বন্ডের ৩৬৭০ টন কাপড়ের ২৮৮৩ টন-ই বিক্রি করে দিয়েছে!

অনন্যা সক্স অ্যান্ড ইনার্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড

** সাড়ে চার বছরে বন্ড সুবিধায় ৩৬৭০ মেট্রিক টন কাপড় আমদানি করে ২৮৮৩ মেট্রিক টন-ই বিক্রি করে দিয়েছে
** কাস্টমস গোয়েন্দা ও ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেটের কর্মকর্তারা যতবার ফ্যাক্টরি গিয়েছে, ততবার কোন কাপড় পায়নি
** ২০২৫ সালে কাস্টমস গোয়েন্দা ১৯টি বিল এন্ট্রিতে আমদানি করা ২৩৫ মেট্রিক টন কাপড় যাচাই করতে গিয়ে পায়নি, সব খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে, ১১.৮৩ কোটি টাকা শুল্ককর মামলা করে কাস্টমস গোয়েন্দা
** বন্ড কমিশনারেটের ২০২৪ সালের অভিযানে ২৯৫ মেট্রিক টন কাপড় পায়নি, যাতে ১৪ কোটি শুল্ককর ফাঁকি মামলা করে
** ২০২৫ সালে বন্ড কমিশনারেট অভিযানে ৫৮১ মেট্রিক টন কাপড় পায়নি, যাতে শুল্ককর ফাঁকি ৩০ কোটি টাকা
** কাস্টমস গোয়েন্দা ও বন্ড কমিশনারেটের মামলা থেকে বাঁচতে বিজিএমইএ এর এক নেতার প্রভাব খাটিয়ে দুই মামলা রিভিউ করতে কমিটি গঠন করা হয়
** সব কাপড় খোলাবাজারে বিক্রি করে দেয়, এরপরও অবৈধ খাটিয়ে বন্ড থেকে প্রথমবার ২২৭ ও পরের বার ৬৪৫ মেট্রিক টনের এফওসির এনওসি নেয় মুরাদ
** কাস্টমস গোয়েন্দা ও সিআইসির কর্মকর্তারা পরিদর্শনে গেলে ভুয়া শ্রমিক দিয়ে গেট আটকে দেয়, যাতে কর্মকর্তারা ভেতরে ঢুকতে না পারে
** দুইদিন চেষ্টা করেও কর্মকর্তারা প্রবেশ করতে পারেনি, কর্মকর্তারা বলছেন, ফ্যাক্টরির ভেতরে কোন কাপড় নেই, সব খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে মুরাদ

