সকালের এক কাপ ধোঁয়া ওঠা গরম দুধ চা অনেকের দিন শুরু করার অবিচ্ছেদ্য অংশ। আবার বিকেলের আড্ডা কিংবা উৎসব-পার্বণের সেমাই–পায়েস, বিস্কুট ও কেকেও রয়েছে দুধের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে এখন গুঁড়া দুধ একটি অপরিহার্য উপাদানে পরিণত হয়েছে। তরল দুধের পুষ্টিগুণ অনস্বীকার্য হলেও সরবরাহ ও সংরক্ষণে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জ থাকায় গুঁড়া দুধ সহজ ও নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। একসময় যা কেবল বিকল্প বা জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার হতো, তা এখন ব্যাপক চাহিদার পণ্যে পরিণত হয়েছে, যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে আমদানির ক্রমবর্ধমান প্রবণতাতেও।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ১ লাখ ৫৮ হাজার টন গুঁড়া দুধ আমদানি করা হয়েছে, যার জন্য ব্যয় হয়েছে ৫২ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ৬ হাজার ৪৪৮ কোটি টাকা। একই সময়ে এই আমদানি করা গুঁড়া দুধ খালাস থেকে সরকার প্রায় ২ হাজার ১৪০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে। ফলে আমদানি ব্যয় ও কর মিলিয়ে দেশে গুঁড়া দুধ আনতে মোট খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা। সাধারণত ২৫ কেজির বস্তায় গুঁড়া দুধ আমদানি করা হয়, যা পরে কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন আকারের প্যাকেটে বাজারজাত করা হয় এবং এতে মূল্য সংযোজন হয়ে বাজারের পরিসর আরও বৃদ্ধি পায়। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, ব্র্যান্ডভেদে বর্তমানে প্রতি কেজি গুঁড়া দুধ ৮৩০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যার ফলে দেশে গুঁড়া দুধের খুচরা বাজারের আকার এখন আনুমানিক ১৩ থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকার মধ্যে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় উদ্যোক্তারা বাজার ধরতে পারছেন না
তরল দুধ থেকেই মূলত গুঁড়া দুধ তৈরি হয়। তবে বাংলাদেশে চাহিদার তুলনায় তরল দুধের উৎপাদন এখনো কম থাকায় দেশীয়ভাবে গুঁড়া দুধ উৎপাদনের সুযোগ সীমিত। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে তরল দুধের চাহিদা ছিল ১ কোটি ৬২ লাখ টন, বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৫৫ লাখ টন, অর্থাৎ ঘাটতি ছিল প্রায় ৭ লাখ টন। বর্তমানে মিল্ক ভিটা, ব্র্যাক ও প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ তরল দুধ থেকে সীমিত পরিসরে গুঁড়া দুধ উৎপাদন করছে, যার পরিমাণ বছরে প্রায় ৫ থেকে সাড়ে ৫ হাজার টন। অথচ কোম্পানিগুলোর হিসাব অনুযায়ী দেশে গুঁড়া দুধের মোট চাহিদা ১ লাখ ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ ৭০ হাজার টনের মধ্যে, ফলে প্রায় ৯৫ শতাংশ চাহিদাই পূরণ করতে হচ্ছে আমদানির মাধ্যমে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বাসাবাড়িতে পানীয় হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি দুগ্ধজাত পণ্য তৈরিতে বেশ ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে চায়ের দোকান, হোটেল-রেস্তোরাঁ, বেকারি, মিষ্টির দোকান ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে গুঁড়া দুধের ব্যবহার বাড়ছে। তরল দুধের তুলনায় দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা যায় বলে বাণিজ্যিক ব্যবহারকারীদের কাছেও এর গ্রহণযোগ্যতা বেশি।
দেশি ব্র্যান্ডের দাপট, বিশেষায়িত পণ্যে বহুজাতিক
এনবিআরের তথ্যানুযায়ী, গত বছর দেশে ৯৬টি প্রতিষ্ঠান গুঁড়া দুধ আমদানি করেছে এবং এর মধ্যে প্রায় অর্ধশত প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ব্র্যান্ডে তা বাজারজাত করছে। আমদানিতে শীর্ষে রয়েছে আবুল খায়ের মিল্ক প্রোডাক্টস লিমিটেড, যারা মার্কস, আমা, স্টারশিপ ও অরা ব্র্যান্ডে গুঁড়া দুধ বাজারজাত করে। ১৯৯৭ সালে বাজারে আসে তাদের মার্কস ফুল ক্রিম মিল্ক পাউডার, যার কাঁচামাল মূলত অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড থেকে সংগ্রহ করা হয়। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ফ্রেশ ব্র্যান্ড, এরপর নিউজিল্যান্ড ডেইরি প্রোডাক্টস লিমিটেডের ডিপ্লোমা। আমদানির তালিকায় পরবর্তী অবস্থানে রয়েছে প্রাণ ডেইরি ও দেশি কনজ্যুমার প্রোডাক্টস। এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, আমদানি করা গুঁড়া দুধের প্রায় ৯৬ শতাংশ বাজার দেশীয় কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বিশেষায়িত পণ্যের ক্ষেত্রে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর উপস্থিতি রয়েছে, যার মধ্যে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক নেসলে নিডো ব্র্যান্ডে এবং ডেনমার্কভিত্তিক আরলা ফুড ডানো ব্র্যান্ডে গুঁড়া দুধ বাজারজাত করছে।
সবচেয়ে বড় উৎস নিউজিল্যান্ড
এনবিআরের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে ২৯টি দেশ থেকে বাংলাদেশে গুঁড়া দুধ আমদানি হয়। তবে এককভাবে সবচেয়ে বড় উৎস নিউজিল্যান্ড। মোট আমদানির প্রায় ৬১ শতাংশই আসে দেশটি থেকে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চীন থেকে আসে প্রায় ৬ শতাংশ। এরপর রয়েছে তুরস্ক, বেলারুশ ও চেক প্রজাতন্ত্র। সব মিলিয়ে শীর্ষ পাঁচটি দেশ থেকেই আসে বাংলাদেশের আমদানি করা গুঁড়া দুধের প্রায় ৮১ শতাংশ।
