ঢাকার শিল্পাঞ্চলের তীব্র গ্যাস সংকট মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদে ভোলার গ্যাস এলএনজি আকারে সরবরাহের পরিকল্পনা করছে সরকার। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে বরিশাল হয়ে ঢাকা বা খুলনা পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগও বিবেচনায় রয়েছে। এলএনজি ও পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডকে (জিটিসিএল), যা মঙ্গলবার জ্বালানি বিভাগের এক বৈঠকে নির্ধারণ করা হয়।
দ্বীপ জেলা ভোলায় তিনটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে, যেখানে এখন পর্যন্ত ৯টি কূপ খনন করা হয়েছে। এসব কূপের দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১৯ কোটি ঘনফুট হলেও চাহিদার অভাবে বর্তমানে ৭–৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। উৎপাদন বাড়াতে পেট্রোবাংলা আরও ১৫টি কূপ খননের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে, যা সম্পন্ন হলে দৈনিক উৎপাদন অতিরিক্ত ৩০–৪০ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত বাড়তে পারে। বর্তমানে ভোলায় গ্যাসের মজুত প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ), যা ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ কারণে দেশের গ্যাস সংকট নিরসনে ভোলার গ্যাস দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এই গ্যাসকে কীভাবে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হবে, তা নিয়ে এখনো সিদ্ধান্তহীনতা রয়েছে। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সীমিত পরিসরে সিএনজি আকারে ঢাকায় গ্যাস সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি পায়নি।
একদিকে এলএনজি আকারে গ্যাস পরিবহন, অন্যদিকে পাইপলাইনের দুই সম্ভাব্য রুট—এই দুই বিকল্প নিয়েই এখন আলোচনা চলছে। স্বল্পমেয়াদে এলএনজি আমদানিকে সরকার অগ্রাধিকার দিলেও উচ্চমূল্যের কারণে ব্যবসায়ীদের আগ্রহ সীমিত। পাইপলাইন পরিকল্পনায় একটি রুট বরিশাল হয়ে সরাসরি ঢাকার আমিনবাজারে পৌঁছানোর কথা বলা হচ্ছে, অন্যটি বরিশাল হয়ে খুলনার দিকে যাবে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ভোলা-বরিশাল পাইপলাইনের সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হয় এবং তখন ঢাকায় গ্যাস সরবরাহের দিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এলএনজির পাশাপাশি ঢাকা পর্যন্ত পাইপলাইন সম্প্রসারণের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। তবে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর খুলনা রুটটি আবার আলোচনায় এসেছে, এমনকি যশোর পর্যন্ত সম্প্রসারণের চিন্তাও রয়েছে। যদিও শিল্প মালিকদের মতে, তীব্র গ্যাস সংকটে থাকা ঢাকা-গাজীপুর শিল্পাঞ্চলকেই ভোলার গ্যাস সরবরাহে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেনের মতে, ভোলার গ্যাস আর কেবল একটি জেলার সম্পদ নয়, বরং এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠেছে। তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। তার মতে, স্বল্পমেয়াদে এলএনজি কিছুটা স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে পাইপলাইন নির্মাণ, স্থানীয় শিল্পায়ন এবং নতুন গ্যাস অনুসন্ধান—এই তিনটি উদ্যোগ সমন্বয় করেই এগোতে হবে। অন্যদিকে পেট্রোবাংলার পরিচালক (পরিকল্পনা) আব্দুল মান্নান পাটওয়ারী জানান, ভোলার গ্যাস ব্যবহারের বিভিন্ন উপায় নিয়ে সাম্প্রতিক বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। এলএনজি ও পাইপলাইনের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্প-কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে গ্যাসের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা যায় কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। তবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি; সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে সরকার এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
