দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ সেবন করছেন ফাতিমা বেগম। প্রতি মাসে জামালপুর সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অসংক্রামক রোগ (এনসিডি) কর্নার থেকে এক মাসের ওষুধ বিনামূল্যে নিতেন ৩২ বছর বয়সী এই গৃহবধূ। তবে গত মাসে সেখানে গিয়ে ওষুধ না পেয়ে ফিরে আসতে হয়েছে তাঁকে। কর্নার থেকে জানানো হয়, ওষুধের মজুত শেষ হয়ে গেছে। একই পরিস্থিতি ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরের ৭০ বছর বয়সী করীম আলীর। তিনিও উচ্চ রক্তচাপের রোগী। তিনি জানান, আগে কোটচাঁদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে এক মাসের ওষুধ পাওয়া গেলেও এখন মাত্র ১০ দিনের ওষুধ দেওয়া হয়। বাকি ওষুধ ফার্মেসি থেকে কিনতে হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে কিছুটা স্বস্তি মিললেও ওষুধের সংকট তাঁকে বিপাকে ফেলেছে।
দেশের ৪৪৬টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এনসিডি কর্নারে এখন এমন পরিস্থিতি চলছে। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই সরকারের সরবরাহ করা পাঁচ ধরনের ওষুধের কোনো না কোনোটি সংকটে রয়েছে। মজুত থাকা ওষুধও আগামী অক্টোবরের মধ্যে শেষ হয়ে যেতে পারে। দেশের ১০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য নিয়েও ওষুধ সংকটের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আজ মঙ্গলবার বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব হার্ট দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘একটি স্পন্দনও যেন মিস না হয়’। এ উপলক্ষে রাজধানীর একটি হোটেলে হৃদরোগ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে ২০১৮ সালে এনসিডি কর্নার কর্মসূচি চালু করা হয়। বর্তমানে ৪৪৬টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ৩০টি জেলা হাসপাতালে এ সেবা দেওয়া হচ্ছে। এসব কেন্দ্রে রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করা হয়। উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয়ভাবে সরবরাহ করা পাঁচ ধরনের ওষুধও রোগীদের বিনামূল্যে দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটসহ আটটি সংস্থা এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে।
এনসিডি কর্নারে ১৪ লাখ ৮০ হাজার ১১৭ জন রোগী নিবন্ধিত রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের রোগী ১১ লাখ ৩১ হাজার ৪৮৭ এবং ডায়াবেটিসের রোগী ৮ লাখ ৯৬ হাজার ২৯৩ জন। নিয়মিত ওষুধ সেবনের ফলে ৬১ শতাংশ রোগীর ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ডা. হালিমুর রশীদ বলেন, এনসিডি কর্মসূচির অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাসপাতালগুলোকে অন্যান্য ওষুধের পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয়ভাবে সরবরাহ করা পাঁচ ধরনের ওষুধও কিনতে বলা হয়েছে। তবে উপজেলা হাসপাতালের বাজেট সীমিত। এসব ওষুধ কিনতে গেলে অন্যান্য ওষুধের সংকট আরও বাড়তে পারে। ঠিক কতটি এনসিডি কর্নারে ওষুধের সংকট রয়েছে, সে তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে নেই বলেও জানান তিনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গত ১৬ মার্চ জরুরি ভিত্তিতে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়। এতে বলা হয়েছিল, মজুত থাকা ওষুধ ৬০ দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। তবে এরপর প্রায় সাড়ে ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও ওই অর্থের বরাদ্দ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। অধ্যাপক হালিমুর রশীদ বলেন, ওষুধ কেনার জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে দেশের হাসপাতালগুলোর জন্য বরাদ্দ বাড়তে পারে। আলাদাভাবে এনসিডি কর্মসূচির জন্য অর্থ বরাদ্দ না দিয়ে হাসপাতালগুলোকে নিজেদের উদ্যোগে ওষুধ কেনার সুযোগ দেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে। ফলে এর প্রভাব রোগীদের ওপর কীভাবে পড়বে, তা নিয়ে চিকিৎসকেরা উদ্বিগ্ন।
চিকিৎসকেরা বলছেন, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত ওষুধ সেবন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওষুধ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে দরিদ্র রোগীদের নিজেদের টাকায় ওষুধ কিনতে হবে। এতে অনেকের চিকিৎসা অনিয়মিত হয়ে যেতে পারে বা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এর ফলে দীর্ঘদিনের চিকিৎসার সুফল নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি হৃদরোগ ও অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে হালিমুর রশীদ মনে করেন, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত প্রায় ৭০ শতাংশ রোগী এমনিতেই নিজেদের অর্থে ওষুধ কেনেন। এনসিডি কর্নারের সেবায় বিঘ্ন ঘটলে এ হার সর্বোচ্চ আরও ৫ শতাংশ বাড়তে পারে।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ইপিডেমিওলজি অ্যান্ড রিসার্চ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, চলতি বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ৫ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে। এই বাড়তি বরাদ্দের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ উচ্চ রক্তচাপের ওষুধে ব্যয় করা হলে দেশে উচ্চ রক্তচাপজনিত হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হৃদরোগে
দেশে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হৃদরোগ। গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজের ২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে স্বাভাবিক মৃত্যুর সবচেয়ে বড় কারণ হৃদরোগ। প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ৩৬ জনের মৃত্যুর কারণ এ রোগ। তবে ঝুঁকির কারণ নিয়ন্ত্রণ, সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ ও যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে হৃদরোগের বড় একটি অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
ওয়ার্ল্ড হার্ট ফেডারেশনের বাংলাদেশ কান্ট্রি প্রোফাইলে আইএইচএমইর তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে হৃদরোগে ৪ লাখ ১৫ হাজার ২৮৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রতি লাখ মানুষের বিপরীতে এ রোগে মৃত্যুহার ২৩৫। বয়স সমন্বিত মৃত্যুহার ৩৭১ এবং নতুন রোগের বয়স সমন্বিত হার প্রতি লাখে ৫৯৪। তবে হৃদরক্তনালির রোগের মধ্যে হৃদরোগ ও রক্তনালির বিভিন্ন রোগ অন্তর্ভুক্ত থাকায় শুধু হৃদরোগে বছরে ঠিক কত মানুষ আক্রান্ত হন বা মারা যান, তার পূর্ণাঙ্গ জাতীয় হিসাব নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশভিত্তিক সর্বশেষ কারণভিত্তিক মৃত্যুর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে হৃদরোগে প্রতি লাখে ৫৮ দশমিক ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। পুরুষের ক্ষেত্রে এ হার ৬৭ দশমিক ৬ এবং নারীর ক্ষেত্রে ৫০ দশমিক ২। ওই বছর স্ট্রোকের পর হৃদরোগ ছিল দেশের দ্বিতীয় প্রধান মৃত্যুর কারণ।
