টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার বাবুপুর গ্রামে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণে এক হয়েছেন গ্রামবাসী। ধনী-গরিবের ভেদাভেদ ভুলে সবার কাছ থেকে টাকা তুলে কেনা হয়েছে ৬০ শতাংশ জমি। নিজেদের খেলার মাঠের জন্য কেনা জমির দখল বুঝে পেয়ে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠেন গ্রামের মানুষ। গত বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে জমিটি গ্রামবাসীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ উপলক্ষে সকাল থেকেই গ্রামে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে বিভিন্ন বয়সী মানুষ জমিতে জড়ো হন। সেখানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের পাশাপাশি গ্রামের প্রবীণদের ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেন তরুণেরা। দিনভর চলে আনন্দ-উৎসব।
জানা গেছে, বাবুপুর গ্রামে সাত শতাধিক পরিবারের বসবাস। জনসংখ্যা সাড়ে তিন হাজারের বেশি হলেও এত দিন সেখানে নির্দিষ্ট কোনো খেলার মাঠ ছিল না। ধান কাটার পর ফাঁকা জমিতে শিশু-কিশোরেরা খেলাধুলা করত। কিন্তু নতুন করে ফসলের আবাদ শুরু হলে বন্ধ হয়ে যেত তাদের খেলা। দীর্ঘদিনের এই সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেন বাবুপুর গ্রামের এস এম ইকবাল মাহমুদ ও ক্রীড়াব্যক্তিত্ব খোরশেদ আলম। কয়েক মাস আগে তাদের আলোচনার মধ্য দিয়ে মাঠের জন্য জমি কেনার পরিকল্পনা শুরু হয়। পরে গ্রামের সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারাও সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এর ধারাবাহিকতায় গত ৮ সেপ্টেম্বর গ্রামবাসীকে নিয়ে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপস্থিত সবাই জমি কেনার পক্ষে মত দেন এবং নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন।
উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, গ্রামের কেউ ২০০ টাকা, কেউ ৫০০ বা এক হাজার টাকা দিয়েছেন। আবার কেউ দুই হাজার, পাঁচ হাজার কিংবা ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সহায়তা করেছেন। ইকবাল মাহমুদ, খোরশেদ আলমসহ গ্রামের কয়েকজন ব্যক্তি বেশি পরিমাণ অর্থ দিয়ে উদ্যোগটি বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখেন। সবার দেওয়া অর্থে গ্রামের ইকবাল হোসেন সুজনের কাছ থেকে ৬০ শতাংশ জমি কেনা হয়। প্রতি শতাংশ জমির দাম নির্ধারণ করা হয় ৫২ হাজার টাকা। জমির মালিকও এক শতাংশ জমি দান করেন।
উদ্যোক্তা খোরশেদ আলম জানিয়েছেন, আপাতত ৬০ শতাংশ জমি কেনা হয়েছে। এর পাশে আরও ৬০ শতাংশ জমি কেনার পরিকল্পনা আছে। সব মিলিয়ে ১২০ শতাংশ জমি পাওয়া গেলে সেখানে একটি মানসম্মত খেলার মাঠ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এই মাঠকে কেন্দ্র করে গ্রামের ক্রীড়াচর্চা এগিয়ে নেওয়াই তাদের লক্ষ্য। নতুন মাঠ পেয়ে উচ্ছ্বসিত গ্রামের শিশু-কিশোরেরাও। তারা জানিয়েছে, আগে ধান কাটার পর জমিতে খেলাধুলা করা গেলেও ফসলের আবাদ শুরু হলে আর খেলার সুযোগ থাকত না। এখন সারা বছর খেলার সুযোগ তৈরি হওয়ায় তারা আনন্দিত।
গ্রামের প্রবীণ পল্লিচিকিৎসক মুরতুজ আলী জানিয়েছেন, একটি খেলার মাঠের জন্য তারা দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করেছেন। অবশেষে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হওয়ায় গ্রামের সবাই আনন্দিত। বাবুপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও মোনালিসা উইমেন্স স্পোর্টস একাডেমির পরিচালক মোনালিসা মুন্নি বলেছেন, গ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি খেলার মাঠ। সম্মিলিত উদ্যোগে সেই প্রত্যাশা পূরণ হওয়া বড় অর্জন। সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের সহায়তা ছাড়াই গ্রামবাসীর নিজেদের অর্থায়নে জমি কেনার উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন সরকারি মাওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শামসুল হুদা। তার মতে, বাবুপুরের এই উদ্যোগ দেশের অন্যান্য গ্রামের মানুষকেও নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে অনুপ্রাণিত করবে।
দেলদুয়ার উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান এস এম ফেরদৌস বলেছেন, ধনী-গরিবের ভেদাভেদ ভুলে গ্রামবাসীর সম্মিলিত অর্থায়নে খেলার মাঠের জন্য জমি কেনার উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। খেলাধুলা শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাবুপুরের এই উদ্যোগ শুধু একটি খেলার মাঠ তৈরি নয়, বরং গ্রামের মানুষের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। দেলদুয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জোহরা সুলতানা যূথী জানিয়েছেন, গ্রামবাসীর নিজস্ব উদ্যোগে টাকা তুলে খেলার মাঠের জন্য জমি কেনার বিষয়টি অত্যন্ত ইতিবাচক ও প্রশংসনীয়। একটি খেলার মাঠ শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগ তৈরির পাশাপাশি মাদক ও বিভিন্ন সামাজিক অপরাধ থেকে দূরে রাখতেও সহায়তা করে।
