বন্ডের ৪৯২৭ টন কাপড়ের ৩৭৯৭ টন-ই বিক্রি করে দিয়েছে!

রাফায়েত ফেব্রিক্স লিমিটেড

** বন্ড সুবিধায় প্রতিমাসে গড়ে ৩১ কন্টেইনার কাপড় আমদানি করছে রাফায়েত ফেব্রিক্স
** বন্ড সুবিধার কাপড় ইসলামপুরে জাকির, জাহাঙ্গীর, শাহিন ও কাইয়ুমের কাছে বিক্রি করে
** ১০ তলা ভবনের গার্মেন্টসে সব মেশিন আছে, কিন্তু নেই কোন কর্মী, হয় না প্রোডাক্টশন
** দালাল খুরশিদ আলম পাটি থেকে ৪০ লাখ টাকায় এলসি নেন, যার থেকে রাফায়েত পায় ১৫ লাখ টাকা, চট্টগ্রাম কাস্টমসে কন্ট্রাক্ট করে খালাস করে জামাল উদ্দিন বাবলু
** এক বছরে ৪৯২৭ মেট্রিক টন কাপড় আমদানি রাফায়েত, যার মধ্যে ৩৭১৪ মেট্রিক টন কাপড়ের হদিস নেই
** বন্ডের কোন নিয়ম-ই মানে না, অথচ সব জেনেও কন্ট্রাক্ট করে ঘুষ নিয়ে চুপ থাকেন বন্ড কাস্টমস ও গোয়েন্দার কর্মকর্তারা
** রাফায়েত গ্রুপের প্রতিষ্ঠান এস ইসলামেরও ২,৩৮,৮২০ ও ২৪ হাজার ৬০৮ কেজি কাপড়ের হদিস নেই

বন্ড লাইসেন্স পেয়েছে মাত্র এক বছর আগে। এই এক বছরে বন্ড সুবিধায় আমদানি হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৯২৭ মেট্রিক টন কাপড়। যার মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৭৯৭ মেট্রিক টন কাপড়ের হদিস নেই! বর্তমানে যেখানে কোন প্রতিষ্ঠান এক কন্টেইনার কাপড় বা কাঁচামাল খালাস করতে কাগজপত্র সঠিক থাকার পরও ঘুষ দেয়, হয়রানির শিকার হতে হয়-সেখানে এই প্রতিষ্ঠান প্রতিমাসে ‘ঘুষের কন্ট্রাক্টে’ খালাস করে প্রায় ৩১ কন্টেইনার কাপড়। খালাস হওয়া কাপড় ফ্যাক্টরিতে প্রবেশ করে ঠিক-ই, কিন্তু রাতের আধাঁরে রাজধানীর ইসলামপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় চলে যায়! প্রতিষ্ঠানের মেশিনারিজ রয়েছে, কিন্তু কোনো উৎপাদন নেই। নামমাত্র রপ্তানি থাকলেও তাতেও রয়েছে ব্যাপক অসঙ্গতি। কাপড় আমদানির ক্ষেত্রেও রয়েছে জালিয়াতির অভিযোগ। ইসলামপুরের চিহিৃত দালাল খুরশিদ আলম ইসলামপুরের জাকির, জাহাঙ্গীর শাহিন ও কাইয়ুম থেকে ৪০ লাখ টাকায় এলসি এনে দেয়, যেখান থেকে প্রতিষ্ঠান পায় ১৫ লাখ টাকা। জামাল উদ্দিন বাবলু নামের এক সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট নেতা কাপড় খালাস করতে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসসহ সবার সঙ্গে ‘ঘুষের কন্ট্রাক্ট’ করে তা খালাস করে। জালিয়াতি, বন্ড লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘন, শুল্ককর ফাঁকি দিয়ে খোলাবাজারে বিক্রিসহ প্রতিষ্ঠান সব অপকর্ম করে আসলেও ঢাকা দক্ষিণ কাস্টমস বন্ড কর্মকর্তারা সব জেনেও ‘ঘুষ’ নিয়ে নিরব রয়েছে। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করা প্রতিষ্ঠানটি হলো সাভারের বিরুলিয়া খাগান এলাকার রাফায়েত গ্রুপের রাফায়েত ফেব্রিক্স লিমিটেড। শুধু এই রাফায়েত নয়, গ্রুপের অপর বন্ডেড প্রতিষ্ঠান এস ইসলাম হোম অ্যান্ড ফ্যাশনস লিমিটেডের একই অবস্থা। বিজনেস বার্তার অনুসন্ধানে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

