প্রতারণা রোধে দরকার ব্যাংক, মোবাইল ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দায়বদ্ধতা
আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক বার্ষিক সম্মেলন
এশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই করতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে সাইবার প্রতারণা মোকাবিলায় ব্যাংক, টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। আইন প্রণেতাদেরও এ ব্যাপারে আরও জোরালো ভূমিকা নিতে হবে। আর এআই নিয়ে শঙ্কিত না হয়ে দক্ষতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া দরকার। সোমবার (১২ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সম্মেলনের কয়েকটি সেশনে এসব কথা উঠে আসে। কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে (কিউএসএনসিসি) এ সম্মেলন হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থাকে সমর্থন
‘শেপিং দ্য ফিউচার অব এশিয়া’ শীর্ষক সেশনে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, কাঁচামাল ও প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাপ্যতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি উঠে আসে। এতে নিজেদের স্বার্থেই এশিয়ার দেশগুলোকে উন্মুক্ত ও নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থাকে সমর্থন করার আহ্বান জানানো হয়। আলোচকরা বলেন, এশিয়ার অর্থনীতির সামনে যেমন নতুন সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তন, দক্ষতার ঘাটতি ও প্রযুক্তিগত রূপান্তর বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও মানসম্মত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তারা।
এসময় ভারতের অনুকূল জনমিতিক পরিস্থিতিকে অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় রূপান্তর করতে কর্মসংস্থানমুখী নীতির ওপর জোর দেন দেশটির প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. ভি অনন্ত নাগেশ্বরন। তার ভাষায়, যেসব রাজ্য তুলনামূলকভাবে উন্নত, সেগুলো উন্নত উৎপাদনশিল্পের দিকে এগোতে পারে। অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে থাকা রাজ্যগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির সুযোগ কাজে লাগিয়ে শ্রমঘন শিল্প ও সেবা খাতের বিকাশ ঘটাতে পারে। সেই সঙ্গে তিনি যুক্তরাজ্যের সঙ্গে কার্যকর হওয়া বাণিজ্য চুক্তি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তির সুযোগ কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন। তার মতে, এসব বাজারে তুলনামূলক কম শুল্কে প্রবেশের সুযোগ শ্রমঘন উৎপাদন ও সেবা খাতের সম্প্রসারণে সহায়ক হতে পারে।
সাইবার প্রতারণা ঠেকানো
অন্য একটি সেশনে সাইবার ও আর্থিক প্রতারণা মোকাবিলায় আইন প্রণয়ন, নজরদারি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, প্রতারণা সংঘটনের জন্য সাধারণত তিনটি বিষয় প্রয়োজন—ভুয়া পরিচয় তৈরি, অর্থ স্থানান্তরের ব্যবস্থা ও সম্ভাব্য ভুক্তভোগীর কাছে পৌঁছানোর সুযোগ। একজন বক্তা বলেন, যারা এই তিনটি ক্ষেত্রে দায়িত্বে রয়েছে, প্রতারণার দায়দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদেরই ভূমিকা থাকা উচিত, শুধু ভুক্তভোগীর ওপর দায় চাপানো উচিত নয়। প্রতারণা প্রতিরোধে ব্যাংক, টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে আইনপ্রণেতাদের সমন্বিতভাবে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
কর্মসংস্থানে এআইয়ের প্রভাব
‘চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড অপরচুনিটিজ ইন দ্য এজ অব এআই’ শীর্ষক সেশনে আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের দিব্যা কীর্তি বলেন, যেসব পেশায় এআইয়ের কার্যকারিতা তুলনামূলক বেশি, সেসব ক্ষেত্রে নিয়োগদাতাদের চাহিদা প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে। তবে এআইয়ের সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থানের পরিস্থিতির অবনতি একই হারে ঘটেনি। এর অন্যতম কারণ, নিয়োগদাতারা এখন এমন কর্মী খুঁজছেন, যারা এআই ব্যবহার করে কাজের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারবেন।

দক্ষতা উন্নয়ন নিয়ে আলোচনায় বক্তারা বলেন, শুধু প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বা পাঠ্যক্রম তৈরি করলেই হবে না, কারিগরি শিক্ষার প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন প্রয়োজন। বক্তাদের মতে, কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতাভিত্তিক পেশাকে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং মর্যাদাপূর্ণ করে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন। এতে তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি অর্থনীতির প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তির ঘাটতিও কমানো সম্ভব হবে।
কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা
ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয় অনুষ্ঠানে। বক্তাদের মতে, কৃষিতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশে কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজন করা গেলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ বাড়বে।
জিডিপির পূর্বাভাসে একাধিক মডেল ব্যবহার
অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি বুঝতে ও মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) পূর্বাভাস দিতে একাধিক মডেল ব্যবহারের গুরুত্ব তুলে ধরা হয় একটি সেশনে। এতে জানানো হয়, একটি মডেলের ওপর নির্ভর না করে ১৫টি মডেল তৈরি করে সেগুলোর পূর্বাভাসের সক্ষমতা যাচাই করা হয়। এরপর যে মডেলটি সবচেয়ে নির্ভুল পূর্বাভাস দিতে পারে, সেটিকে নির্বাচন করা হয়। অনুষ্ঠানে আইএমএফের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমি শুধু একটি মডেল বেছে নেবো না, ১৫টি মডেল বেছে নেবো। এরপর দেখবো, প্রশিক্ষণ সেটে অন্তর্ভুক্ত করিনি—এমন চারটি প্রান্তিক সময়ের পূর্বাভাস কোন মডেলটি সবচেয়ে ভালো দিতে পারে।’
ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোগের জন্য বিধিনিষেধ কমানো
ব্যবসা পরিচালনার নিয়মকানুন সহজ করাকে শুধু বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির বিষয় হিসেবে না দেখে কর্মসংস্থান নীতির অংশ দেখার আহ্বান জানান ভারতের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. ভি অনন্ত নাগেশ্বরন। তিনি বলেন, বিধিনিষেধ শিথিল করা ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমায়, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের ক্ষেত্রে। তার মতে, বড় প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের জন্য বিভিন্ন নিয়ম মেনে চলার ব্যয় ও জটিলতা বেশি। এসব বাধা কমানো গেলে প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন কর্মী নিয়োগ, প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এবং ব্যবসা সম্প্রসারণে বেশি সম্পদ ব্যবহার করতে পারবে।
এশিয়ায় ভূরাজনীতি ও জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এশিয়ার বহু দেশে কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আলোচনায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। জলবায়ুজনিত দুর্যোগের পূর্বাভাস, প্রস্তুতি ও ক্ষয়ক্ষতি কমানোর সক্ষমতা বাড়াতে শিক্ষা, প্রযুক্তি ও গবেষণায় আরও বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
