চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি সামগ্রী ও পরিবেশবান্ধব গাড়ির ওপর উল্লেখযোগ্য শুল্ক-করছাড় দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আমদানি ব্যয় কমিয়ে ভোক্তাদের কাছে সহনীয় দামে পণ্য পৌঁছে দেওয়া এবং বাজার স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে বাজেট ঘোষণার চার মাস পেরিয়ে গেলেও এসব ছাড়ের সুফল বাজারে কতটা প্রতিফলিত হয়েছে, তা জানতে চায় এনবিআর। পণ্যের দাম কমেছে কি না এবং ভোক্তারা উপকৃত হয়েছেন কি না, তা মূল্যায়নে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের কাছে প্রতিবেদন চেয়ে সম্প্রতি চিঠি দিয়েছে সংস্থাটি।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ১৮টি পণ্য ও পণ্যশ্রেণিতে শুল্কের হার কমানো বা পরিবর্তনের ফলে বাজারে দাম কতটা কমেছে এবং ভোক্তারা এর সুফল পেয়েছেন কি না, তা বাজেট বিশ্লেষণের জন্য জানা প্রয়োজন। বিশেষ করে যেসব পণ্যে শুল্কের পাশাপাশি মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট এবং সম্পূরক শুল্ক কমানো হয়েছে, সেগুলোর আমদানি ব্যয়, বিক্রয়মূল্য ও ভোক্তা পর্যায়ের দামের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা জরুরি। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে খাদ্যপণ্য, কৃষি উপকরণ, চিকিৎসাসামগ্রী, ওষুধশিল্পের কাঁচামাল, কম্পিউটার ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম, বৈদ্যুতিক গাড়ি, প্লাগইন হাইব্রিড গাড়ি, বস্ত্র এবং বৈদ্যুতিক তিন চাকার যানবাহন। কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, শুল্ক-কর কমানোর মাধ্যমে সরকার রাজস্ব আয় কমালেও ভোক্তারা এর সুফল পাননি। বরং আমদানিকারকেরা লাভবান হয়েছেন। তাই শুধু শুল্ক কমিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন কঠোর তদারকি।
খেজুর ও মসলার দাম উল্টো বেড়েছে
এবারের বাজেটে খেজুর ও ৪৫ ধরনের মসলার ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে রাজধানীর কয়েকটি খুচরা বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মসলাজাতীয় পণ্যের দাম প্রায় আগের মতোই রয়েছে। বরং কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। কারওয়ান বাজারের খেজুর ও ফল ব্যবসায়ী মামুনুর রশিদ জানান, গত দুই সপ্তাহে পাইকারি বাজারে খেজুরের দাম কেজিতে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেড়েছে। একই বাজারের তুহিন জেনারেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. রায়হান বলেন, মসলার দামও কিছুটা বেড়েছে। তাঁর মতে, কর কমানোর সুফল ছোট ব্যবসায়ী কিংবা ভোক্তারা কেউই পাচ্ছেন না। সুবিধার পুরোটাই আমদানিকারকদের পকেটে যাচ্ছে।
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যমতে, এক বছরের ব্যবধানে সাধারণ মানের খেজুরের দাম প্রায় ১৭ শতাংশ বেড়েছে। আমদানি করা রসুনের দাম বেড়েছে ২১ শতাংশ। এ ছাড়া আদার দাম ৫ শতাংশ, লবঙ্গের ৪ শতাংশ এবং তেজপাতার দাম ২৫ শতাংশ বেড়েছে। তবে একই সময়ে জিরার দাম ১১ শতাংশ এবং এলাচের দাম প্রায় ১ শতাংশ কমেছে।
রেয়াতি সুবিধায় কমেনি ওষুধের দাম
এবারের বাজেটে ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে ১৫ শতাংশ মূসক ও ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহার করা হয়েছে। ওষুধশিল্পের ১৭টি নতুন কাঁচামালে রেয়াতি সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ক্যানসার প্রতিরোধী ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত ৯টি কাঁচামালকে শুল্ক-কর অব্যাহতির আওতায় আনা হয়েছে। সক্রিয় ওষুধের উপাদান বা এপিআই উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ৫৩টি নতুন কাঁচামালে শুল্ক-কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ওষুধশিল্পে ব্যবহৃত বায়োলজিক্যাল সেফটি ক্যাবিনেটের শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে। তবে কয়েকটি ওষুধের দোকানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় সব ওষুধই আগের দামে বিক্রি হচ্ছে। রাজধানীর তেজগাঁও এলাকার একটি ফার্মেসির মালিক জানান, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণ দেখিয়ে কিছু কোম্পানি ওষুধের সরবরাহ কমিয়েছে। দাম বাড়িয়ে এসব ওষুধ নতুন করে বাজারে আনা হবে বলে কোম্পানির প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন।
আরও যেসব পণ্যে শুল্ক কমেছে
এবারের বাজেটে ল্যাপটপ, নোটবুক, ডেস্কটপ কম্পিউটার, কম্পিউটার প্রিন্টার, মনিটর ও সার্ভারের ক্ষেত্রে শুল্ক ও মূসক শূন্য করা হয়েছে। তবে এসব পণ্যে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ আগাম কর এবং ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর বহাল রয়েছে। পয়েন্ট অব সেলস (পস) মেশিনের শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। পাশাপাশি সাড়ে ৭ শতাংশ আগাম কর পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়েছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জার বা চার্জিং স্টেশনের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ শুল্ক ও সাড়ে ৭ শতাংশ আগাম কর কমিয়ে শূন্য করা হয়েছে। ফ্ল্যাশ মেমোরি কার্ড বা এ ধরনের রেকর্ডবিহীন মাধ্যমে কাস্টমস শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।
এনবিআরের চিঠিতে প্লাগইন হাইব্রিড গাড়ির বিভিন্ন শ্রেণিতে শুল্ক কমানোর তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে। এক হাজার ৮০০ সিসি পর্যন্ত পেট্রোল ইঞ্জিনের প্লাগইন হাইব্রিড গাড়িতে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য এবং সম্পূরক শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। এক হাজার ৮০০ থেকে দুই হাজার সিসি পর্যন্ত পেট্রোল ইঞ্জিনের গাড়িতে সম্পূরক শুল্ক ৪৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে। এ ছাড়া ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত মূল্যের বৈদ্যুতিক গাড়িতে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য করা হয়েছে। ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত মূল্যের গাড়ির ক্ষেত্রে এ শুল্ক কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে।