** আমদানি ৪৯২৭ মেট্রিক টন, রপ্তানি ১২১৩ মেট্রিক টন, ৩৭৯৭ টন কাপড়ের হদিস নেই

অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমের হিসাব অনুযায়ী, রাফায়েত ফেব্রিক্স লিমিটেডকে ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেট থেকে বন্ড লাইসেন্স দেওয়া হয়। লাইসেন্স পাওয়ার পরের মাস ৩ নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ১২ নভেম্বর পর্যন্ত (১ বছর ৩ দিন) বন্ড সুবিধায় ৩৫৮ কন্টেইনারে ৪৯ লাখ ২৭ হাজার ৪৫০ কেজি কাপড় আমদানি করেছে। যা টন হিসেবে প্রায় ৪ হাজার ৯২৭ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ২০২৪ সালের দুই মাসে মাত্র ৯ কন্টেইনার কাপড় আমদানি করেছে। কিন্তু ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১১ মাসে ৩৪৯ কন্টেইনার কাপড় আমদানি করেছে। অর্থাৎ প্রতিমাসে গড়ে ৩১ কন্টেইনার কাপড় আমদানি করেছে। আবার কোন কোন মাসে সর্বোচ্চ ৯ কন্টেইনার পর্যন্ত কাপড় খালাস নিয়েছে। চীন থেকে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি করা এই কাপড়ের মূল্য ২৪০ কোটি ৭৮ লাখ ১০ হাজার ৫৯৪ টাকা। যাতে প্রযোজ্য শুল্ককর ১৭১ কোটি ৯০ লাখ ৬০ হাজার ১৬ টাকা। আমদানি করা এই কাপড় খালাসের দায়িত্বে ছিলো সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ফাহিমা কার্গো লাইন লিমিটেড, এফএ সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, এস কে ইন্টারন্যাল, রাজিব এন্টারপ্রাইজ। তবে সবচেয়ে বেশি খালাস করেছে রাজিব এন্টারপ্রাইজ, যার মালিক মো. রাজিব খান।
Broker Khurshid Alam
রপ্তানির হিসাবে আরো দেখা গেছে, রাফায়েত ফেব্রিক্স লিমিটেড ২০২৪ সালে নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে ৯ কন্টেইনারে মোট ২ লাখ ৩০ হাজার ১৪ কেজি কাপড় আমদানি করেছে। তবে ২০২৪ সালে এই প্রতিষ্ঠান কোনো পণ্য রপ্তানি করেনি। প্রতিষ্ঠানটি সর্ব প্রথম চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি এবং সর্বশেষ ২২ জুন পণ্য রপ্তানি করেছে বলে অ্যাসাইকুডায় তথ্য রয়েছে। তবে রপ্তানিতে ব্যাপক অসঙ্গতি রয়েছে। এই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি পণ্য রপ্তানি করেছে ১১ লাখ ৩০ হাজার ১৪১ কেজি বা ১ হাজার ১৩০ মেট্রিক টন। তবে রপ্তানিতে যেসব তথ্য দেওয়া হয়েছে, তাতে পণ্য রপ্তানি হয়েছে কিনা-তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। রপ্তানি হিসেবে দেখানো হয়েছে টি-শার্ট, লেডিস সেট, ম্যাক্সি, বয়েজ সেট, টাউজার, প্যান্ট, লেডিস ড্রেস ইত্যাদি। তবে প্রতিষ্ঠান যেসব কাপড় আমদানি করেছে, তার সঙ্গে রপ্তানি পোশাকের তেমন মিল নেই। আবার প্রতিষ্ঠানটি কাপড় আমদানি করেছে প্রায় ৪ হাজার ৯২৭ মেট্রিক টন। আর পোশাক রপ্তানি করেছে মাত্র ১ হাজার ১৩০ মেট্রিক টন। বাকি ৩ হাজার ৭৯৭ মেট্রিক টন কাপড়ের গরমিল রয়েছে। অর্থাৎ এই কাপড়ের কোনো হদিস নেই, যা ইসলামপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করে দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

