আসন্ন ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে ভ্যাট, শুল্ক ও কর বৃদ্ধির ফলে দেশের স্টিল শিল্পে বড় ধরনের ব্যয় চাপ সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা জানিয়েছে বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ)। সংগঠনটির মতে, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি এবং নতুন কর-শুল্ক কাঠামোর সম্মিলিত প্রভাবে প্রতি টন স্টিল উৎপাদনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মিলিয়ে অতিরিক্ত ১১ থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ বাড়তে পারে। বুধবার (১৭ জুন) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বিএসএমএর সভাপতি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন রানি স্টিলের চেয়ারম্যান সুমন চৌধুরী, সোনারগাঁও স্টিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মারুফ মহসিন, সিএসআরএম’র পরিচালক জাকারিয়া এবং এইচএনএম স্টিলের এমডিসহ খাতসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উদ্যোক্তা। এ সময় জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এবারের বাজেটে ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ রয়েছে। ন্যূনতম কর সংক্রান্ত কিছু বিধান বাতিল, আপিল ও হাইকোর্ট রেফারেন্সের ক্ষেত্রে অগ্রিম কর জমার হার কমানো, বিদেশি ঋণের সুদের ওপর উৎসে কর ২০ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং বিদ্যুৎ বিক্রয়ের বিলের ওপর উৎসে কর হ্রাস—এসব সিদ্ধান্ত ব্যবসা সহজীকরণে সহায়ক হবে।
তবে একই সময়ে স্টিল শিল্পের ওপর নতুন করে ভ্যাট, শুল্ক ও করের চাপ আরোপ করায় শিল্পটির টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে দাবি করেন তিনি। বিএসএমএর তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে বছরে প্রায় ৫০ লাখ টন স্টিলের চাহিদা থাকলেও উৎপাদন সক্ষমতা এক কোটি টনের বেশি। ফলে অধিকাংশ কারখানা ৫০ শতাংশেরও কম সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং উদ্যোক্তাদের আর্থিক চাপের মধ্যে ফেলছে।
সংগঠনটি জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রতি টন স্টিল উৎপাদনে অতিরিক্ত এক হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা ব্যয় যোগ হয়েছে। পাশাপাশি বন্দর চার্জ, রিভার ডিউজ, ল্যান্ডিং চার্জ, পরিবহন ব্যয় ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে আরও প্রায় ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হবে। এছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে বিক্রয় পর্যায়ে ভ্যাট বৃদ্ধি, স্থানীয় স্ক্র্যাপের ওপর অতিরিক্ত ভ্যাট, ফেরো-অ্যালয়, রিফ্র্যাক্টরি সামগ্রী, স্পেয়ার পার্টস এবং অন্যান্য উপকরণের ওপর কর ও শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। ফলে প্রতি টনে আরও প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা ব্যয় বাড়তে পারে বলে দাবি সংগঠনটির।
বিএসএমএ’র মতে, বিভিন্ন কর-শুল্ক বৃদ্ধির ফলে প্রত্যক্ষ উৎপাদন ব্যয় প্রতি টনে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে। অন্যদিকে বাজারে চাহিদা হ্রাস, উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম ব্যবহার, ওভারহেড ব্যয়, ব্যাংক ঋণের সুদ এবং স্থায়ী খরচ বৃদ্ধির কারণে পরোক্ষভাবে আরও ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার চাপ তৈরি হবে। ফলে সব মিলিয়ে প্রতি টনে অতিরিক্ত ব্যয় ১১ থেকে ১২ হাজার টাকায় পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটি আরও জানায়, রাজস্ব বাড়ানোর কার্যকর উপায় হলো উৎপাদন ও শিল্প সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন। সড়ক, সেতু, ফ্লাইওভার, রেলপথ, মেট্রোরেল, সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও আবাসনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়িত হলে স্টিলের চাহিদা বাড়বে। এতে বর্তমানে কম সক্ষমতায় পরিচালিত মিলগুলোও পূর্ণ সক্ষমতার কাছাকাছি উৎপাদনে যেতে পারবে।
সংগঠনটি সরকারের কাছে পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেছে। এসব দাবির মধ্যে রয়েছে—স্টিল শিল্পে প্রস্তাবিত অতিরিক্ত ভ্যাট, শুল্ক ও কর প্রত্যাহার; বিক্রয় পর্যায়ের ভ্যাট ও স্থানীয় স্ক্র্যাপের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত ভ্যাট বাতিল; উৎপাদন সংশ্লিষ্ট কাঁচামালের ওপর কর-শুল্ক পুনর্বিবেচনা; টার্নওভার ট্যাক্স ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে আগের শূন্য দশমিক ৬ শতাংশে ফিরিয়ে আনা; এবং উন্নয়ন বাজেট দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিল্পপণ্যের চাহিদা বাড়ানো। বিএসএমএর সভাপতি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, দেশের স্টিল শিল্প টিকিয়ে রাখা মানে শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে শক্তিশালী করা। তাই শিল্পের স্বার্থে প্রস্তাবিত কর-শুল্ক কাঠামো পুনর্বিবেচনার জন্য তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