২০২২ সালে বন্ড লাইসেন্স পেয়েছে। বন্ড লাইসেন্স নয়, যেন খোলাবাজারে কাপড় বিক্রির বৈধ লাইসেন্স পেয়েছে। এরপর থেকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। প্রায় সাড়ে চার বছরে বন্ড সুবিধায় অন্তত ৩ হাজার ৬৭০ মেট্রিক টন কাঁচামাল আমদানি করেছে, যার বেশিরভাগ-ই কাপড়। অর্থাৎ প্রতিমাসে গড়ে ৬৯ মেট্রিক টন আমদানি করা হয়েছে। কিন্তু আমদানি করা কাপড় ও এক্সেসরিজের মধ্যে ২ হাজার ৮৮৩ মেট্রিক টনের কোন হদিস নেই। অর্থাৎ বন্ড সুবিধার এই কাপড় ও এক্সেসরিজ সরাসরি খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। আবার প্রতিষ্ঠান ৭৮৬ মেট্রিক টন পোশাক রপ্তানি দেখিয়েছে, যা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কারণ, প্রতিষ্ঠান যে কাপড় আমদানি করেছে, রপ্তানি দেখিয়েছে অন্য কাপড় দিয়ে তৈরি পোশাক। অর্থাৎ স্টক লটের পণ্যকে ভুয়া রপ্তানি দেখিয়েছে। মূলত কয়েকজন অসাধু সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের সহায়তায় ‘ঘুষের কন্ট্রাকে’ ভুয়া রপ্তানি দেখানো হয়েছে।
Anannya Socks 1
জালিয়াতি এখানে শেষ নয়। বন্ড কমিশনারেট যতবার ফ্যাক্টরি পরিদর্শনে গিয়েছে, একবারও কোন কাপড় পায়নি। বন্ড কমিশনারেট ১৪ কোটি ও ৩০ কোটি টাকার শুল্ককর ফাঁকির মামলাও করেছে। এমনকি কাস্টমস গোয়েন্দা গিয়েও কোন কাপড় পায়নি। পরে ১১ কোটি টাকা শুল্ককর ফাঁকির মামলা করেছে। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস থেকে কার্টিং তদারকির শর্ত কাপড় খালাস নেয়, ফ্যাক্টরিতে গেলে কোন কাপড় নেই। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান কন্ট্রাক্টে এলসি বিক্রি করে, যার ফলে কাপড় ফ্যাক্টরিতে আসে না। প্রভাব খাটিয়ে ২২৭ ও ৬৪৫ মেট্রিক টন এফওসি সুবিধায় কাপড় আমদানি করতে বন্ড থেকে প্রত্যয়নও নিয়ে নেয়। বন্ড সুবিধার অপব্যবহারে নিয়ন্ত্রণহীন এই প্রতিষ্ঠানে সর্বশেষ কাস্টমস গোয়েন্দা ও সিআইসি কর্মকর্তারা যৌথ অভিযানে যায়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের মালিক ফ্যাক্টরির সামনে ভুয়া শ্রমিক বসিয়ে রাখে, যাতে কর্মকর্তারা ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে। বন্ড সুবিধায় এসব কাপড় ও এক্সেসরিজ সরাসরি খোলাবাজারে বিক্রির মাধ্যমে শত কোটি টাকা শুল্ককর ফাঁকি দেওয়া প্রতিষ্ঠানটি হলো রাজধানীর তেজগাঁও এলাকার অনন্যা সক্স অ্যান্ড ইনার্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। এনবিআর সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