** ইউডিতে অনুমোদিত পণ্য ও রপ্তানি পণ্যে মিল নেই

অ্যাসাইকুডা সিস্টেমের তথ্যমতে, রাফায়েত যে ৩৫৮ কন্টেইনার কাপড় আমদানি করেছে, তার মধ্যে ৮টি বিল অব এন্ট্রিতে ৮৩ হাজার ৩৯ কেজি বা ৮৩ মেট্রিক টন পলিস্টার নিটেড প্লেস ফেব্রিক্সস আমদানি করেছে, যা কম্বলের কাপড় হিসেবে পরিচিত। এছাড়া ১২৬ বিল অব এন্ট্রিতে পলিস্টার ফ্রেবিক্সস ৩০ লাখ ৯৭ হাজার ৪৫৭ কেজি বা ৩ হাজার ৯৮ মেট্রিক টন পলিস্টার ফেব্রিক্সস, পলিস্টার টেক্সটার্ন ওভেন ফেব্রিক্সস, পলিস্টার প্রিন্টেড ফেব্রিক্সস ও পলিস্টার রায়ন ফেব্রিক্সস আমদানি করেছে-যা ইসলামপুরের বোরকার কাপড় হিসেবে পরিচিত। আবার কাস্টম হাউসে ‘কন্ট্রাক্টে’ খালাস করায় একটি ঘোষণা দিয়ে আরেকটি খালাস, ঘোষণার অতিরিক্ত খালাস করার অভিযোগও রয়েছে। আমদানি ছাড়াও রপ্তানিতে এই প্রতিষ্ঠানের জালিয়াতি সহজে সামনে এসেছে। কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (দক্ষিণ) থেকে সম্প্রতি রাফায়েত ফেব্রিক্স লিমিটেডকে কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়েছে। যাতে বলা হয়েছে, ‘ইউডিতে অনুমোদিত পণ্য ও রপ্তানি পণ্যের ভিন্নতার’ বিষয়ে কারণ দর্শানো। নোটিশে বলা হয়েছে, রাফায়েত ফেব্রিক্স ২২৫ কার্টুন পণ্য রপ্তানির জন্য চলতি বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা কাস্টম হাউসে বিল অব এক্সপোর্ট দাখিল করে। কায়িক পরীক্ষায় দেখা গেছে, ইউডিতে উল্লিখিত রপ্তানি পণ্যের সাথে কায়িক পরীক্ষায় প্রাপ্ত পণ্যের ভিন্নতা দেখা গেছে। ইউডি অনুযায়ী আমদানি করা ২২ হাজার ৪৮০ কেজি শতভাগ পলিস্টার ফেব্রিক্স নিটেড প্লেস ফেব্রিক্সস দিয়ে ‘মেনস সুয়েট শার্ট’ রপ্তানির অনুমোদন থাকলেও তা পাওয়া যায়নি। কায়িক পরীক্ষায় শতভাগ পলিস্টার লেডিস ম্যাক্সি, শার্ট (৬০ শতাংশ কটন ও ৪০ শতাংশ পলিস্টার), শতভাগ পলিস্টার কিডস সেট, শতভাগ কটন প্যান্ট, শতভাগ নিট টি-শার্ট, পাঞ্জাবি (৭০ শতাংশ কটন, ৩০ শতাংশ পলিস্টার), শতভাগ পলিস্টার লেডিস প্লাজো সেট, শতভাগ পলিস্টার শর্ট প্যান্ট, শতভাগ পলিস্টার টাইলস, শতভাগ পলিস্টার লেডিস সেট, শতভাগ নিট বয়েস অ্যান্ড গার্লস সেট, শতভাগ গার্লস ফ্রক। আরো দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি ইউডিতে অনুমোদিত রপ্তানি পণ্য উৎপাদনে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে BBLC No: 0000026624050004, B/E No: 118914, Date: 16.01.2025 এর মাধ্যমে আমদানি করা ২২ হাজার ৪৮০ কেজি শতভাগ পলিস্টার ফেব্রিক্সস দিয়ে পণ্য উৎপাদন না করে ‘অবৈধ অপসারণের বিষয়টি সুকৌশলে আড়াল’ করার জন্য B/Ex No: C121603 দাখিল করে। অবৈধভাবে অপসারিত এই কাপড়ের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য প্রায় এক কোটি ২৪ লাখ টাকা। যাতে প্রযোজ্য শুল্ককর প্রায় এক কোটি ১০ লাখ টাকা। অর্থাৎ একটি চালানে যে কাপড় বা কম্বলের কাপড় আমদানি করেছে, তা খোলাবাজারে প্রতিষ্ঠান বিক্রি করে দিয়েছে। অথচ জালিয়াতি করতে অন্য কাপড় দিয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানি করতে গিয়ে ধরা খেয়ে গেছে। শুধু এই চালান নয়, আমদানি করা এক তৃতীয়াংশ কাপড় এইভাবে প্রতিষ্ঠানটি বিক্রি করে দিয়েছে। জালিয়াতি করে প্রতিষ্ঠান কাস্টমস আইন ও বন্ড ওয়্যারহাউস লাইসেন্স বিধিমালা লঙ্ঘন করেছে।

