দিনের সফরে সুন্দরবন, মোংলা বন্দর, নৌবাহিনীর ঘাঁটি ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিদর্শন শেষে রাজধানী ঢাকায় ফিরে যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিকেল ৫টার দিকে মোংলা হেলিপ্যাড থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন তিনি। এর আগে সকালে হেলিকপ্টারে সুন্দরবন পরিদর্শন শেষে খুলনার দাকোপ উপজেলার নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে অবতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। তাকে একনজর দেখতে সকাল থেকেই বিদ্যালয় মাঠের আশপাশ ও সড়কের দুই পাশে জড়ো হন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। সেখান থেকে নলিয়ান কোস্টগার্ডের পন্টুনে যাওয়ার পথে সাধারণ মানুষের সঙ্গে হাত মেলান এবং কুশল বিনিময় করেন তিনি। পরে নৌপথে সফরসঙ্গীদের নিয়ে মোংলা নৌঘাঁটিতে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী।

বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে দিগরাজ নৌঘাঁটি থেকে সড়কপথে মোংলা বন্দরের জেটি এলাকায় যান তারেক রহমান। সেখানে বিএনপির নেতা-কর্মীরা তাকে স্বাগত জানান। পরে বন্দরের বিভিন্ন স্থাপনা ঘুরে দেখেন তিনি। প্রায় ৫০ মিনিটের পরিদর্শনে জেটি সুবিধা, কনটেইনার ইয়ার্ড, পণ্য ওঠানো-নামানো ও সংরক্ষণব্যবস্থা এবং বন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, পণ্য খালাস দ্রুত করা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও অবকাঠামো আধুনিকায়নে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেন তিনি।

বন্দর পরিদর্শন শেষে বেজার প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলও ঘুরে দেখেন প্রধানমন্ত্রী। দক্ষিণাঞ্চলে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা এবং উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজ নেন তিনি। সফরে মোংলা নৌঘাঁটির ওয়ার্ডরুমে একটি সভায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। তবে সভার আলোচ্য বিষয় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কেউ কথা বলতে চাননি। সূত্র জানায়, সভায় প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী তিন মন্ত্রী এবং খুলনা ও বাগেরহাটের পাঁচ সংসদ সদস্য উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সফরে ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং সড়ক পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। এ ছাড়া ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বাগেরহাট-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল, খুলনা-১ আসনের সংসদ সদস্য আমির এজাজ, খুলনা-৪ আসনের এস কে আজিজুল বারী হেলাল এবং খুলনা-৫ আসনের মোহাম্মদ আলী আসগর লবি।

প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে সুন্দরবনের মধ্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল বা ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ ইউনিট (এফএসআরইউ) স্থাপনের বিষয়টি নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা ব্যক্তিরা কথা বলতে রাজি হননি। একজন সংসদ সদস্য অবশ্য দাবি করেছেন, এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।

মোংলা বন্দর বার্থ ও শিপ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. জুলফিকার আলী বলেন, বন্দরকেন্দ্রিক অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল ও এলএনজি টার্মিনাল-সংশ্লিষ্ট প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া গেলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বাগেরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি শেখ সাহেদ আলী রবি মনে করেন, চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমাতে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। এ জন্য চ্যানেলের নাব্যতা বৃদ্ধি, খনন কার্যক্রম এবং মোংলা কাস্টমস হাউস ও শুল্ক বিভাগের আধুনিকায়ন জরুরি।

পুনঃসংস্কার করা গাড়ি আমদানিকারকদের সংগঠন বারভিডার সভাপতি আব্দুল হক আমদানি-সংক্রান্ত বৈষম্য নিরসনের প্রত্যাশা জানিয়েছেন। তাঁর আশা, প্রধানমন্ত্রীর সফরের মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এ সফর অঞ্চলে বিনিয়োগের গতি বাড়াতে সহায়ক হবে।