সাড়ে ৪ বছরে ৩৬৭০ মেট্রিক টন আমদানি, যা প্রতিমাসে গড়ে ৬৯ মেট্রিক

অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেম ও বন্ড কমিশনারেটের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২২ সালের ২ আগস্ট অনন্য সক্স অ্যান্ড ইনার্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডকে বন্ড লাইসেন্স দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মুরাদ হোসাইন সোহাগ। তিনি আকন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। বন্ড লাইসেন্স পাওয়ার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি বেপরোয়া হয়ে উঠে। অ্যাসাইকুডার তথ্যমতে, প্রতিষ্ঠানটি ২০২২ সাল থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ৩৬ লাখ ৭০ হাজার ২০৫ কেজি বা ৩ হাজার ৬৭০ মেট্রিক টন কাপড় ও এক্সেসরিজ আমদানি করেছে, যার মধ্যে ৯৮ শতাংশ কাপড়, বাকি ২ শতাংশ এক্সেসরিজ। হিসাব অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি প্রতিমাসে গড়ে ৬৯ মেট্রিক টন কাপড় আমদানি করেছে। আমদানি করা কাপড়ের মধ্যে রয়েছে- টুইল ফেব্রিক্স, ওভেন, নিটেড, ডাইড ওভেন, ইয়ার্ন ডাইড ফ্ল্যানেল, ডেনিম, স্কুবা নিট, রিব নিট, সিঙ্গেল জার্সি নিট, ফ্লিস, পোলার ফ্লিস, মাইক্রো ফ্লিস, কোরাল ফ্লিস, শেরপা, টেডি বর্গ ফ্লিস, ট্রাইকট, ট্যাফেটা, পঞ্জি, প্রিন্টেড, প্রিন্টেড ফ্লিস, টেক্সচারড, ফিনিশ, লেইস, কটন, পলিয়েস্টার, নাইলন, কটন-স্প্যানডেক্স, পলিয়েস্টার-স্প্যানডেক্স, নাইলন-স্প্যানডেক্স, কটন-নাইলন, লিনেন-কটন, নন-টেক্সচারড, টেক্সচারড ডাইড, পলার ফ্লিস, সিঙ্গেল জার্সি, ট্রিকট, শেরপা ফেব্রিক্স, কর্ডুরয়, ফ্রেঞ্চ টেরি, ইন্টারলক, মেলাঞ্জ, জ্যাকোয়ার্ড, ব্রাশড, সুয়েড, মেশ, অক্সফোর্ড, ক্যানভাস, পিকে, ভেলভেট, টেরি, রাসেল নিট, ডাবল জার্সি, স্পেস ডাইড, বার্ডস আই ফেব্রিক্স ইত্যাদি। এসব কাপড় সাধারণত মোজা, অন্তর্বাস, স্পোর্টসওয়্যার, জ্যাকেট, সোয়েট শার্ট ও অন্যান্য পোশাক তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। তবে পলিয়েস্টার ফেব্রিক্স ও ওভেন ফেব্রিক্স সবচেয়ে বেশি আমদানি হয়েছে, যা ইসলামপুরের কাপড় হিসেবে পরিচিতি রয়েছে। এছাড়া টুইল ফেব্রিক্স, ডেনিম ফেব্রিক্স, কটন-মিক্সড ফেব্রিক্স, ফেব্রিক্স স্যাম্পল, পলি ফেব্রিক্স সবচেয়ে বেশি আমদানি হয়েছে।
Akon Group
হিসাবে আরো দেখা গেছে, ২০২২ সাল থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত মোট ৫০৮টি চালান প্রতিষ্ঠানটি আমদানি করেছে। এর মধ্যে ২০২২ সালে ১৫টি, যার মূল্য প্রায় ৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকা; ২০২৩ সালে ৪৭টি, যার মূল্য প্রায় ৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা; ২০২৪ সালে ২২২টি, যার মূল্য প্রায় ৫৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা; ২০২৫ সালে ১৯২টি, যার মূল্য প্রায় ১১৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা ও চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ৩২টি, যার মূল্য প্রায় ২৮ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। প্রায় সাড়ে ৪ বছরে আমদানি করা এসব শুল্কায়নযোগ্য মূল্য প্রায় ২১০ কোটি টাকা, যাতে প্রযোজ্য শুল্ককর প্রায় ১৪১ কোটি টাকা। এসব কাপড় চীন, হংকং, জাপান, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রিয়া, মালয়েশিয়া ও ইতালি থেকে আমদানি করা হয়েছে। তবে মোট আমদানির ৯৫ শতাংশ কাপড় চীন থেকে এসেছে।
Anannya Socks 2
অনুসন্ধান বলছে, ঢাকা ও চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস দিয়ে বিপুল পরিমাণ কাপড় ও এক্সেসরিজ আমদানি হয়। ১ কেজি থেকে ২৮ হাজার কেজি পর্যন্ত আমদানি করা হয়েছে। যাতে ‘ডোর-টু-ডোর’ সার্ভিসের আলামতও রয়েছে। অর্থাৎ ডোর-টু-ডোর সার্ভিসে বিক্রির জন্য এসব কাপড় আনা হয়ে থাকতে পারে। আবার দিনে কয়েকটি চালানও খালাস হয়েছে। তবে খালাস হওয়া কাপড়ের বেশিরভাগ চালান প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি অন্য প্রতিষ্ঠান বা ইসলামপুরে বন্ডের কাপড় সাপ্লাই দেওয়া প্রতিষ্ঠানের কাছে এলসি বিক্রি করে দেয়। ফলে যাদের কাছে এলসি বিক্রি করা হয়, তারা খালাস নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিক্রি করা কাপড়ে প্রায় শত কোটি টাকার শুল্ককর ফাঁকি হতে পারে বলে ধারণা করছেন বন্ড কর্মকর্তারা।

রপ্তানি করা কাপড় আর আমদানি করা কাপড়ের মিল নেই

অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে ১১টি, ২০২৪ সালে ৩২টি, ২০২৫ সালে ১৫টি ও ২০২৬ সালে ১২টি চালানসহ মোট ৭০টি চালানে প্রায় ১৫ কোটি ৪১ লাখ টাকার পণ্য রপ্তানি করা হয়েছে। ২০২৩ সালে ইতালি, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, জার্মানিতে ১১টি চালানে মোট ১ কোটি ৮৭ লাখ টাকার পোশাক রপ্তানি করা হয়েছে। ২০২৪ সালে ইতালি ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, পোল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডে ৩২টি চালানে ৬ কোটি ৩ লাখ টাকার পোশাক রপ্তানি করা হয়েছে। ২০২৫ সালে ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, নেদারল্যান্ড ও জার্মানিতে ১৫টি চালানে ৪ কোটি ১৫ লাখ টাকার পোশাক রপ্তানি করা হয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, পোল্যান্ডে ১২টি চালানে ৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকার পোশাক রপ্তানি করা হয়েছে। লেগিংস ও জিন্স, টি-শার্ট ও টাউজার, হুডি ও জ্যাকেট, টোট ব্যাগ, লেডিস টপ, সক্স ও বিভিন্ন ধরনের পোশাক রপ্তানি করা হয়েছে বলে দেখানো হয়েছে। প্রায় সোয়া তিন বছরে প্রতিষ্ঠানটি মোট ৭ লাখ ৮৬ হাজার ৩২০ কেজি বা ৭৮৬ মেট্রিক টন কাপড় রপ্তানি দেখিয়েছে, যার মূল্য প্রায় ৫০ কোটি ২৭ লাখ টাকা।
Anannya Socks
অনুসন্ধান বলছে, অনন্যা সক্সের আমদানি করা কাপড়ের সঙ্গে রপ্তানি করা পোশাকের মিল নেই। বেশিরভাগ-ই ভুয়া রপ্তানি দেখানো হয়েছে। পলার ফ্লিস ফেব্রিক্স মূলত জ্যাকেটের ভেতরে ব্যবহার করা হয়। তবে ফ্লিস ঘোষণা দিয়ে কম্বলে ব্যবহারের ফেব্রিক্স আমদানি হয়েছে। এছাড়া ভিসকস-পলিয়েস্টার ব্লেন্ডেড ওভেন ফেব্রিক, বিভিন্ন চালানের ফেব্রিক স্যাম্পল এবং সৌন্দর্যবর্ধনের লেস ফেব্রিক দিয়ে কোন পোশাক তৈরি করা হয়নি। আর আমদানি করা বেশিরভাগ কাপড় হলো ইসলামপুরের। অর্থাৎ স্টক লটের কাগজ দিয়ে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও কিছু অসাধু কাস্টমস কর্মকর্তার সহায়তায় ভুয়া রপ্তানি দেখানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন বন্ড কর্মকর্তারা। রপ্তানি বাদ দিলে আমদানি করা ২ হাজার ৮৮৩ মেট্রিক টন কাপড় দিয়ে কোন পণ্য তৈরি করা হয়নি। এই কাপড় সরাসরি খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

