দেশের শীর্ষ ১০টি শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অর্থ পাচার, কর ফাঁকি ও দুর্নীতির অভিযোগে প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার দাবি করেছে সরকারের গঠিত যৌথ তদন্ত দল। এ প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে দেওয়ানি মামলা দায়েরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)-এর প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন জানান, তদন্তে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে এবং এখন আদালতে প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে মামলা করা হবে।
সরকারের তদন্তের আওতায় থাকা ১০টি শিল্পগোষ্ঠী হলো— এস আলম, বেক্সিমকো, নাবিল, সামিট, ওরিয়ন, জেমকন, নাসা, বসুন্ধরা, সিকদার ও আরামিট। শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, এসব গ্রুপের শীর্ষ ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত আর্থিক লেনদেন ও সম্পদও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। জানা গেছে, তদন্তে নেতৃত্ব ও সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। মূল অনুসন্ধান পরিচালনা করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আইনি সহায়তা দিয়েছে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়।
তদন্তে প্রতিটি শিল্পগোষ্ঠীকে পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ আইন ও অর্থ পাচারবিরোধী বিধিমালা অনুসরণ করে অনুসন্ধান পরিচালনা করা হয় এবং পুরো প্রক্রিয়ায় কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়েছে। সরকারি সূত্র জানায়, এসব শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ গ্রহণ, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অবৈধ সুবিধা আদায়, ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদ অর্জন, কর ও শুল্ক ফাঁকি এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হয়েছে। এ বিষয়ে সিদ্ধান্তের কথা গত ২ ডিসেম্বর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ চিঠির মাধ্যমে বিএফআইইউকে জানায়। পরবর্তীতে ৬ জানুয়ারি যৌথ তদন্তের কাঠামো ও কার্যপদ্ধতি চূড়ান্ত করা হয়।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট বেশিরভাগ শিল্পগোষ্ঠীর ব্যাংক হিসাব ইতোমধ্যে জব্দ করেছে বিএফআইইউ। পাশাপাশি তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, ব্যাংক ঋণ, ঋণের ব্যবহার, অর্থের প্রবাহ, ব্যবসায়িক লেনদেন এবং ঋণের প্রকৃত সুবিধাভোগীদের বিষয়ে তদন্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, কানাডা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্ভাব্য সম্পদের তথ্য জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ পাঠানো হয়েছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক শেষে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)-এর সভাপতি ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন জানান, যেসব ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ পাচারের অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোকে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ায় এসব অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে সাধারণত তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগে। তবে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো আশাবাদী, ধাপে ধাপে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্থগুলো দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