** পণ্য রপ্তানি না করেই জালিয়াতি করেছে কিনা-তা জানতে চট্টগ্রাম কাস্টমসে বন্ড কমিশনারেট চিঠি দিয়েছে

বিশ্বস্ত সূত্রমতে, রাফায়েত ২৮ জানুয়ারি থেকে ২২ জুন পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ১৩০ মেট্রিক টন পণ্য রপ্তানির যে হিসাব দেখিয়েছে, তা আদো রপ্তানি হয়েছে কিনা-তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। খোদ ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেটের কর্মকর্তাদের কাছে সন্দেহ লাগছে। কারণ রপ্তানি দেশ, রপ্তানি পণ্য, রপ্তানি পণ্যের পরিমাণ-সব কিছুতে অসঙ্গতি রয়েছে। এই ধরনের বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান রপ্তানি না করেও ‘অসাধু কাস্টমস কর্মকর্তাদের’ সঙ্গে যোগসাজস করে অ্যাসাইকুডায় ভুয়া রপ্তানি দেখিয়ে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বন্ড কমিশনারেটের কাছে সন্দেহ তৈরি হওয়ায় রাফায়েত ফেব্রিক্সের ‘রপ্তানি করা পণ্যের নমুনা ও সংশ্লিষ্ট রপ্তানির দলিল যাচাই’ করে মতামত দিতে ৮ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের সেই চিঠিতে বলা হয়েছে, রাফায়েত ফেব্রিক্স লিমিটেড ১০ মে পণ্য রপ্তানির জন্য এছাক ব্রাদার্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ডিপোতে বিল অব এক্সপোর্ট (নং-৮৯৬৬২৪) দাখিল করে। এই বিল অব এক্সপোর্টে উল্লিখিত ইউডি (নং-২৪/২০৭০/০২, তারিখ-২২.১২.২০২৪) চালানটিতে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানি পরবর্তী যথাযথভাবে ইন-টু-বন্ড করা হয়েছে কিনা এবং আমদানি করা কাঁচামাল ব্যবহার করে তৈরি করা পণ্য রপ্তানির উদ্দেশ্যে এক্স-বন্ড করা হয়েছে কিনা-তা নমুনা দৃষ্টে ও সংশ্লিষ্ট দলিলাদি যাচাইপূর্বক মতামত (চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস) প্রয়োজন। চিঠিতে মতামত দিতে অনুরোধ করা হয়। বন্ড কর্মকর্তারা বলছেন, রাফায়েত যেসব পণ্য রপ্তানি হিসেবে দেখিয়েছে, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

** বন্ড রেজিস্টার সংরক্ষণ করে না

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সব কাজ ঘুষের কন্ট্রাক্ট করানোর কারণে প্রতিষ্ঠানটি বন্ডের কোনো নিয়ম-ই পালন করে না। ফলে রপ্তানি পণ্যের অনুকূলে আমদানি কাঁচামাল বন্ড রেজিস্টারে ইন-বন্ড ও এক্স-বন্ড করে না। কাস্টমস আইন ও ওয়্যারহাউস লাইসেন্সিং বিধিমালা অনুযায়ী বন্ড রেজিস্টার সংরক্ষণ করার বিধান থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি কোনো রেজিস্টার সংরক্ষণ করে না। এর মূল কারণ হলো পুরো কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রি। যে এইচএস কোডে কাঁচামাল আমদানি হয়েছে, তার একটাও রাফায়েত উৎপাদন করে না। সব কাঁচামাল চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি রাফায়েতের গোডাউনে আসে। সারাদিন ফ্যাক্টরিতে ইসলামপুরের গাড়িতে তা লোড করা হতো। আর রাতের বেলা ফ্যাক্টরি থেকে সরাসরি তা ইসলামপুরে চলে যায়। অর্থাৎ বন্ড সুবিধার কাঁচামাল নিয়ম করে রাফায়েত ফেব্রিক্স লিমিটেডের খাগান বিরুলিয়া সাভার ফ্যাক্টরিতে ঢুকলেও তা সরাসরি রাতের আঁধারে খোলাবাজারে চলে যায়। সেজন্য প্রতিষ্ঠান কোনো রেজিস্টারে তা এন্ট্রি করে না বলে অভিযোগ রয়েছে। বন্ড রেজিস্টার সংরক্ষণ না করায় ১৫ অক্টোবর ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেট থেকে রাফায়েত ফেব্রিক্স লিমিটেডকে কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়েছে।

** ইসলামপুর থেকে ৪০ লাখ টাকা কন্ট্রাক্টে এলসি আনে দালাল খুরশিদ আলম, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে খালাসে ঘুষের কন্ট্রাক্ট করে বাবলু

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জাকির, জাহাঙ্গীর শাহিন ও কাইয়ুম নামের ইসলামপুরের এই এজেন্ট থেকে খুরশিদ আলম এলসি এনে রাফায়েত ফেব্রিক্সকে দিতো। আর খুরশিদ আলম চট্টগ্রামের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট নেতা জামাল উদ্দিন বাবলুর মাধ্যমে বিভিন্ন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ভাড়া নিয়ে কাস্টমস কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘুষের কন্ট্রাক্ট করে এই কাপড়গুলো খালাস করে আসছে। খুরশিদ আলম ইসলামপুরের এসব এজেন্ট থেকে প্রতি এলসির বিনিময়ে প্রায় ৪০ লাখ টাকা করে আনতো। সে রাফায়েতকে প্রতি এলসিতে দিতো ১৫ লাখ টাকা। খুরশিদ রাফায়েতকে বলতো প্রতি কন্টেইনারে সিঅ্যান্ডএফ বাবদ প্রায় ২৫ লাখ টাকা খরচ হবে। তবে খুরশিদ রাফায়েত থেকে ২৫ লাখ টাকা করে নিলেও সিঅ্যান্ডএফকে ১০ লাখ টাকা দিয়ে বাকি ১৫ লাখ টাকা সে মেরে দেয়। এই ১০ লাখ টাকা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, কাস্টমস ও বন্দরকে ঘুষ দিয়ে কন্ট্রাকে কাপড় খালাস করে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া এই প্রতিষ্ঠানের কাপড় খোলাবাজারে বিক্রি ও ভাগ ভাটোয়ারার সঙ্গে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস ও ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেটের একাধিক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা জড়িত রয়েছে বলেও অনুসন্ধানে জানা গেছে।

** আমদানিতে জালিয়াতির শঙ্কা

অনুসন্ধান বলছে, দুবাই ফ্রি জোন ও বিভিন্ন দেশে রাফায়েতসহ বিভিন্ন জনের নামে কিছু লাইসেন্স করে রেখেছে। এসব লাইসেন্সে বিভিন্ন মাধ্যম দিয়ে টিটি পাঠায়। ওই সব কোম্পানির নামে সেলস কন্ট্রাক্ট বানিয়ে দুবাই থেকে টিটি পাঠায়। সেলস কন্ট্রাক্ট দিয়ে ব্যাংকে এলসি খোলে। এই ডকুমেন্ট বা টিটির বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে রাফায়েত মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য রপ্তানি দেখায়। আবার এলসিতে কাপড় আমদানি করে তা ইসলামপুরে বিক্রি করে। স্টক লটের কাঁচামাল মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে রপ্তানি দেখায়। অর্থাৎ দুবাইয়ে থাকা প্রবাসীসহ অন্যান্য ব্যক্তির টাকা এসব কোম্পানির মাধ্যমে দেশে চলে আসে। উল্লেখ্য, রাফায়েত ফেব্রিক্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলামের স্ত্রী এবং প্রতিষ্ঠানের পরিচালক বিউটি খাতুন দুবাইতে থাকেন। তিনি সেখান থেকে অবৈধ উপায়ে টিটি দেশে পাঠান বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া দেশে বন্ড সুবিধার কাপড় খোলাবাজারে বিক্রি ও রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া টাকা দুবাইতে পাঠানো হয় বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।

** রাফায়েত গ্রুপের এস ইসলাম নামের প্রতিষ্ঠানের ২,৩৮,৮২০ ও ২৪,৬০৮ কেজি কাঁচামালের হদিস নেই

একাধিক সূত্রমতে, রাফায়েত গ্রুপের তিনটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠান হলো এস ইসলাম হোম অ্যান্ড ফ্যাশনস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৩ সালের ২৭ মার্চ বন্ড লাইসেন্স পান। লাইসেন্স পাওয়ার পর থেকে কাপড় আমদানি করে তা খোলাবাজারে বিক্রি করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। অভিযোগের ভিত্তিতে ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর ঢাকা দক্ষিণ কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ২২ আগস্ট থেকে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত বন্ড সুবিধায় ১০টি বিল অব এন্ট্রিতে দুই লাখ ৩৮ হাজার ৮২০ কেজি কাপড় আমদানি করেছে। কাস্টমসের নিয়ম অনুযায়ী, কাস্টম হাউস থেকে খালাসের ৫ দিনের মধ্যে ওয়্যারহাউসে জমা প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির আমদানি করা এই বিপুল পরিমাণ কাপড় প্রতিষ্ঠানের ফ্যাক্টরি নেই। অর্থাৎ ফ্যাক্টরিতে আসেনি, সরাসরি খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। প্রায় ১২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা মূল্যের এই কাপড়ের উপর প্রযোজ্য শুল্ককর প্রায় ১১ কোটি ৩০ লাখ টাকা, যা প্রতিষ্ঠান ফাঁকি দিয়েছে। বন্ডের কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রি করায় এই প্রতিষ্ঠানকে দাবিনামাসহ কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়েছে। একইভাবে প্রতিষ্ঠানটি ২৪ হাজার ৬০৮ কেজি কাপড় খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে। যাতে প্রযোজ্য শুল্ককর প্রায় ১ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এস ইসলামও রাফায়েত ফেব্রিক্সের মতো একইভাবে বন্ড সুবিধায় কাপড় আমদানি করে পণ্য তৈরি না করে তা সরাসরি খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়ে আসছে।
Bond
** ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেটের কর্মকর্তারা ঘুষ নিয়ে চুপ, প্রোডাক্টশন নিয়ে খোঁজ নেয় না

সূত্রমতে, সাভারের বিরুলিয়া রাফায়েত গ্রুপের ১০ তলা বিল্ডিংয়ে তিনটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিটি ফ্লোরে নিয়ম করে মেশিনারিজও বসানো হয়েছে। কিন্তু কোনো প্রোডাক্টশন নেই। নেই কোনো শ্রমিক। ফ্যাক্টরি দেখাশোনার কয়েকজন শ্রমিক রয়েছে। বন্ডে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, রাফায়েত ফেব্রিক্স লিমিটেডে ১২০টি মেশিনারিজ রয়েছে। কাস্টম হাউসের হিসাব অনুযায়ী, রাফায়েত বন্ড সুবিধায় প্রতিমাসে অন্তত ৩১ কন্টেইনার কাপড় আমদানি করে। কিন্তু আমদানি করা এসব কাপড় নিয়ম অনুযায়ী বন্ড কমিশনারেটে ইন-টু-বন্ড হওয়ার কথা। সেক্ষেত্রে এসব কাপড় দিয়ে পণ্য তৈরি ও রপ্তানি হচ্ছে কিনা, খোলাবাজারে বিক্রি হচ্ছে কিনা-তা বন্ড কমিশনারেটের নিয়মিত তদারকির কথা। সূত্র বলছে, রাফায়েত ফেব্রিক্স বন্ড কমিশনারেটের সংশ্লিষ্ট সার্কেলে ‘ঘুষের কন্ট্রাক্ট’ করে রাখে, যা প্রতিমাসে দেওয়া হয়। যার ফলে বন্ড কর্মকর্তারা এই প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেন না। প্রতিমাসে বিপুল পরিমাণ কাপড় আমদানি করে খোলাবাজারে বিক্রি করলেও তা না দেখার ভ্যান করে থাকেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিজনেস বার্তার পক্ষ থেকে রাফায়েত গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম এর একাধিক ব্যক্তিগত নাম্বারে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে সব নাম্বার বন্ধ পাওয়া গেছে।

এই বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের কমিশনার মোহাম্মদ হাসমত আলী বিজনেস বার্তাকে বলেন, প্রতিষ্ঠানটির বিষয়ে আমরা খোঁজ নিচ্ছি। সম্ভবত বড় একটি মামলা হয়েছে।

এই বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিজনেস বার্তাকে বলেন, কোনো উৎপাদন-রপ্তানি কিছুই নেই। তাহলে মাসে ৩১ কন্টেইনার আমদানি-কিভাবে সম্ভব? বন্ড লাইসেন্স সেসব প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়, যারা উৎপাদন করে রপ্তানি করবে। এই ধরনের প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স কিভাবে দেওয়া হয়েছে, কারা দিয়েছে, কিসের ভিত্তিতে দিয়েছে-তা তদন্ত করা উচিত। আর প্রতিষ্ঠান সব খোলাবাজারে বিক্রি করে আসছে, প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকা সব কর্মকর্তা হয় জড়িত, না হয় কিভাবে বিক্রি করে-তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

** ১৪৫ টন বন্ডের কাপড় গোডাউনে ঢুকেনি, সড়ক থেকে ‘হাওয়া’
** ‘বন্ডের পণ্য বাজারে বিক্রি করলেই লাইসেন্স বাতিল’
** টেরিবাজারে জাহাজ থেকে খালাস হয় বন্ডের কাঁচামাল!
** বন্ড দুর্নীতিতে বছরে ৫শ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি
** তিন গার্মেন্টস মালিকের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ
** নেত্রকোনা এক্সেসরিজের ৫ কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি
** রপ্তানি না করেও পাচ্ছে প্রাপ্যতা-ইউপি, বিক্রি করে এলসি
** প্রাপ্যতা জালিয়াতি, এমডি-চেয়ারম্যানের নামে মামলা
** ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে মিলবে বন্ড সুবিধা
** ‘ট্রেজারি বন্ডের ট্যাক্স বাড়ানো হয়েছে
** বন্ড লাইসেন্স না থাকলেও কাঁচামাল আমদানির সুযোগ
** বন্ড অফিসে বহিরাগতদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা
** এইচএস কোডের চার ডিজিট মিল থাকলে খালাস করতে হবে
** এইচএস কোড ভিন্ন হলেও পণ্য খালাসে জটিলতা নেই
** এইচএস কোডের ভুলে ৪০০% জরিমানা, ব্যবসায়ীরা হয়রানি হচ্ছেন: ডিসিসিআই
** এইচএস কোড পাল্টে পণ্য খালাস নেয় বার্জার পেইন্টস
** বন্ড ছাড়াই কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেবে এনবিআর
** ১৪৫ টন বন্ডের কাপড় গোডাউনে ঢুকেনি, সড়ক থেকে ‘হাওয়া’
** কাঁচামাল আমদানিতে ছাড় দিতে চায় এনবিআর
** ‘প্রাপ্যতার সুযোগে’ বন্ডের এক্সেসরিজ খোলাবাজারে
** অনলাইনে মিলছে ‘বন্ড লাইসেন্স’
** তুলা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা
** ইপিজেডের বন্ড সুবিধার ১০৭ টন কাপড় চট্টগ্রামে আটক
** আনোয়ার গ্রুপের প্রতিষ্ঠানের বন্ড ‍সুবিধার অপব্যবহার
** ‘বন্ডের পণ্য বাজারে বিক্রি করলেই লাইসেন্স বাতিল’
** ৩০১ টন বন্ডের কাঁচামাল গায়েব করেছে ‘জেএফকে ফ্যাশন’
** অনুমোদন পেলো ‘ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেট’