নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভিত্তিক শিল্পের প্রসার নিশ্চিত করতে সরবরাহ পর্যায়ে উৎসে করহার বাড়ানো হচ্ছে না। মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে পণ্য রাখার লক্ষ্যে বিএনপি সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিদ্যমান শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করহার অপরিবর্তিত থাকবে এবং চলতি অর্থবছরের তুলনায় আরও কিছু পণ্য এ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি আমদানি পর্যায়ে ১২৮টি পণ্যের বিদ্যমান করহারও বহাল থাকবে। অর্থমন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছর থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।
পণ্যগুলো হলো, ধান, ধানের কুড়া, চাল, পুষ্টি চালের কার্নেল, গম, আলু, গবাদি পশু, গবাদি পশুর হাড়, হাঁস-মুরগি, মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, রসুন, মটর, ছোলা, মসুর ডাল, আদা, হলুদ, শুকনো মরিচ, ডাল, ভুট্টা, আটা, ময়দা, লবণ, ভোজ্যতেল, চিনি, বীজ, পাট, পাটকাঠি, তুলা, সরিষা, তিল, কাঁচা চা-পাতা, গোলমরিচ, এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, তেজপাতা, ডিম, শাকসবজি, লেবু, কাঁচামরিচ, তরল দুধ, স-মিলের ভূসি, পোল্ট্রি ফিড, পিলেটেড পোল্ট্রি ফিড, মাশরুম, মধু, গুড়, তামাক ব্যতীত অন্যান্য গাছের পাতা ও বাকল, লতা-পাতা, চিটাগুড়, খৈল, সয়াবিন মিল, ডি-ও-আর-বি (De- oiled Rice Bran), কাঁচা চামড়া, জৈব সার, জৈব কীটনাশক বা বালাইনাশক।
এ বিষয়ে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর প্রেসিডেন্ট এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, উৎসে করের আগের হার বহাল থাকলে বাজারের প্রবণতা অপরিবর্তিত থাকার কথা। তবে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পেছনে আরও অনেক কারণ রয়েছে, যেমন মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়া। এসব কারণে ইতোমধ্যে বাজারে প্রভাব পড়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তিনি আরও বলেন, সরকার যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে কাস্টমস ডিউটি বা শুল্কের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়, তাহলে তা দেশের সাধারণ মানুষের জন্য ভোগান্তির কারণ হবে। কারণ ব্যবসায়ীরা শুল্কের খরচ নিজেরা বহন না করে তা ভোক্তাদের ওপরই চাপিয়ে দেয়, যার চূড়ান্ত বোঝা গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর।
সমাধানের পথ হিসেবে এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ক্যাবের পক্ষ থেকে প্রস্তাব হলো আমদানি পর্যায়ে বিভিন্ন পণ্যে আরোপিত কাস্টমস ডিউটি, এসডি (সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি), আরডি, আইটি এবং এআইটিসহ একাধিক শুল্ক পুনর্বিবেচনা করা। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, চিনির ক্ষেত্রে প্রতি কেজিতে প্রায় ৩০–৩২ টাকা পর্যন্ত সরকার কর ও শুল্ক হিসেবে নিয়ে থাকে, যেখানে বাজারমূল্য প্রায় ১১০ টাকা; ফলে এ ধরনের উচ্চ শুল্ক দ্রব্যমূল্যের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। তিনি আরও বলেন, সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যকে ‘এসেনশিয়াল কমোডিটি’ হিসেবে ঘোষণা করলেও বাস্তবে এসব পণ্যের ওপর উল্লেখযোগ্য শুল্ক আরোপ থাকায় তা মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। তার মতে, এই পণ্যগুলো বিভিন্ন পর্যায়ের শুল্ক পেরিয়ে ভোক্তার হাতে পৌঁছালে স্বাভাবিকভাবেই দাম বেড়ে যায়, যার পুরো চাপ পড়ে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর।
উৎসে কর বিধিমালা, ২০২৪ অনুযায়ী এইচএস কোডযুক্ত ১৮৯টি আমদানি পণ্যে কোনো উৎসে কর ছিল না। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে ১২৮টি পণ্যে ০.৫-২ শতাংশ হারে উৎসে কর তথা অগ্রিম আয়কর (এআইটি) বসায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এ ছাড়া ভুটান থেকে আমদানি হওয়া ৩৩টি পণ্যেও উৎসে কর নেই (২০১৩ সালে সরকার টু সরকার চুক্তি অনুযায়ী ভুটানের এসব পণ্য সব ধরনের কর ও শুল্কমুক্ত)।
এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস-এর পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর গত বছরের মতো উৎসে কর (TDS) শূন্য দশমিক ৫ শতাংশে বহাল রাখা একটি প্রশংসনীয় সিদ্ধান্ত, যা কর বৃদ্ধির অজুহাতে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি রোধে সহায়ক হবে। তিনি বলেন, আরও বেশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য এই কর কাঠামোর আওতায় আনা হলে নিয়মিত ক্রেতাদের জন্য স্বস্তি আসবে, কারণ শেষ পর্যন্ত এর বোঝা ভোক্তারাই বহন করেন। তবে তিনি মনে করেন, যেকোনো নীতির সফলতা নির্ভর করে এর সঠিক বাস্তবায়নের ওপর; তাই ব্যবসাক্ষেত্রে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সার্কেল অফিসগুলোকে কঠোরভাবে তদারকি করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, বিক্রেতাদের ওপর আরোপিত ন্যূনতম টার্নওভার কর অর্ধেকে (০.৫%) নামিয়ে আনা হলে এই উদ্যোগ আরও কার্যকর ও যুগোপযোগী হতে পারত।
