অনলাইনে জুয়া-বেটিং সংশ্লিষ্ট লেনদেন বেড়েছে

দেশে নগদ লেনদেনের ব্যবহার ধীরে ধীরে কমছে। কিন্তু একই সময়ে অনলাইন জুয়া, বেটিং ও ক্রিপ্টোকারেন্সি–সংক্রান্ত সন্দেহজনক লেনদেন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এখনো দেশের মোট নগদ লেনদেনের অর্ধেকের বেশি ঢাকা বিভাগকে ঘিরেই কেন্দ্রীভূত। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)-এর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের কৌশলগত বিশ্লেষণ প্রতিবেদনে এ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নগদ লেনদেনের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ কমে ৩ কোটি ৩১ লাখ ৬০ হাজারে নেমেছে। একই সময়ে এসব লেনদেনের মোট মূল্য ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ৪৩৬ ট্রিলিয়ন টাকায়। বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের মোট নগদ লেনদেনের ৫৪ দশমিক ৬২ শতাংশই হয়েছে ঢাকা বিভাগে। রাজধানীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকা-, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঘনত্বের কারণে নগদ লেনদেনে ঢাকার আধিপত্য সবচেয়ে বেশি।

ঢাকার পর সবচেয়ে বেশি নগদ লেনদেন হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে, যার অংশ ৯.৬০ শতাংশ। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর ও শিল্প-বাণিজ্যের কেন্দ্র হওয়ায় এই বিভাগ দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। এছাড়া খুলনায় ৯.৩৯ শতাংশ, রাজশাহীতে ৮.১০ শতাংশ এবং রংপুরে ৭.৩৩ শতাংশ নগদ লেনদেন হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিল্প, কৃষি ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের বিস্তারের কারণে এসব বিভাগে নগদ লেনদেনের পরিমাণও বাড়ছে। অন্যদিকে ময়মনসিংহ, সিলেট ও বরিশাল—এই তিন বিভাগ মিলিয়ে মোট নগদ লেনদেনের অংশ ১২ শতাংশেরও কম। এর মধ্যে সিলেটে প্রবাসী আয় বেশি হলেও নগদ লেনদেন তুলনামূলক কম, যা ইঙ্গিত দেয়—প্রবাসী অর্থ বেশি আসছে ব্যাংকিং ও ডিজিটাল চ্যানেলে। আর কৃষিনির্ভর অর্থনীতির কারণে বরিশালে নগদ লেনদেনের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সব বিভাগেই নগদ উত্তোলনের তুলনায় জমার পরিমাণ বেশি। অর্থাৎ, জমা হওয়া অর্থের একটি অংশ পরে ইলেকট্রনিক মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয়েছে অথবা সিটিআর (ক্যাশ ট্রানজেকশন রিপোর্ট) দাখিলের সীমার নিচে উত্তোলন করা হয়েছে। শুধু ঢাকা বিভাগেই নগদ জমা হয়েছে ৫ হাজার ৯১৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন টাকা, বিপরীতে উত্তোলন হয়েছে ৫ হাজার ২৪৬ দশমিক ৩২ বিলিয়ন টাকা। চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহী বিভাগেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে।

এদিকে অনলাইন জুয়া, বেটিং ও ক্রিপ্টোকারেন্সি–সংক্রান্ত সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের প্রতিবেদন (এসটিআর-এসএআর) ২০২৪ সালে বেড়ে ১,০৪৬টিতে দাঁড়িয়েছে। বিএফআইইউর মতে, এ ধরনের লেনদেনের বৃদ্ধি অর্থপাচারসহ বিভিন্ন আর্থিক অপরাধের ঝুঁকি বাড়ার ইঙ্গিত দেয়। সংস্থাটি জানায়, নগদ লেনদেনের প্রবণতা নিয়মিত বিশ্লেষণের মাধ্যমে কোন খাতে ঝুঁকি বেশি, কোথায় অস্বাভাবিক লেনদেন হচ্ছে এবং নগদ অর্থ ব্যবহারের ধরণ কীভাবে বদলাচ্ছে—এসব বিষয় শনাক্ত করা হয়। এই বিশ্লেষণ তদারকি জোরদার, নীতিনির্ধারণ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দেয়।

এ বিষয়ে পলিসি থিংক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ সেন্টার (পিটিআইআরসি)-এর চেয়ারম্যান মাজেদুল হক বলেন, নগদ লেনদেন কমে যাওয়া অর্থনীতির ডিজিটাল রূপান্তরের ইতিবাচক লক্ষণ। তবে একই সঙ্গে অনলাইন জুয়া, বেটিং ও ক্রিপ্টোকারেন্সি–সংক্রান্ত সন্দেহজনক লেনদেন বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, ডিজিটাল লেনদেন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অপরাধীরাও প্রযুক্তির সুযোগ কাজে লাগিয়ে অর্থপাচার ও অবৈধ অর্থ স্থানান্তরের নতুন কৌশল ব্যবহার করছে। তাই এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় আর্থিক গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করা জরুরি।