কাঠামোগত অসঙ্গতি উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অনিরাপদ ঋণ ও দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে আটকে রাখছে। এই গভীর অর্থনৈতিক ত্রুটি খোলাখুলিভাবে চিহ্নিত করে আন্তর্জাতিক ফোরামের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার পাশাপাশি টেকসই সমাধানের দাবি জানানো হয়েছে।
বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর রেয়াতি উইন্ডোগুলোর মধ্যে ঋণের মেয়াদ ও মূল্য নির্ধারণের হার আরও সুবিন্যস্ত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ করার সুপারিশ করা হয়েছে। জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা সব দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি (যেমন ৪০ বছর মেয়াদি) ঋণের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সোমবার (১২ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের ব্যাংককে কুইন সারিকিট ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভায় অনুষ্ঠিত ‘১৭তম ভি২০ মিনিস্টারিয়াল কমিউনিক’ থেকে এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ৭৭টি দেশের অর্থমন্ত্রী সরাসরি এবং অনলাইনের মাধ্যমে এ সভায় অংশ নিয়ে তাদের দাবি তুলে ধরেন। আজকের সভায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও অংশ নেন।
উন্নয়নশীল দেশের জন্য বেসরকারি পুঁজি সংগ্রহে বিশ্বব্যাংকের রেকর্ড
২০ মিনিস্ট্রিয়াল গ্রুপ হলো বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীদের একটি অন্যতম প্রধান ফোরাম। ২০১৫ সালে গঠিত এই জোটটির প্রধান লক্ষ্য হলো জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ও আর্থিক ক্ষতি মোকাবেলা করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়ন। ২০১৫ সালে পেরুর লিমায় যখন এই জোটটি যাত্রা শুরু করে তখন এর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য দেশ ছিল ২০টি। পরবর্তীতে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়তে থাকায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের আরও অনেক দেশ এই জোটে যোগ দেয়। এর ফলে বর্তমান সদস্য সংখ্যা বেড়ে ৭৪-এ দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ এই জোটের অন্যতম একটি সক্রিয় ও প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য দেশ। ১৭তম ভি২০ মিনিস্ট্রিয়াল কমিউনিক রিপোর্টে উন্নয়ন অর্থায়নের প্রচলিত কাঠামোর ত্রুটি ও নৈতিক অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে।
এতে অত্যন্ত জোরালোভাবে বলা হয়েছে যে, জলবায়ু ও উন্নয়নের সংকট কোনো নিছক আর্থিক সমস্যা নয় বরং এটি একটি নৈতিক প্রশ্ন। যে জনকল্যাণমূলক অবকাঠামো বা সম্পদগুলো (যেমন পানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা) ৫০ থেকে ১০০ বছর ধরে অর্থনৈতিক সুফল দিতে সক্ষম সেগুলোর জন্য বর্তমান বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় মাত্র ১৫ থেকে ২০ বছরের মেয়াদি ঋণ দেওয়া হয়। আজকের সভায় এ সময়সীমা বাড়িয়ে ৪০ বছর করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে আরও বলা হয়েছে, বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৪ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করেন প্রায় দুইশো কোটি (১.৯ বিলিয়ন) মানুষ। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ধীরগতি, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার ঘাটতি রয়েছে। এর পাশাপাশি বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং জ্বালানি সরবরাহের বড় ধাক্কা এই অসম উন্নয়নকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
এমন অবস্থায় উন্নয়ন অর্থায়নের বিদ্যমান কাঠামো উন্নয়নের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দীর্ঘমেয়াদি জনসম্পদের বিপরীতে ১৫ থেকে ২০ বছরের মেয়াদি অর্থায়ন এবং উচ্চ বার্ষিক ঋণ-সেবা খরচ অর্থনৈতিক টেকসই ও জনস্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ভি-২০ দেশের মধ্যে চরম ঋণ সংকটে আছে ৫টি রাষ্ট্র, উচ্চঝুঁকিতে ১৭টি এবং মাঝারি ঝুঁকিতে রয়েছে ২২টি দেশ। অর্ধেকেরও বেশি সদস্য দেশ তাদের সরকারি রাজস্বের ১০ থেকে ২০ শতাংশ এবং প্রায় ডজনখানেক দেশ অভ্যন্তরীণ সুদ পরিশোধে তাদের রাজস্বের এক পঞ্চমাংশের বেশি ব্যয় করছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতি পরিমাপের ক্ষেত্রে টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতি পরিমাপের প্রধান মাপকাঠি হওয়া উচিত। স্বাস্থ্য, জ্বালানি, পরিবহন, সরবরাহ চেইন এবং খাদ্য সরবরাহ খাতে অবকাঠামো উন্নত করার মাধ্যমে শক বা ধাক্কা মোকাবিলা করার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে।