ভোলার গুরুত্ব
দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট, কিন্তু সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ২৬০-২৬৫ কোটি ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১১৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থাকছে। যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে শিল্প উৎপাদনে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদনও দিন দিন কমছে। এক সময় দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুটে। দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানার উৎপাদনও দ্রুত কমছে। কয়েক বছর আগেও যেখানে প্রতিদিন ১৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেত, এখন তা ৮০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে।
খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের গ্যাস সংকট এখন আর শুধু জ্বালানি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ, বিনিয়োগ ও অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। একদিকে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে, অন্যদিকে এলএনজি আমদানিও চাহিদা অনুযায়ী বাড়ানো যাচ্ছে না। নতুন টার্মিনাল ও অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা থাকায় গ্যাসের ঘাটতি বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে ভোলার গ্যাস একটি বড় সমাধান হতে পারে। ১৯৯৫ সালে বাপেক্স ভোলার শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে এবং ২০০৯ সালে সেখানে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়। পরবর্তীকালে ভোলা নর্থ ও ইলিশা নামে আরও গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়। সাম্প্রতিক থ্রিডি সিসমিক জরিপে শাহবাজপুর থেকে ইলিশা পর্যন্ত প্রায় ৬০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ২ দশমিক ৪২৩ টিসিএফ উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের সম্ভাবনা পাওয়া গেছে। এ ছাড়া চরফ্যাসন এলাকায় টুডি জরিপে আরও ২ দশমিক ৬৮৬ টিসিএফ গ্যাসের সম্ভাবনার তথ্য মিলেছে। বিভিন্ন মূল্যায়নে ভোলার সম্ভাব্য মজুত পাঁচ থেকে আট টিসিএফ পর্যন্ত হতে পারে।
ব্যর্থ সিএনজি, ব্যয়বহুল এলএনজি
আওয়ামী লীগ সরকার ভোলার গ্যাস সিএনজি আকারে ঢাকায় আনতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইন্ট্রাকোকে অনুমতি দিয়েছিল। শুরুতে দৈনিক ৫০ লাখ ঘনফুট এবং পরে আড়াই কোটি ঘনফুট সরবরাহের লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবে দিনে সর্বোচ্চ ৮–৯ লাখ ঘনফুট গ্যাস পরিবহন সম্ভব হয়, যা বর্তমানে আরও কমে গেছে। অতিরিক্ত ব্যয়, পরিবহন জটিলতা ও সীমিত সক্ষমতার কারণে প্রকল্পটি কার্যত ব্যর্থ হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে সরকার বিকল্প পথ হিসেবে এলএনজি আকারে গ্যাস রূপান্তর করে জাহাজে মূল ভূখণ্ডে আনার পরিকল্পনা করে। এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকও হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন শিল্প সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। পরে ১৬০টি শিল্প প্রতিষ্ঠানের মতামত চাওয়া হলেও আশানুরূপ সাড়া মেলেনি; অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান প্রতি ঘনমিটার ৩০–৪০ টাকা দামে আগ্রহ দেখায়। তবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের এক গণশুনানিতে এলএনজি সরবরাহের সম্ভাব্য দাম ৪৭ টাকা ৫০ পয়সা প্রস্তাব করা হলে শিল্পোদ্যোক্তারা জানান, এত বেশি দামে গ্যাস কিনে প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদন চালানো কঠিন হবে।
