দেশের বাজারে জিলেটের সব নকল পণ্য!

কোম্পানি চলে গেছে ২ বছর আগে

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ থেকে কার্যক্রম গুটিয়ে নেয় বিশ্বের অন্যতম ফাস্ট-মুভিং কনজ্যুমার গুডস (এফএমসিজি) কোম্পানি প্রক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বল। এর ফলে দেশে তাদের জিলেট ব্লেড ও রেজার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। তবে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও বাজারে এখনো জিলেট পণ্যের ছড়াছড়ি দেখা যাচ্ছে। দেশীয় ব্লেড উৎপাদকেরা বলছেন, এসব পণ্য মূলত চোরাই পথে প্রতিবেশী দেশ থেকে আসছে। এতে একদিকে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন স্থানীয় উৎপাদনকারীরা।

সাম্প্রতিক কিছু অভিযানে অবৈধভাবে আসা ব্লেড ধরা পড়েছে। ২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর বেনাপোল স্থলবন্দরে স্টিল আমদানির ভুয়া ঘোষণায় আনা কোটি টাকা মূল্যের ১১ লাখ পিস শেভিং ব্লেড উদ্ধার করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। এর আগে ওই বছরের ২৭ আগস্ট সিলেটের সীমান্ত এলাকায় বিজিবি ৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকার অবৈধ পণ্য জব্দ করে, যেখানে জিলেট রেজার ও শেভিং ব্লেড উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এলাকার ছোটখাটো মুদি ও স্টেশনারি দোকানগুলোতে জিলেট ব্র্যান্ডের বিভিন্ন ব্লেড পাওয়া যাচ্ছে, যেগুলোতে আমদানিকারকের স্টিকার নেই।

এসব ব্লেড দোকানে কীভাবে এসেছে জানতে চাইলে মুগদার তাকওয়া ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের মালিক সাইদুর রহমান বলেন, বিভিন্ন ব্যক্তি ভ্যান বা সাইকেলে করে নানা পণ্য নিয়ে এসে সরবরাহ করেন। তাঁদের কাছ থেকেই তিনি জিলেট ব্লেড সংগ্রহ করেছেন। তবে ঠিক কোন কোম্পানির মাধ্যমে এসব এসেছে, তা তিনি নিশ্চিত করে বলতে পারেননি। ব্লেডগুলো আসল না নকল—এ বিষয়েও তিনি নিশ্চিত নন। শুধু মুগদা নয়, নগরীর যাত্রাবাড়ী, খিলগাঁও, রামপুরা, মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও ধানমন্ডির বিভিন্ন মুদি দোকান ও ডিপার্টমেন্টাল স্টোরেও জিলেট ব্লেড ও রেজার পাওয়া যাচ্ছে। মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের মুদি দোকানি মো. সুমনও তার দোকানে থাকা এসব ব্লেডের আসল-নকল সম্পর্কে নিশ্চিত নন। তিনি জানান, কোনো বড় কোম্পানির পরিবর্তে খুচরা পণ্য সরবরাহকারী এক ব্যক্তির কাছ থেকেই তিনি এগুলো সংগ্রহ করেন। তার দোকানে নিয়মিত ক্রেতারা এসব ব্লেড কিনে থাকেন।

রাজধানীর বিভিন্ন সুপার শপেও জিলেট ব্লেড পাওয়া যাচ্ছে। তবে এসব ব্লেডে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের স্টিকার আছে। খিলগাঁওয়ের স্বপ্ন সুপার শপে গিয়ে এম আর ট্রেডার্সের আমদানি করা এবং ক্যানবেরা লিমিটেডের বাজারজাতকারী কিছু জিলেটের রেজার পাওয়া গেছে। এ রকম কিছু কোম্পানির ব্লেড ও রেজার মীনা বাজার ও আগোরাতেও পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, ব্লেডগুলো আমদানি করা কোম্পানিদের কাছ থেকে তারা নিয়েছেন এবং এগুলো অবৈধভাবে আনা বা নকল কোনো পণ্য নয় বলেও তারা উল্লেখ করেন।

স্বপ্ন সুপারশপের ক্যাটাগরি কর্মকর্তা মিরন হোসেন বলেন, ‘২০২৪ সালের ডিসেম্বরে জিলেট দেশের বাজার থেকে তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিলেও আগের অনেক প্রোডাক্টই অনেকের স্টকে ছিল। যেখান থেকে অনেকেই পণ্য বাজারজাত করছে। আবার জিলেটের ব্যবসা এখনও আন্তর্জাতিকভাবে ঠিকই চলছে। সেখান থেকেও দেশের অনেক আমদানিকারক ব্লেড ও রেজার এনে বর্তমানে বাজারে বিক্রি করছে। মূলত সেখান থেকে নিয়েই আমরা (স্বপ্ন) আমাদের শোরুমে জিলেট ব্লেড ও রেজার ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করছি।’

পাড়ায়-মহল্লায় মুদির দোকানে জিলেট ব্লেডের ছড়াছড়িতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাচ্ছে দেশীয় ব্লেড উৎপাদকেরা। দেশীয় ব্লেড কোম্পানিগুলো সরকারকে শুল্ক দিয়ে বাজারে টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করেছেন। শার্প ব্লেড কোম্পানির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করা শর্তে জানান, জিলেটের আসল পণ্য না থাকায় দেশীয় কোম্পানিগুলোর ক্ষতি হচ্ছে এবং অনেকে কর্মসংস্থান হারানো পাশাপাশি ডিলাররা লোকসান গুনছেন। এতে করে অনেক উদ্যোক্তা নিজেদের ব্যবসা থেকে গুটিয়ে নিচ্ছেন বলেও তিনি অভিমত দেন।

ব্লেড উৎপাদনকারী দেশীয় কোম্পানি ম্যাটাডোরে সেলস ম্যানেজার মো. মোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘জিলেট বাংলাদেশ থেকে চলে গেলেও অবৈধভাবে প্রচুর ব্লেড বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। এগুলো দেশে আমদানির কোনো রকম শুল্ক ছাড়াই বাজারে আসছে। আবার এই ব্র্যান্ডের নকল ব্লেড ও রেজারও বাজারে সয়লাব। শুল্ক ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে আসায় এসব ব্লেডের দাম কম। তিনি বলেন, ‘বৈধভাবে আসলে যে ব্লেডের দাম ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা পড়ে, সেই ব্লেড অবৈধভাবে আসায় ক্রেতারা ৩০০ থেকে ৩২০ টাকায় কিনতে পারছেন। একই দাম হওয়ায় দেশীয় ব্লেডগুলো ক্রেতারা কিনছেন না। এতে করে আমাদের ব্লেডের ওপর থেকে ক্রেতারা দিন দিন আগ্রহ হারাচ্ছেন। বৈধভাবে ব্লেডগুলো বাজারে এলে দেখা গেছে সেগুলোর দাম বেশি পড়তো এবং দেশীয় ব্লেড কেনায় ক্রেতারা দামের সঙ্গে মিলিয়ে আমাদেরটা কেনায় আগ্রহ তৈরি হতো।’

বাজারে বর্তমানে দেশি ব্র্যান্ডের ব্লেডের মধ্যে রয়েছে সোর্ড, বলাকা, শার্প, ক্লিপটন, চ্যাম্পিয়ন, অ্যাডেরো, ম্যাটাডোর, বিদ্যুৎ ইত্যাদি। অন্যদিকে রেজারের মধ্যে আছে অ্যাডোরো ও ম্যাটাডোর। এছাড়া আমদানি করা বিদেশি কোম্পানির ব্লেডের মধ্যে রয়েছে রাইজ, সুপার ম্যাক্স, জিলেট, ট্রিট ইত্যাদি। আর রেজারের মধ্যে আছে বন্ড, জিলেট, সুপারম্যাক্স, ট্রিট, শিক। ভারতীয় কোম্পানি বিদ্যুৎ ব্লেডও এ দেশে কারখানা স্থাপন করে যৌথভাবে বিদ্যুৎ ব্র্যান্ডের ব্লেড তৈরি করছে।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশন (বিএসইসি) সূত্রে জানা গেছে, দেশে বছরে ব্লেডের চাহিদা ১৬০ কোটিরও বেশি। কিন্তু দেশীয় চারটি কারখানায় মিলিয়ে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৭৫ থেকে ৮৫ কোটি পিস। বাংলাদেশ ব্লেড ফ্যাক্টরি লিমিটেডের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর ১ হাজার কোটি টাকার বেশি মূল্যের ব্লেড ও রেজার বিক্রি হয়। এর মধ্যে দেশীয় কোম্পানিগুলো মোট চাহিদার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পূরণ করতে পারলেও বাকি ৪০ শতাংশের বেশি আসে আমদানির মাধ্যমে। এই ঘাটতিকে কাজে লাগিয়ে চোরাইকারবারীরা অবৈধভাবে পণ্য বাজারে ঢোকাচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবেও নকল পণ্য তৈরি করে বাজারজাত করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্লেড ফ্যাক্টরি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) সা এম জিয়াউল হক জানান, জিলেট ব্যবসা গুটিয়ে চলে যাওয়ার পরও এই ব্র্যান্ডের ব্লেড দেশের বাজারে কীভাবে এখনও রয়েছে এই তথ্য তার কাছে নেই। এমনকি এই বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির কাছে কোনো ডেটা নেই বলেও তিনি জানান। তবে নিজেরা আধুনিক মানের ব্লেড উৎপাদনে নতুন প্রকল্প নিয়ে এগোচ্ছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

** প্রক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বল বাংলাদেশে ব্যবসা বন্ধ করছে