দেশে কনটেইনার আমদানি ও রপ্তানির মধ্যে ব্যবধান বাড়তে থাকায় ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো (আইসিডি)গুলোতে খালি কনটেইনারের চাপ বাড়ছে। ফলে রপ্তানি পণ্য রাখার জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় নীতিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ)। সিপিএ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে প্রস্তাব দিয়েছে, যাতে শিপিং এজেন্ট ও মেইনলাইন অপারেটররা (এমএলও) বন্ডেড ওয়্যারহাউস লাইসেন্স ছাড়াই নির্ধারিত নন-বন্ডেড স্থানে খালি কনটেইনার সংরক্ষণ করতে পারে। বন্দর কর্তৃপক্ষের মতে, বর্তমান বিধিনিষেধের কারণে বন্দর ও বেসরকারি ডিপো—উভয় ক্ষেত্রেই কনটেইনার জট আরও তীব্র হচ্ছে। ২৬ জুলাই পাঠানো এক চিঠিতে সিপিএ তাদের আগের একটি প্রস্তাব পুনরায় উত্থাপন করেছে, যা ২০২৫ সালের অক্টোবরে জমা দেওয়া হলেও এখনও অনুমোদন পায়নি।
আমদানি-রপ্তানির ব্যবধানে রেকর্ড
সিপিএর তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে আমদানি ও রপ্তানি কনটেইনারের ব্যবধান প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে এই ব্যবধান ছিল ১ লাখ ৭৭ হাজার ৮৩২ টিইইউএস (টুয়েন্টি ফুট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট))। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে রেকর্ড ৩ লাখ ২৯ হাজার ৯৯৬ টিইইউএসে দাঁড়িয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে ১৭ লাখ ২০ হাজার টিইইউএস কনটেইনার আমদানি ও ১৫ লাখ ৪০ হাজার টিইইউএস রপ্তানি হয়। ব্যবধান ছিল ১ লাখ ৭৭ হাজার ৮৩২ টিইইউএস। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আমদানি কিছুটা কমে ১৬ লাখ ২০ হাজার ও রপ্তানি কমে ১৩ লাখ ৮০ হাজার টিইইউএস হয়। তারপরও এই ব্যবধান বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৩৭ হাজার ৬০৯ টিইইউএসে।
২০২৩–২৪ অর্থবছরে আমদানি বেড়ে ১৭ লাখ ২০ হাজার টিইইউএসে পৌঁছালেও রপ্তানি ছিল ১৪ লাখ ৫০ হাজার টিইইউএস, ফলে কনটেইনারের ভারসাম্যহীনতা দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৮ হাজার ৫০০ টিইইউএসে। পরবর্তী ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ব্যবধান সামান্য কমে ২ লাখ ৭৬ হাজার ৩৫৭ টিইইউএস হলেও আমদানি (১৭ লাখ ৯০ হাজার টিইইউএস) রপ্তানির (১৫ লাখ ১০ হাজার টিইইউএস) চেয়ে বেশি ছিল। সর্বশেষ ২০২৫–২৬ অর্থবছরে আমদানি বেড়ে ১৯ লাখ ৩০ হাজার টিইইউএস এবং রপ্তানি ১৬ লাখ টিইইউএসে উন্নীত হয়। খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, দেশের ২৪টি বেসরকারি আইসিডির মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার টিইইউএস, যার মধ্যে বর্তমানে ৫৬ হাজার ৫৬৫ টিইইউএস খালি কনটেইনার পড়ে আছে। বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশন (বিকডা)-এর মহাসচিব রুহুল আমিন শিকদার বলেন, সরকারি পরিসংখ্যানে পণ্যভর্তি ও খালি উভয় ধরনের কনটেইনারের হিসাব থাকায় বাস্তব বাণিজ্য ঘাটতি আরও বেশি; তার মতে, দেশের প্রকৃত রপ্তানি আমদানির প্রায় অর্ধেকের সমান।
রুহুল আমিন আরও বলেন, ‘জাহাজ আসা-যাওয়ার সময় পণ্যবোঝাই ও খালি—সব কনটেইনারই বন্দরের পরিসংখ্যানে হিসাব করা হয়। ফলে প্রকাশিত এই পরিসংখ্যানে রপ্তানি পণ্যের প্রকৃত পরিমাণ উঠে আসে না।’২০২৩ পঞ্জিকাবর্ষের বিস্তারিত তথ্য অনুসাড়ে, ওই বছর ৯৪ হাজার ৯১৫টি খালি কনটেইনারসহ মোট ১৩ লাখ ৩৭ হাজার ৬১৩ টিইইউএস কনটেইনার আমদানি করেছে বন্দর। একই সময়ে মোট রপ্তানি হয়েছে ১৩ লাখ ১৫ হাজার ৩৩৭ টিইইউএস কনটেইনার। তবে এর মধ্যে বিদেশে পাঠানো ৫ লাখ ৮৪ হাজার ৮৯১ টিইইউএস কনটেইনারই খালি ছিল।