অনুসন্ধানে আরো দেখা গেছে, অনন্যা সক্সের আমদানি-রপ্তানিতে অনিয়ম, কাপড় খোলাবাজারে বিক্রি, এলসি বিক্রি ও ভুয়া রপ্তানি দেখানোর সঙ্গে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরাও জড়িত বলে জানিয়েছেন বন্ড কর্মকর্তারা। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানের আমদানি করা ৫০৮টি চালান খালাস করেছে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট সুরমা এন্টারপ্রাইজ, টেক কেয়ার কার্গো সিস্টেম, জিএইচএমএসএম এজেন্সি লিমিটেড, এনএকে কার্গো লিমিটেড, কাজী নিজাম উদ্দিন, এ বি ট্রেডার ইন্টারন্যাশনাল ও চৌধুরী অ্যান্ড কোং। এর মধ্যে সুরমা এন্টারপ্রাইজ ৯৫ শতাংশ আমদানি চালান খালাস করেছে। যার বেশিরভাগ কাপড়-ই ইসলামপুরের। আর ৭০টি চালানে প্রতিষ্ঠানটি পোশাক রপ্তানি করেছে, যার বেশিরভাগ স্টক লটের মাধ্যমে রপ্তানি দেখানো হয়েছে। এই ভুয়া রপ্তানি দেখানোর সঙ্গেও সিঅ্যান্ডএফরা জড়িত বলে মনে করেন কর্মকর্তারা।

কাস্টমস গোয়েন্দা ও সিআইসি কর্মকর্তাদের ফ্যাক্টরিতে প্রবেশে বাঁধা

এনবিআর সূত্রমতে, আমদানি করা বন্ডের কাপড় সব খোলাবাজারে বিক্রি করা দেওয়া হয়েছে-এমন অভিযোগের ভিত্তিতে তা খতিয়ে দেখতে এনবিআরের নির্দেশে কাস্টমস গোয়েন্দা ও সিআইসি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে যৌথ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ৪ জুন অনন্যা সক্স পরিদর্শনে গেলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ কমিটির কর্মকর্তাদের কোন সহযোগিতা করেন। পরে কাস্টমস কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানটির ওয়্যারহাউজ সীলগালা করে দেয় এবং অভিযানে সহযোগিতা করতে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়। প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বিপদ বুঝতে পেরে যৌথ টিমকে সহযোগিতা না করে উল্টো ফ্যাক্টরির সামনে শ্রমিকদের জড়ো করে কর্মকর্তাদের ফ্যাক্টরিতে প্রবেশে একাধিক দিন বাঁধা প্রদান করে। শেষে ১৪ জুন ভোরে পুলিশের সহায়তায় ওয়্যারহাউজে প্রবেশ করেন কর্মকর্তারা। যাতে কোন প্রকার বন্ডের কাপড় পাওয়া যায়নি। অভিযানে থাকা একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটি সব কাপড় বিক্রি করে দিয়েছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী দেড় থেকে পৌনে ২০০ কোটি টাকা শুল্ককর ফাঁকি দিয়েছে। কাগজপত্র যাচাই করে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।
Anannya Socks 3

কাস্টমস গোয়েন্দার অভিযানে ২৬৫ মেট্রিক টন কাপড় পায়নি

এনবিআর সূত্রমতে, কাস্টমস গোয়েন্দা গোপন সংবাদ পায় যে অনন্যা সক্স ১৯টি বিল অব এন্ট্রিতে প্রায় ২৬৫ দশমিক ৩২৫ মেট্রিক টনের বেশি বন্ড সুবিধার কাপড় আমদানি করে খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এই কাপড় যাচাই করতে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্যরা ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই অনন্যা সক্সে প্রিভেন্টিভ কার্যক্রম পরিচালনা করে। এই সময় প্রতিষ্ঠানটিতে কোন কাপড় পাওয়া যায়নি। এমনকি এই কাপড় দিয়ে পোশাক তৈরি করে রপ্তানির কোন ডকুমেন্ট দেখাতে পারেনি। আমদানি করা এই কাপড় এক্স-বন্ড ও ইন-বক্স রেজিস্টারও দেখাতে পারেনি। যার অর্থ হলো, আমদানি করা এই কাপড় ফ্যাক্টিরির ওয়্যারহাউজে প্রবেশ করেনি। প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা প্রিভেন্টিভ দলের কর্মকর্তাদের জানান, এই কাপড় দিয়ে পোশাক তৈরি করতে একটি প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়েছে। তবে কাপড় কোন প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়েছেম, কবে পাঠানো হয়েছে-তার কোন প্রমাণ দেখাতে পারেনি। এফওসি সুবিধায় আমদানি করা এই কাপড়ে প্রযোজ্য শুল্ককর ১১ কোটি ৮৩ লাখ ৬৮ হাজার ৮১১ টাকা। অভিযানের সময় কর্মকর্তারা দেখতে পান, ফ্যাক্টরিতে বাংলাদেশি জেন্টেল পার্ক ব্র্যান্ডের পোশাক উৎপাদন করা হচ্ছে। তবে এই পণ্য বিক্রি বা রপ্তানির কোন দলিল দেখাতে পারেনি প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ। বন্ডের কাপড় বিক্রি ও শুল্ককর ফাঁকির বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এনবিআরকে প্রতিবেদন দেয় কাস্টমস গোয়েন্দা। এছাড়া কাস্টমস গোয়েন্দা কার্টিং তদারকি করতে গিয়ে ফ্যাক্টরিতে কাপড় পায়নি। আর ভুয়া রপ্তানির প্রমাণও পেয়েছে।
Anannya Socks 5

