নবম পে-স্কেল নিয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান

বিচার বিভাগীয় পে-কমিশনের প্রতিবেদন ঘিরে তৈরি হওয়া জটিলতার অবসান ঘটিয়ে বহু প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় বেতন স্কেল চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি হয়েছে। দীর্ঘ আলোচনার পর গতকাল সোমবার মন্ত্রীদের নিয়ে গঠিত কমিটি বিচার বিভাগীয় পে-কমিশনের প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেছে। একই সঙ্গে নবম জাতীয় বেতন স্কেল নিয়ে গঠিত সচিব কমিটির সব সদস্যও চূড়ান্ত প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করেছেন। এর ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো এবং বিচার বিভাগের বেতন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তও অনেকটাই চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রশাসন ক্যাডারসহ অন্যান্য বিভাগের পে-কমিশনের প্রতিবেদন চূড়ান্ত হলেও বিচার বিভাগের প্রতিবেদন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। সচিব কমিটির প্রতিবেদন গ্রহণ না করে বিচার বিভাগ মন্ত্রীদের নিয়ে পৃথক কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেয়। পরে সেই প্রস্তাবের ভিত্তিতে কমিটি গঠন করা হয়। গতকাল দীর্ঘ আলোচনার পর কমিটি বিচার বিভাগীয় পে-কমিশনের প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে।

নবম জাতীয় বেতন স্কেলের প্রস্তাবে সরকারি চাকরিজীবীদের প্রথম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থাৎ কিছু গ্রেডে বর্তমান মূল বেতনের তুলনায় সর্বোচ্চ দ্বিগুণ পর্যন্ত বেতন নির্ধারণের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে সব গ্রেডে সমান হারে বেতন বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়নি। নতুন বেতন কাঠামো একসঙ্গে পুরোপুরি কার্যকর না করে দুই ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম বছরে মূল বেতন এবং দ্বিতীয় বছরে বাড়িভাড়া ও অন্যান্য ভাতা কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। এতে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ফলে সৃষ্ট অতিরিক্ত আর্থিক চাপ ধাপে ধাপে সামাল দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ করতে গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, অর্থ সচিব, জনপ্রশাসন সচিব, আইন সচিব, প্রতিরক্ষা সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা সচিব, স্বাস্থ্যসেবা সচিব, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার এবং হিসাব মহানিয়ন্ত্রক রয়েছেন। কমিটির সব সদস্য চূড়ান্ত প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করেছেন।

এর আগে ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার ২৩ সদস্যের নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে। প্রায় এক যুগ পর গঠিত এই কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন দেয়। সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন কমিশন বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। এতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ ছিল।

গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, প্রায় ১১ বছর ধরে সরকারি কর্মচারীরা একই বেতন কাঠামোর আওতায় বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। এ সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ অর্থবছরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা এবং পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ মোট ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এখন সচিব কমিটি ও বিচার বিভাগীয় পে-কমিশনের চূড়ান্ত সুপারিশের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।