কুষ্টিয়ায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি, ক্ষতিগ্রস্ত ৩৫০ হেক্টর জমি

উজান থেকে নেমে আসা ঢলে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পদ্মা নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। এতে উপজেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ৫০ হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। তলিয়ে গেছে বিভিন্ন সড়ক ও যোগাযোগপথ। পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৩৫০ হেক্টর ফসলি জমি। শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ও নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় দুই ইউনিয়নের ১৬টি প্রাথমিক ও দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সাময়িকভাবে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, উজান থেকে ফারাক্কা হয়ে নেমে আসা ঢলের কারণে গত এক সপ্তাহ ধরে পদ্মার পানি দ্রুত বাড়ছে। প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৪ সেন্টিমিটার করে পানি বাড়ছে।

শুক্রবার সকাল ৯টায় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ১৩ দশমিক শূন্য ২ মিটার। ওই পয়েন্টে বিপৎসীমা ১৩ দশমিক ৮০ মিটার। অর্থাৎ, বিপৎসীমার মাত্র ৭৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে ওই পয়েন্টে পানির উচ্চতা ছিল ১২ দশমিক ৮৮ মিটার। ফলে মাত্র ১৮ ঘণ্টায় পানির উচ্চতা বেড়েছে ১৪ সেন্টিমিটার। তবে স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন গত কয়েকদিন ধরে যেভাবে পানি বাড়ছে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দৌলতপুরের নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের অধিকাংশ রাস্তাঘাট ও যোগাযোগপথ পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে দুই ইউনিয়নের ৫০ হাজারের বেশি মানুষ মূল ভূখণ্ডের থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। ফিলিপনগর, মরিচা, চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুরের বিভিন্ন এলাকার ফসলি জমিতেও পানি ঢুকে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রোপা আমন ধান, কলা, মরিচসহ বিভিন্ন ফসল। উপজেলা কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে, নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৩৫০ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পানি বাড়ায় বসতবাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছে নদীর পানি। ফলে গবাদিপশু রক্ষা, গোখাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সম্ভাব্য সংকট নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে দুর্গত মানুষের মধ্যে। চিলমারী ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য শেখ নুরুজ্জামান বলেন, ‘প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে চরম ভোগান্তিতে দিন কাটাচ্ছেন। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে এবং বন্যা দীর্ঘায়িত হলে বিশুদ্ধ পানি, শুকনা খাবার ও গোখাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে। দ্রুত সরকারি ত্রাণ ও জরুরি সহায়তা পৌঁছানো প্রয়োজন।’

চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বলেন, ‘উজান থেকে নেমে আসা ঢলে হঠাৎ পদ্মার পানি বেড়ে ইউনিয়নের সব গ্রাম ও ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। অধিকাংশ রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন। মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। পরিস্থিতি সম্পর্কে উপজেলা প্রশাসনকে নিয়মিত অবহিত করা হচ্ছে।’

বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন শেষে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মুশতাক আহম্মেদ বলেন, ‘পানি বাড়ায় শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ও নিরাপত্তায় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা না করলেও বন্যাকবলিত এলাকার ১৮টি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আপাতত ক্লাসে আসতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে এবং পাঠদান স্থগিত রাখা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘পাঠদান স্থগিত থাকলেও বিদ্যালয় ভবনগুলো খোলা থাকবে। বন্যায় গৃহহীন হয়ে পড়া মানুষ চাইলে সেখানে আশ্রয় নিতে পারবে।’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহেনা পারভীন বলেন, ‘নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৩৫০ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব নিরূপণে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও কৃষি পরামর্শ দেওয়া হবে।’ দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ বলেন, ‘বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন সতর্ক রয়েছে। দুর্গত এলাকার পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পানিবন্দি মানুষের সহায়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইতোমধ্যে চিলমারী ইউনিয়নের অসহায় ও দুঃস্থ পরিবারের মধ্যে সীমিত পরিসরে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।’