সূত্র জানিয়েছে, ভোলা থেকে এলএনজি আকারে গ্যাস আনার বিষয়ে ৯টি প্রতিষ্ঠান আগ্রহপত্র জমা দেয়। এখান থেকে গ্যাজপ্রম, সিসিডিসি, সিএমসিসহ ৪টি প্রতিষ্ঠানের সংক্ষিপ্ত তালিকা করা হয়েছে। গতকালের বৈঠকে অংশ নেওয়া একটি গ্যাস কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ঢাকা-গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের তীব্র গ্যাস সংকটের স্বল্পমেয়াদি সমাধান হিসেবে এলএনজির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। আর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে পাইপলাইনের বিষয়ে কথা হয়েছে। বিইআরসির সর্বশেষ নির্ধারিত দাম অনুযায়ী, বিদ্যমান শিল্পের জন্য পাইপলাইনের গ্যাস প্রতি ঘনমিটার ৩০ টাকা। তবে নতুন শিল্প ও অতিরিক্ত ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই দাম ৪০ টাকা। আর ভোলা থেকে সিএনজি করে আনা গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ৪৭ টাকা ৬০ পয়সা।
পাইপলাইনের রুট
দীর্ঘদিন ধরে ভোলা-বরিশাল-খুলনা বা ভোলা-বরিশাল-ঢাকা পাইপলাইন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। ঢাকা-বরিশাল অংশের পাইপলাইনের সম্ভাব্যতা যাচাই আওয়ামী লীগের আমলেই সম্পন্ন হয় এবং পরবর্তী সময়ে বরিশাল-ঢাকা পাইপলাইনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারও ভোলা-বরিশাল-ঢাকা পাইপলাইন বিষয়ে আগ্রহী ছিল। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সম্প্রতি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে নতুন সিদ্ধান্ত হয়। প্রথম ধাপে ভোলা-বরিশাল-খুলনা পাইপলাইন নির্মাণ করা হবে। এই গ্যাস যাবে খুলনার রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্রে। যশোর, খুলনা ও বরিশালে আবাসিকে গ্যাস দেওয়া হবে। রূপসা কেন্দ্রের বিদ্যুৎ যাবে সিরাজগঞ্জে। তখন সিরাজগঞ্জের বিদ্যুৎকেন্দ্রর গ্যাস এলেঙ্গা হয়ে চন্দ্রা, আশুলিয়ায় দেওয়া হবে। এরপর গ্যাসের মজুত ও উৎপাদন পর্যাপ্ত থাকলে বরিশাল থেকে ঢাকা পর্যন্ত পাইপলাইন সম্প্রসারণ করা হবে।
ভোলা থেকে বরিশাল পর্যন্ত গ্যাস আনতে ২০২৩ সালে আনুমানিক এক হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬৫ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপনের প্রস্তাব করেছিল জিটিসিএল। ঢাকার আমিনবাজার পর্যন্ত এই পাইপলাইনের মোট দৈর্ঘ্য হতে পারে প্রায় ১৭৫ কিলোমিটার । বরিশাল-ঢাকা অংশের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘গ্যাজপ্রম’ এ প্রকল্পে আগ্রহ দেখিয়েছে। অন্যদিকে, ভোলা থেকে বরিশাল হয়ে খুলনা পর্যন্ত গ্যাস নিতে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণ করতে হবে। শিল্প মালিকদের মতে ঢাকা ও গাজীপুর অঞ্চলে গ্যাসের সংকট বেশি। তাই ভোলার গ্যাস এ অঞ্চলের জন্য বেশি প্রয়োজন। তার বলেন, খুলনায় শুধু ৮০০ মেগাওয়াটের রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্র ছাড়া বড় কোনো শিল্প এখন পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি। তাই ঢাকার অগ্রাধিকার বেশি হওয়া উচিত।
স্থানীয় উন্নয়ন
অনেক বিশ্লেষকের মতে, ভোলার গ্যাস প্রথমে স্থানীয় উন্নয়নেই কাজে লাগানো উচিত। ইতোমধ্যে সরকারি অর্থায়নে সার কারখানার জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে এবং বিসিক শিল্পনগরী, শিল্পাঞ্চল ও ইপিজেড গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি শেলটেক সিরামিক কারখানা চালু হয়েছে এবং প্রাণ-আরএফএল বড় বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। তাদের মতে, বিপুল ব্যয়ে গ্যাস অন্যত্র সরবরাহের বদলে ভোলাতেই সার কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিরামিক, কাচ, রাসায়নিক ও গ্যাসভিত্তিক ভারী শিল্প গড়ে তোলা গেলে দক্ষিণাঞ্চলে নতুন শিল্পবিপ্লব ঘটতে পারে। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং স্থানীয় অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