বন্ড কমিশনারেট ৫৮১ মেট্রিক টন কাপড় পায়নি

সূত্রমতে, অনন্যা সক্সকে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় ২০২৫ সালের ২০ জুলাই ঢাকা দক্ষিণ কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের কর্মকর্তারা অভিযান পরিচালনা করে। এসময় প্রতিষ্ঠানটিতে সামান্য পরিমাণ কাপড় ও কিছু পোশাক পাওয়া যায়। এছাড়া বন্ড সুবিধায় আমদানি করা আর কোন কাপড় পাওয়া যায়নি। আমদানির কাগজপত্র যাচাইয়ে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ২২টি ইউডির বিপরীতে ১২ লাখ ৮৪ হাজার ৫৩৪ কেজি (এক হাজার ২৮৪ মেট্রিক টন) বিভিন্ন ধরনের কাপড় আমদানি করেছে। প্রতিষ্ঠানের দাবি অনুযায়ী, ১২ লাখ ৫৪ হাজার ৫০৭ পিস তৈরি পোশাক রপ্তানি করা হয়েছে, যাতে ব্যবহৃত কাপড়ের পরিমাণ ৩ লাখ ৬৬ হাজার ৩০ কেজি (৩৬৬ মেট্রিক টন)। সে হিসেবে প্রতিষ্ঠানে ৯ লাখ ৭৬ হাজার ৬৭৩ কেজি (৯৭৬ মেট্রিক টন) কাপড় মজুদ থাকার কথা। কিন্তু প্রতিষ্ঠানে মাত্র ১ লাখ ৭৪১ কেজি (১০০ মেট্রিক টন) কাপড় পাওয়া গেছে। বাকি ৮ লাখ ৭৫ হাজার ৯৩২ কেজি (৮৭৫ মেট্রিক টন) কাপড় প্রতিষ্ঠানটি অবৈধভাবে অপসারণ করে বিক্রি করে দিয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর বন্ড কমিশনারেটের কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানটিতে অভিযান পরিচালনা করে, যাতে ২ লাখ ৯৪ হাজার ২৪৮ কেজি (২৯৪ মেট্রিক টন) বন্ডের কাপড় পায়নি। ফলে প্রায় ১৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা শুল্ককর ফাঁকির অভিযোগে মামলা করে। এই ২৯৪ মেট্রিক টন বাদ দিলে বাকি ৫৮১ মেট্রিক টন কাপড়ের কোন হদিস পাওয়া যায়নি। এই কাপড়ের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য প্রায় ৩৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা, যাতে প্রযোজ্য শুল্ককর প্রায় ৩০ কোটি ২৬ লাখ টাকা। কাপড় অবৈধভাবে অপসারণ করে বিক্রি করে শুল্ককর ফাঁকি দেওয়ায় বন্ড কমিশনারেট প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করেছে। তবে কাস্টমস গোয়েন্দা ও বন্ড কমিশনারেটের এই মামলা থেকে বাঁচতে প্রতিষ্ঠান নতুন কূটকৌশল শুরু করে। পরে এনবিআরকে বিভিন্ন দিক থেকে চাপ দিয়ে একটি কমিটি করে নেয়। এই কমিটি কাস্টমস গোয়েন্দা ও বন্ড কমিশনারেটের প্রতিবেদন যাচাই করে প্রতিবেদন দেবে। তবে এখন পর্যন্ত সেই প্রতিবেদন দেওয়া হয়নি।
Anannya Socks 4

এফওসি সুবিধায় ৯৬৭ মেট্রিক টন কাপড় আমদানিতে প্রত্যয়ন দেয় বন্ড, এই কাপড়ের হদিস নেই

ঢাকা দক্ষিণ কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট সূত্রমতে, অনন্যা সক্সকে তিন দফায় এফওসি সুবিধায় মোট ৯৬৭ মেট্রিক টন কাপড় আমদানিতে প্রাপ্যতার প্রত্যয়ন দেয় ঢাকা দক্ষিণ কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট। এফওসি সুবিধায় আমদানি করা এই কাপড়ের মধ্যে বেশিরভাগের হদিস নেই বলে জানা গেছে। অনুসন্ধান বলছে, পোশাক খাতে এফওসি (ফ্রি অব কস্ট) মানেই জালিয়াতি। বন্ড থেকে এফওসি এর একটি প্রত্যয়ন নিয়ে শত শত টন কাপড় আমদানি করা হয়। অথচ বিদেশি বায়ার এফওসি সুবিধায় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে বিনামূল্যে এই কাপড় দেয়, যাতে আমদানিকারকের খরচ কমে। কিন্তু বাংলাদেশের এফওসি সুবিধা মানে ঘাপলা রয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এফওসি সুবিধার কাপড় দিয়ে পোশাক তৈরি হয় না, যা সরাসরি খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়। আর বন্ড কমিশনারেট এই অবৈধ কাপড় বিক্রির বৈধতা দিতে ‘প্রত্যয়নপত্র’ দেয়। যদিও এই প্রত্যয়ন নিতে ‘কন্ট্রাক্ট’ করে ঘুষ দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সূত্রমতে, অনন্যা সক্সকে সর্বশেষ ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর ৬৪৫ মেট্রিক টন কাঁচামাল বা কাপড় আমদানিতে প্রাপ্যতা অনুমোদন ও ছাড়করণের জন্য প্রত্যয়ন দেয় ঢাকা দক্ষিণ কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট। অথচ এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বন্ড কমিশনারেটের দুইটি, কাস্টমস গোয়েন্দার একটি মামলা চলমান থাকাবস্থায় এই প্রত্যয়ন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া একই বছরের ২ জুলাই ২২৭ মেট্রিক টন কাপড়, ২৬ জুন ৯৫ মেট্রিক টন কাপড়ের প্রত্যয়ন দেওয়া হয়।

আমদানি-রপ্তানির সকল জালিয়াতিতে ‘সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট’

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনন্যা সক্সের আমদানি কাপড় বিক্রি ও ভুয়া রপ্তানি দেখানোর পেছনে কতিপয় সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট জড়িত থাকতে পারে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চালান খালাস করেছে সুরমা এন্টারপ্রাইজ, নিউ স্টার এন্টারপ্রাইজেস। এই দুইটি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট সবচেয়ে বেশি চালান খালাস করেছে। তবে সিঅ্যান্ডএফ এর সহায়তায় প্রতিষ্ঠানটি কন্ট্রাক্টে এলসি বিক্রি করে কাপড় পৌঁছে দিয়ে থাকতে পারে। এই দুইটি সিঅ্যান্ডএফ ছাড়া অনন্যা সক্সের চালান খালাসের সঙ্গে জড়িত টেক কেয়ার কার্গো সিস্টেম, জিএইচএসএম এজেন্সি, কাজী নিজাম উদ্দিন, এন এন কে কার্গো লিমিটেড, এ বি তরফদার ইন্টারন্যাশনাল, আলেয়া এন্টারপ্রাইজ, চৌধুরী অ্যান্ড কোং, অ্যারোলজিক কার্গো ইন্টারন্যাশনাল, সাফরন শিপিং ইন্টারন্যাশনাল, ইউনিভার্সাল কার্গো এক্সপ্রেস, মারিয়া ট্রেডার্স, নাজেম এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড, কাজরী ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড। অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠান সব কাপড় বিক্রি করে দিয়েছে। আর স্টক লটের পণ্য ও কাগজ দেখিয়ে ভুয়া রপ্তানি দেখিয়েছে। এই ভুয়া রপ্তানির সঙ্গে কয়েকটি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট জড়িত বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে অনন্যা সক্স অ্যান্ড ইনার্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মুরাদ হোসেন এর ব্যক্তিগত নাম্বারে ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে বক্তব্যের বিষয় লিখে দিলেও তিনি জবাব দেননি।

** বন্ধ প্রতিষ্ঠানের ২৪৫ টন বন্ডের কাপড় খালাসের চেষ্টা
** নেত্রকোনা এক্সেসরিজের ৫ কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি
** বন্ডের ৪৯২৭ টন কাপড়ের ৩৭৯৭ টন-ই বিক্রি করে দিয়েছে!
** ১৪৫ টন বন্ডের কাপড় গোডাউনে ঢুকেনি, সড়ক থেকে ‘হাওয়া’
** ‘বন্ডের পণ্য বাজারে বিক্রি করলেই লাইসেন্স বাতিল’
** টেরিবাজারে জাহাজ থেকে খালাস হয় বন্ডের কাঁচামাল!
** বন্ড দুর্নীতিতে বছরে ৫শ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি
** তিন গার্মেন্টস মালিকের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ
** নেত্রকোনা এক্সেসরিজের ৫ কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি
** রপ্তানি না করেও পাচ্ছে প্রাপ্যতা-ইউপি, বিক্রি করে এলসি
** প্রাপ্যতা জালিয়াতি, এমডি-চেয়ারম্যানের নামে মামলা
** ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে মিলবে বন্ড সুবিধা
** ‘ট্রেজারি বন্ডের ট্যাক্স বাড়ানো হয়েছে
** বন্ড লাইসেন্স না থাকলেও কাঁচামাল আমদানির সুযোগ
** বন্ড অফিসে বহিরাগতদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা
** এইচএস কোডের চার ডিজিট মিল থাকলে খালাস করতে হবে
** এইচএস কোড ভিন্ন হলেও পণ্য খালাসে জটিলতা নেই
** এইচএস কোডের ভুলে ৪০০% জরিমানা, ব্যবসায়ীরা হয়রানি হচ্ছেন: ডিসিসিআই
** এইচএস কোড পাল্টে পণ্য খালাস নেয় বার্জার পেইন্টস
** বন্ড ছাড়াই কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেবে এনবিআর
** ১৪৫ টন বন্ডের কাপড় গোডাউনে ঢুকেনি, সড়ক থেকে ‘হাওয়া’
** কাঁচামাল আমদানিতে ছাড় দিতে চায় এনবিআর
** ‘প্রাপ্যতার সুযোগে’ বন্ডের এক্সেসরিজ খোলাবাজারে
** অনলাইনে মিলছে ‘বন্ড লাইসেন্স’
** তুলা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা
** ইপিজেডের বন্ড সুবিধার ১০৭ টন কাপড় চট্টগ্রামে আটক
** আনোয়ার গ্রুপের প্রতিষ্ঠানের বন্ড ‍সুবিধার অপব্যবহার
** ‘বন্ডের পণ্য বাজারে বিক্রি করলেই লাইসেন্স বাতিল’
** ৩০১ টন বন্ডের কাঁচামাল গায়েব করেছে ‘জেএফকে ফ্যাশন’
** অনুমোদন পেলো ‘ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেট’