দীর্ঘদিন ধরে মাদক নেটওয়ার্কের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ৪০৬ জন মাদক ব্যবসায়ী ও তাদের পৃষ্ঠপোষকের বিরুদ্ধে একযোগে অনুসন্ধান শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) মানি লন্ডারিং ইউনিট। পুলিশ সদরদপ্তরের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে এ কার্যক্রম শুরু হয়। অনুসন্ধানের আওতায় অভিযুক্ত ব্যক্তি ও তাদের স্বজনদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ এবং ব্যাংক লেনদেনের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। এ জন্য পৃথকভাবে চারটি সংস্থাকে চিঠি দিয়েছে সিআইডি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, একসঙ্গে মাদক-সংশ্লিষ্ট এত বিপুলসংখ্যক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের ঘটনা দেশে এটাই প্রথম।
তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ীদের ব্যাংকিং লেনদেনের তথ্য পেতে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) চিঠি দিয়েছে সিআইডি। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে চিঠি দিয়ে চাওয়া হয়েছে সম্পদের হিসাব। সংশ্লিষ্ট থানার ওসির কাছে লিখিত পত্র দিয়ে অভিযুক্তদের ব্যাপারে তথ্য দিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া অভিযুক্তদের জাতীয় পরিচয়পত্র চাওয়া হয়েছে নির্বাচন কমিশনের কাছে।
সিআইডির প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোশাররফ হোছাইন বলেন, অনেকের কাছে মাদক ব্যবসা অত্যন্ত লাভজনক হওয়ায় অল্প সময়েই বিপুল অর্থের মালিক হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সিআইডির অগ্রাধিকারগুলোর একটি। তিনি বলেন, সমাজে সংঘটিত অনেক অপরাধের পেছনেই মাদকের ভূমিকা রয়েছে। একটি পরিবারে কেউ মাদকাসক্ত হলে এর ক্ষতিকর প্রভাব পরিবারের সদস্যরাই সবচেয়ে ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারেন। মাদক ব্যবসায়ীদের অবৈধ অর্থ ও সম্পদের উৎস অনুসন্ধান এবং এ-সংক্রান্ত অর্থপাচারের তদন্ত সিআইডির শিডিউলভুক্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এ বিষয়ে সংস্থাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছে। নতুন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মাধ্যমে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আরও কার্যকর ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
কয়েক যুগ ধরেই মাদক দেশের অন্যতম প্রধান সামাজিক সমস্যা। এটি অন্যতম জাতীয় সমস্যা হিসেবেও চিহ্নিত। সর্বশেষ ১৩ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও মাদক ও জুয়াকে দেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে এগুলো নির্মূলে কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। একাধিক সংসদ সদস্য নিজ নিজ এলাকায় মাদক সমস্যার ভয়াবহ চিত্রের তথ্য তুলে ধরে সংসদ অধিবেশনে বক্তব্য দেন।
সিআইডি চারশর বেশি মাদক ব্যবসায়ী ও পৃষ্ঠপোষকের বিরুদ্ধে যে অনুসন্ধান শুরু করেছে, সেই তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এদের সবার নেটওয়ার্ক ঢাকাকেন্দ্রিক। সবার বিরুদ্ধে অন্তত চারটি মামলা আছে। কারও কারও বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা ২০ থেকে ৪৭। এ তালিকায় নারী মাদক ব্যবসায়ীও রয়েছেন। সিআইডির চিঠির জবাবে এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ীর ব্যাপারে ওসিদের পক্ষ থেকে তথ্য দেওয়া হয়েছে। এসব তথ্য এখন যাচাই করে দেখা হচ্ছে।
তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি মামলা রয়েছে ভাটারার রাজু আহমেদের বিরুদ্ধে—মোট ৪৭টি। এরপর ভাসানটেকের মো. রূপচানের বিরুদ্ধে রয়েছে ৪৩টি মামলা। শাহজাহানপুরের মো. সোহেলের বিরুদ্ধে মতিঝিল ও শাহজাহানপুর থানায় ২৭টি মামলা হয়েছে। ২০১৭ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত নয় বছরে এসব মামলা করা হয়। বর্তমানে পলাতক সোহেল এলাকায় ‘কানা সোহেল’ নামে পরিচিত। এছাড়া খিলগাঁওয়ের পূর্ব গোড়ানের বাসিন্দা মো. খালেদ মিয়ার বিরুদ্ধে রয়েছে ২১টি মামলা। ২০১৬ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে এসব মামলা হয়েছে। সর্বশেষ গত ১১ মার্চ খিলগাঁও থানায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। অন্যদিকে, খিলগাঁওয়ের ত্রিমোহনী এলাকার মাদক ব্যবসায়ী মাইন উদ্দিনের বিরুদ্ধে রয়েছে ১৪টি মামলা। গত আট বছরে এসব মামলা হয়েছে, যার সর্বশেষটি করা হয় গত ৯ জানুয়ারি।
তালিকায় থাকা রাজধানীর মুগদা এলাকার মাদক ব্যবসায়ী মো. লালনের বিরুদ্ধে মামলা আছে ২২টি। তাঁর গ্রামের বাড়ি ভোলার ইলিশায়। বর্তমানে তিনি পলাতক। সর্বশেষ ৩ জুন পল্টন থানায় লালনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়েছে। এ ছাড়া সবুজবাগের উত্তর বাসাবোর বাসিন্দা মো. নুরুন্নবীর বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা রয়েছে। তাঁর গ্রামের বাড়ি বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জের দাতপুরে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বর্তমানে নুরুন্নবী তাঁর পাশের একটি জেলায় আত্মগোপনে আছেন। তিনি সবুজবাগে ‘টেস্টি বাবু’ হিসেবে পরিচিত। সবুজবাগের আরেক বড় মাদক ব্যবসায়ী হলেন মো. শামীম। রমনা, সবুজবাগ, ওয়ারী, মুগদা, খিলগাঁও থানায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা আছে ১৬টি। জামিন পেয়ে বর্তমানে পলাতক শামীম।
বড় মাদক ব্যবসায়ী ও পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সিআইডির অনুসন্ধানের তালিকায় হাজারীবাগের মো. সুমন, আজগর আলী ও ফালান শিকদারের নামও রয়েছে। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ১০টির বেশি মামলা রয়েছে। তালিকায় কামরাঙ্গীরচরের মনির হোসেন, খুরশিদা বেগম খুশি, সিদ্দিক মিয়া ও হাসির নামও রয়েছে। এর মধ্যে সিদ্দিক মিয়ার বিরুদ্ধে ২৪টি মামলা রয়েছে। খুরশিদা ইয়াবা, গাঁজা ও হেরোইন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে নিউমার্কেট ও কামরাঙ্গীরচর থানায় ১৪টি মামলা হয়েছে। কোতোয়ালি এলাকার তালিকায় রয়েছেন মন্টি কুমার নাথ, সাইফুল ইসলাম সাগর, নূরে আলম, ইমরান, অসিত নন্দী, শম্ভুনাথ সুর ও জিতু চন্দ্র দাস। শম্ভুনাথ সুরের বিরুদ্ধে রয়েছে ২০টি মামলা। তাঁর বিরুদ্ধে প্রথম মামলা হয় ২০১২ সালের ৩০ মে কোতোয়ালি থানায়। সর্বশেষ মামলা হয়েছে ২০২২ সালের ২০ ডিসেম্বর একই থানায়। এছাড়া কোতোয়ালির অসিত নন্দীর বিরুদ্ধে ১৯টি মামলা রয়েছে।
চকবাজারের তারা মিয়া ও মো. রতনের বিরুদ্ধেও অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। লালবাগ এলাকার মো. বাবুল, শাকিল ও মো. আসাদের নাম আছে। বংশালের বিল্লাল হোসেন শাওন, শ্যামপুরের দিনার কাজল, মো. শহিদ, মিরপুরের শাহ আলীবাগের মোছা. বকুলী, ভাটারার রুবেল মিয়া, রাজু আহমেদ, খিলক্ষেতের আক্তার হোসেন, বনানীর জিল্লুর রহমান, ভাসানটেকের মো. বাবুল, মোরশেদা বেগম, কাফরুলের মাহবুবুর রহমান, রূপনগরের সালেহা বেগম, বাড্ডার সাতারকুলের হোসনা আক্তার, মোহাম্মদপুরের ভুঁইয়া সোহেল ওরফে বুনিয়া সোহেল, মনু ওরফে গলাকাটা মনু, মো. সারফু আরমান, আনোয়ার হোসেন কাল্লু, সেলিম, আরিফুল ইসলাম, শেরেবাংলা নগরের শুক্কুরের নাম আছে।
