উচ্চ মাত্রায় খেলাপি ঋণ ও সুশাসনের সংকটে দেশের ব্যাংক খাত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন উদ্যোগেও এ সংকটের টেকসই সমাধান হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাত সংস্কারে নতুন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। এতে ঋণ ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। প্রায় ১ হাজার ২৭৬ কোটি টাকার এ প্রকল্পের পুরো অর্থই দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইডিএ)।
‘ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২’ (এফএসএসপি-২) নামে প্রকল্পটি নিচ্ছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নেওয়া এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পটির কাজ চলতি মাসেই শুরু হওয়ার কথা। ২০৩১ সালের জুনে এর কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক দেবে প্রায় ১৫ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে প্রকল্পটির জন্য ২১২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে। মঙ্গলবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠেয় সভায় সভাপতিত্ব করবেন একনেক সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করেছে পরিকল্পনা কমিশন। কমিশনের সুপারিশে বলা হয়েছে, ব্যাংক খাতের সংস্কার, ব্যাংক রেজল্যুশন ও পুনর্গঠনের কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে খাতটির স্থিতিশীলতা বাড়ানো এবং সার্বিকভাবে আর্থিক খাতের সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করবে প্রকল্পটি। এ ছাড়া সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নের যে কথা বলা হয়েছে, তার সঙ্গেও প্রকল্পটি সংগতিপূর্ণ। এ কারণে প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) থেকে জানা গেছে, দুটি কম্পোনেন্টের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। কম্পোনেন্ট-১-এর আওতায় তদারকি সক্ষমতা বৃদ্ধি ও পদ্ধতিগত উন্নয়ন করা হবে। এ অংশের প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোয় বিনিয়োগ, সক্ষমতা উন্নয়নে উদ্যোগ এবং পরামর্শক সেবা দেওয়া।
কম্পোনেন্ট-২-এর আওতায় আর্থিক খাতের সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা ও ব্যাংকিং পুনর্গঠন কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। এ অংশে আর্থিক খাতের সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার, ব্যাংক রেজল্যুশন, পুনর্গঠন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সংস্কার করা হবে।
ডিপিপিতে আরও বলা হয়েছে, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে সাইবার হামলা এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনে আর্থিক ঝুঁকিসহ বিভিন্ন নিরাপত্তাঝুঁকি রয়েছে। পুরোনো তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো ও সমন্বিত তথ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে তদারকি ব্যবস্থায় এসব ঝুঁকি যথাযথভাবে মোকাবিলা করা যায় না। সম্মিলিতভাবে এসব চ্যালেঞ্জ আমানতকারীর আস্থা এবং আর্থিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এসব সমস্যা মোকাবিলা করে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে।
এর আগে ব্যাংক খাতের সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নে ৪ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা ব্যয়ে এফএসএসপি-১ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ওই প্রকল্পের যন্ত্রপাতি ও পণ্যসামগ্রী নতুন প্রকল্পে কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। কমিশনের আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগ প্রকল্পটি যাচাই-বাছাই করেছে। প্রকল্পে বৈদেশিক অর্থায়নের বিষয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সম্মতিপত্র এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থায়নের নিশ্চয়তাপত্র টিএপিপিতে সংযুক্ত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি একজন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া, বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান গভর্নরের সিল-স্বাক্ষর সংযুক্ত করাসহ আরও বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। এসব পরামর্শ অনুযায়ী প্রকল্প প্রস্তাব পুনর্গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
পুরোনো এফএসএসপি-১ প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তবায়িত তথ্যপ্রযুক্তি কম্পোনেন্টের আওতায় প্রস্তুত করা ডেটা সেন্টার এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি ও পণ্যসামগ্রী বর্তমানে চালু রয়েছে। পাশাপাশি কিছু যন্ত্রপাতি ও পণ্যসামগ্রী ইতোমধ্যে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ায় এফএসএসপি-১ থেকে এফএসএসপি-২ প্রকল্পে সেগুলো হস্তান্তর করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
