এনটিএমসির সাবেক মহাপরিচালক ও বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের জলসিঁড়ি আবাসিক প্রকল্পের ‘জয়িতা’ ভবনের ৮ম ও ৯ম তলার ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালিয়ে ‘সাদা স্বর্ণ’সহ বিভিন্ন অলঙ্কার উদ্ধার করা হয়েছে। প্রাথমিক যাচাইয়ে এগুলো আসল স্বর্ণ ও হোয়াইট গোল্ড বলেই নিশ্চিত হওয়া গেছে। এছাড়া তল্লাশিতে দামী আসবাবপত্র, চেকবই, মানি রিসিট ও পোশাকসহ অন্তত শত কোটি টাকার অস্থাবর সম্পদের প্রমাণ পেয়েছে দুদক। তবে এখনো ইনভেন্টরি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়নি। চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত হলে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
সোমবার ও মঙ্গলবার দুদকের উপপরিচালক মো. হাফিজুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি দল জিয়াউল আহসানের জলসিঁড়ির আটতলা বাড়িতে ইনভেন্টরি কার্যক্রম পরিচালনা করে। বিষয়টি নিশ্চিত করে সংস্থার উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম জানান, আদালতের নির্দেশনা মেনে এই কার্যক্রম চলছে। অভিযান শেষ হলেও কিছু তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের পর বিস্তারিত জানানো হবে। এর আগে, গত ২৭ জানুয়ারি জিয়াউল আহসান ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্টদের নামে থাকা ক্রোককৃত স্থাবর সম্পত্তির তদারকি, ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আদালত বিভিন্ন জেলা প্রশাসক ও গণপূর্ত বিভাগকে ‘রিসিভার’ হিসেবে নিয়োগ দেয়। দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা মো. হাফিজুল ইসলামই এসব সম্পত্তির জন্য রিসিভার নিয়োগের আবেদন করেছিলেন।
২০২৫ সালের ২৩ জানুয়ারি প্রায় ৪০ কোটি ৮৭ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ৩৪২ কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেনের অভিযোগে জিয়াউল আহসান ও তার স্ত্রী নুসরাত জাহানের বিরুদ্ধে পৃথক দুইটি মামলা করে দুদক। ওই মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, জিয়াউল আহসানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্পেস ইনোভেশন লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানের একটি ব্যাংক হিসাবে ২৭ কোটি ১০ লাখ টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া এআই ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড ও এআই ল্যান্ডস্কেপ লিমিডেট নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের নামে ২৫ কোটি টাকা অস্বাভাবিক লেনদেন করা হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধানে জানা গেছে, জিয়াউল আহসানের ঢাকায় একটি আটতলাসহ পাঁচটি বাড়ি, একটি বাগানবাড়ি, তিনটি ফ্ল্যাট এবং ৩,০৩৩ দশমিক ৫১ শতাংশ জমি রয়েছে। এছাড়া তার মালিকানায় দুটি জিপ গাড়ি, শেয়ারবাজারে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার বিনিয়োগ, এক কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র এবং নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে ব্যাংক হিসাবে ৫৫ হাজার মার্কিন ডলার জমা রাখার তথ্য পাওয়া গেছে। তার স্ত্রীর নামেও ১৬৪ দশমিক ৯১ শতাংশ জমির প্লট এবং ৫০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ রয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এসব সম্পদ অর্জন করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, জিয়াউল আহসান ও নুসরাত জাহানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সাজগোজ লিমিটেডের তিন পরিচালক তাদের মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ১৬টি ব্যাংকের ৮২টি হিসাবে গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৩৯১ কোটি ২৭ লাখ টাকা জমা এবং ৩৯০ কোটি ৩৬ লাখ টাকা উত্তোলন করেছেন। এছাড়া নুসরাত জাহানের ব্যাংক হিসাব থেকে জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পে ৯১ লাখ ৭২ হাজার ৯১৫ টাকা এবং আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের হিসাবে ৩৭ লাখ ৮৪ হাজার ৮৪৫ টাকা স্থানান্তরের তথ্য পাওয়া গেছে।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে জিয়াউল আহসান অ্যান্টিগা অ্যান্ড বারবুডার নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। এ সময় তিনি ও তার পরিবার মালয়েশিয়ার দুটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে দুই লাখ মার্কিন ডলার পরিশোধ করেন। এছাড়া ওই দেশের পাঁচ বছর মেয়াদি বন্ডে প্রায় ১৩ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার অবৈধভাবে বিনিয়োগের তথ্যও পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, জিয়াউল আহসান দুবাইয়ের একটি ব্যাংক হিসাবে ২০ কোটি টাকা এবং আরেকটি হিসাবে ৭৫ কোটি টাকা পাচার করেছেন। পাশাপাশি মালয়েশিয়ার একটি ব্যাংক হিসাবে ৭৫ কোটি টাকা এবং যুক্তরাষ্ট্রের একটি ব্যাংক হিসাবেও বিপুল অর্থ পাচারের তথ্য মিলেছে। ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর দুদক তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধান টিম গঠন করে তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং অর্থপাচারের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
গত ১৯ আগস্ট গুম-খুনের ‘মাস্টারমাইন্ড’, ফোনকলে আড়িপাতা, মানুষের ব্যক্তিগত আলাপ রেকর্ড ও ফাঁস করা সেনাবাহিনীর চাকরিচ্যুত জিয়াউল আহসান, তার স্ত্রী-সন্তান এবং তাদের মালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের লেনদেন স্থগিত করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশন পাওয়া জিয়াউল সেনাবাহিনীর একজন প্রশিক্ষিত কমান্ডো ও প্যারাট্রুপার ছিলেন। ২০০৯ সালে মেজর থাকাকালে তিনি র্যাব-২ এর উপ-অধিনায়ক হন। সেই বছরই তিনি পদোন্নতি পেয়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হন এবং র্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখার পরিচালকের দায়িত্ব পান। র্যাবে দায়িত্ব পালনের সময় থেকেই জিয়াউল আহসান হয়ে উঠেছিলেন গণমাধ্যমে পরিচিত নাম।
কর্নেল পদে পদোন্নতির পর ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে জিয়াউল আহসানকে র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক হিসেবে বহাল রাখা হয়। ২০১৬ সালে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে উন্নীত করে তাকে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই)-এর পরিচালক করা হয়। পরবর্তী বছর ২০১৭ সালে তিনি এনটিএমসির পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান। পরে ২০২২ সালে সংস্থাটিতে মহাপরিচালক পদ সৃষ্টির পর তাকে সেই পদে নিয়োগ দিয়ে প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে রাখা হয়।