তালিকায় আরও রয়েছেন হাজারীবাগের মো. সুমন, নিপা আক্তার, লাকি, আবুল কালাম, মানিক, আসাদ মিয়া, সোনিয়া বেগম, মমিন মিয়া, আজগর আলী, আবদুস সামাদ, বশির, সালমা আক্তার, সজল, কামরাঙ্গীরচরের মনির হোসেন, আরমান, নওয়াব আলী, ইয়াকুব আলী, মোশাররফ হোসেন, টুটুল হোসেন, আবদুর রহমান, রহমত উল্লাহ, মন্টি কুমার নাগ, কোতোয়ালি এলাকার সাইফুল ইসলাম, পারুল রানী, মনির হোসেন, নূরে আলম, ইমরান, সুফিয়া বেগম, রানা কুমার নাগ, মাইনুদ্দিন, মো. আকরাম, মো. আজিম, মো. জীবন, সাজন প্রসাদ, চকবাজারের আরমান হোসেন, তারা মিয়া, মো. শাহিন, রেজাউল, লালবাগের মো. তুহিন, শাওন, স্বপন, রোজিনা আক্তার, মো. শাকিল, মো. মিজান, মামুন মিয়া, মো. আরিফ, মো. জুয়েল, হায়দার হোসেন, রোজিনা বেগম, হোসেন উদ্দিন ও মো. খলিল।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্নীতিগ্রস্ত কিছু সদস্য এবং অসাধু রাজনৈতিক নেতাকর্মীর একটি অংশ মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক মাদক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত এই শক্তিশালী চক্রের বিস্তারও দিন দিন বাড়ছে। মাদকের ভয়াবহতা নিয়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা চললেও তা এখনও যথেষ্ট নয়। শহরাঞ্চল ছাড়িয়ে মাদকের বিস্তার এখন তৃণমূল পর্যায়েও পৌঁছেছে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এর ব্যবহার বাড়ছে। দেশে মাদক প্রবেশের অন্যতম প্রধান পথ হিসেবে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম অঞ্চলকে চিহ্নিত করা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন সীমান্ত দিয়েও দেশে মাদক ঢুকছে। পর্যটননগরী কক্সবাজার দীর্ঘদিন ধরে মাদকের অন্যতম প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মিয়ানমার থেকেও প্রতিদিন ইয়াবা প্রবেশ করছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে মাদক সেবন, ব্যবসা ও পাচারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশে পরিণত হয়েছে।
অনুসন্ধানের তালিকায় থাকা চারজনের মোবাইল ফোনে কল করেও তাদের পাওয়া যায়নি। কামরাঙ্গীরচরের তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী খুরশিদা বেগমের তিনটি ফোন নম্বর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে দুটি বন্ধ। একটি নম্বরে কল দিলে একজন রিসিভ করে দাবি করেন, তিনি খুরশিদা নামে কাউকে চেনেন না। পুলিশ সদরদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, গত মাসে সারাদেশে মাদকদ্রব্য উদ্ধারজনিত মামলা হয়েছে ছয় হাজার ৩৮৩টি। খুন, ডাকাতি, চুরি, ছিনতাই, নারী-শিশু নির্যাতন, অপহরণসহ সব ধরনের অপরাধে জুলাইয়ে মামলা হয়েছে ১৭ হাজার ৯১১টি। এ হিসাবে জুলাই মাসের মোট মামলার ৩৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ মাদক-সংক্রান্ত।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে সারাদেশে বিভিন্ন অপরাধে মোট ১৫ হাজার ৩৮৯টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে মাদক-সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা ৪ হাজার ৬৫৮টি, যা মোট মামলার প্রায় ৩০ শতাংশ। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত সংস্থাটি প্রায় ৩ কোটি ৬১ লাখ ইয়াবা, ২৫০ কেজি হেরোইন, ২২ কেজি কোকেন, ৮ কেজি আফিম, ৮২ হাজার ২৭৫ কেজি গাঁজা এবং ৫ লাখ ৫১ হাজার ৭৮৮ বোতল ফেনসিডিল জব্দ করেছে।
