দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকারি খাদ্যশস্যের মজুত বেড়েছে। চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি দেশে সরকারি খাদ্যশস্যের মজুত ছিল ২২ লাখ ১০ হাজার ৬৭০ মেট্রিক টন। ৯ সেপ্টেম্বর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ লাখ ৫৯ হাজার ১৫৪ মেট্রিক টনে। অর্থাৎ এ সময়ে সরকারি খাদ্যশস্যের মজুত বেড়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৪৮৪ মেট্রিক টন।
খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সরকারি মজুতের মধ্যে চাল রয়েছে ২০ লাখ ৩৬ হাজার ১০২ মেট্রিক টন, গম ২ লাখ ৩২ হাজার ১৮৩ মেট্রিক টন এবং ধান ৩৪ হাজার ৭০ মেট্রিক টন। ফ্লোটিং মজুতসহ মোট খাদ্যশস্যের মজুত ২৩ লাখ ৫৯ হাজার ১৫৪ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ফ্লোটিং মজুত হিসেবে গম রয়েছে ৬৮ হাজার ৭২৩ মেট্রিক টন।
এর আগে ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট দেশে চাল ও গম মিলিয়ে সরকারি খাদ্যশস্যের মজুত ছিল ২১ লাখ ৩১ হাজার মেট্রিক টন। সে সময় চাল ছিল ১৯ লাখ ৫৪ হাজার টন এবং গম ১ লাখ ৭৭ হাজার টন। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে সরকারি খাদ্যশস্যের মজুত বেড়েছে ২ লাখ ২৮ হাজার ১৫৪ মেট্রিক টন। ২০২৪ সালে দেশে খাদ্যশস্যের মজুত ছিল ১৬ লাখ ৮৪ হাজার ৩৩০ মেট্রিক টন। ফলে ওই সময়ের তুলনায় বর্তমান মজুত বেড়েছে প্রায় ৬ লাখ ৭৫ হাজার টন।
শুধু খাদ্যশস্যের মজুত নয়, সরকারি গুদামের সংরক্ষণ সক্ষমতাও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগে দেশে খাদ্যশস্য সংরক্ষণের সক্ষমতা ছিল প্রায় ২৪ লাখ মেট্রিক টন। বর্তমানে তা বেড়ে ২৭ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে এই সক্ষমতা ৩৪ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ বিবেচনায় নিরাপদ খাদ্য মজুতের সীমা ১৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১৬ লাখ মেট্রিক টন করা হয়েছে। এদিকে চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের বোরো সংগ্রহ কার্যক্রমেও অগ্রগতি হয়েছে। ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ধান ও চাল মিলিয়ে মোট ১৬ লাখ ৮৩ হাজার ১৯৫ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ধান ৫ লাখ ৭৮ হাজার ১৪০ মেট্রিক টন, সিদ্ধ চাল ১২ লাখ ১ হাজার ৫৬৮ মেট্রিক টন এবং আতপ চাল ১ লাখ ৫ হাজার ৩১৩ মেট্রিক টন। এছাড়া ৫২৩ মেট্রিক টন গম সংগ্রহ করা হয়েছে।
খাদ্যশস্যের ঘাটতি মোকাবিলা ও মজুত শক্তিশালী রাখতে আমদানিও অব্যাহত রয়েছে। চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে মোট ৮ লাখ ২৭ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি পর্যায়ে ৬৫ হাজার ৮৬০ মেট্রিক টন এবং বেসরকারি পর্যায়ে ৭ লাখ ৬১ হাজার ৮৪০ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য আমদানি করা হয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সংগ্রহ শাখার যুগ্মসচিব মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, চলতি মৌসুমে দেশের অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য সংগ্রহ অভিযান সফল ও সন্তোষজনকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। সরকারি খাদ্যগুদামগুলোতে বর্তমানে চাল ও গমের পর্যাপ্ত ও নিরাপদ মজুত রয়েছে, যা যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। বাজারে চালের দাম স্থিতিশীল রাখা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় খাদ্য বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে সরকার প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের (এফপিএমইউ) মহাপরিচালক মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, জাতীয় চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খাদ্যশস্যের মজুত ও সংরক্ষণ সক্ষমতা সমন্বয়ের লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। এবার পর্যাপ্ত বৃষ্টি হওয়ায় আমন চাষে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হবে এবং বোরোর মতো আমন সংগ্রহও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি হবে বলে আশা করছে সরকার। আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। তবে বিকল্প হিসেবে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে গমের পরিবর্তে চাল দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে খাদ্য নিয়ে সরকারের কোনো সংকট বা দুশ্চিন্তার কারণ নেই।
খাদ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জামাল হোসেন বলেন, দেশের বর্তমান খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত সন্তোষজনক। সরকারি খাদ্যগুদামে পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য মজুতের পাশাপাশি সঠিক সংরক্ষণ ও খাদ্যের গুণগত মান বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রান্তিক কৃষকদের কাছ থেকে বোরো ধান ও চাল সংগ্রহ স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হচ্ছে, ফলে কৃষকেরা উৎপাদিত ধান ও চালের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, ওএমএস ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির মতো সরকারি খাদ্য বিতরণ কার্যক্রম সচল রাখতে খাদ্যগুদাম থেকে সরবরাহ ব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে সরকারি খাদ্যশস্য সংরক্ষণ সক্ষমতা ৩৪ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করার কাজ চলছে। পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য মজুতের লক্ষ্যমাত্রা ১৬ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করা হয়েছে। বর্তমানে সরকারি খাদ্যশস্যের মজুত দীর্ঘদিনের প্রচলিত নিরাপদ মজুতের মানদণ্ড ১৩ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টনের চেয়ে প্রায় ১০ লাখ টন বেশি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য মজুত থাকায় দেশের বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, মূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সহজ হবে।