খালি কনটেইনারের হিসাব বাদ দিলে, পণ্যভর্তি কনটেইনার আমদানির পরিমাণ ছিল ১২ লাখ ৪২ হাজার ৬৯৮ টিইইউএস। বিপরীতে পণ্যভর্তি কনটেইনার রপ্তানির পরিমাণ ছিল মাত্র ৭ লাখ ৩০ হাজার ৪৪৬ টিইইউএস। ফলে কনটেইনারভিত্তিক বাণিজ্যে প্রকৃত ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ লাখ ১২ হাজার ২৫২ টিইইউএস। তিনি বলেন, অলস পড়ে থাকা কনটেইনারের স্তূপ বাড়তে থাকায় রপ্তানি পণ্যের জন্য জায়গার সংকট দেখা দিচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘শিপিং লাইনগুলোকে যদি নন-বন্ডেড স্থানে খালি কনটেইনার রাখার অনুমতি দেওয়া হয়, তাহলে আইসিডি অপারেটর ও শিপিং লাইন উভয়ই বেশ স্বস্তি পাবে।’
নীতিমালায় পরিবর্তনের আহ্বান বন্দরের
এনবিআরকে দেওয়া চিঠিতে সিপিএ বলেছে, আমদানি করা সব লেস-দ্যান-কনটেইনার-লোড (এলসিএল) কার্গো বন্দরের খালাস করা হয়। এছাড়া ফুল কনটেইনার লোড (এফসিএল) আমদানির প্রায় ৭০ শতাংশ পণ্য খালাসের জন্য বন্দরের ভেতরেই খোলা হয়। আমদানিকারকরা তাদের পণ্য নিয়ে যাওয়াত প্রতিদিন কয়েক হাজার কনটেইনার খালি হয়। কিন্তু প্রতিদিন যে হারে কনটেইনার খালি হয়, সেই তুলনায় সেগুলো সরিয়ে নেওয়ার গতি অনেক ধীর। ফলে বন্দর ও বেসরকারি ডিপো দুই জায়গাতেই খালি কনটেইনারের স্তূপ বেড়েই চলেছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষ বলেছে, শিপিং এজেন্ট ও এমএলওগুলো এসব কনটেইনারের জন্য দায়বদ্ধ। তবে এনবিআরের বর্তমান নিয়মের কারণে তারা বন্ডেড স্থাপনার বাইরে খালি কনটেইনার রাখতে পারে না। সিপিএ আরও জানায়, বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশগুলোসহ বিশ্বের অনেক দেশেই শিপিং লাইনগুলোকে বন্ডেড ওয়্যারহাউসের লাইসেন্স ছাড়াই উপযুক্ত স্থানে খালি কনটেইনার রাখার অনুমতি দেওয়া হয়। বাংলাদেশেও একই ধরনের ব্যবস্থা চালু করা হলে ইয়ার্ডের ব্যবহার আরও কার্যকর হবে, কনটেইনার জট কমবে ও কনটেইনার ব্যবস্থাপনায় গতি আসবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
খালি কনটেইনার সরাতে বাণিজ্যিক অনাগ্রহ
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহসভাপতি এবং বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, খালি কনটেইনারের তুলনায় পণ্যভর্তি আমদানি-রপ্তানি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে ডিপো অপারেটররা বেশি আয় করেন। একই সঙ্গে খালি কনটেইনার পরিবহনেও শিপিং লাইনগুলোর লোকসান হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, একটি পণ্যভর্তি কনটেইনার থেকে প্রায় ৩০০ ডলার ফ্রেইট চার্জ পাওয়া গেলেও সমপরিমাণ জায়গা দখল ও সমান হ্যান্ডলিং খরচ সত্ত্বেও খালি কনটেইনার থেকে আয় হয় মাত্র প্রায় ১০০ ডলার। এ কারণে শিপিং লাইনগুলো অনেক সময় খালি কনটেইনার সরিয়ে নিতে বিলম্ব করে, ফলে সেগুলো দীর্ঘদিন দেশে পড়ে থাকে এবং এতে সার্বিক লজিস্টিকস ব্যবস্থায় জট আরও বেড়ে যায়।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধান প্রয়োজন
খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, খালি কনটেইনারের ক্রমবর্ধমান স্তূপ শুধু জায়গা সংকট নয়, বরং দেশের কাঠামোগত বাণিজ্য ঘাটতিরই প্রতিফলন। তারা নন-বন্ডেড স্থানে কনটেইনার সংরক্ষণের অনুমতি দেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে এই ঘাটতি কমাতে রপ্তানি বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। একই সঙ্গে খালি কনটেইনার স্থানান্তরসংক্রান্ত তথ্যব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সিপিএ, কাস্টমস, এনবিআর, শিপিং লাইন ও ডিপো অপারেটরদের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের পরামর্শ দেন। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, এসব পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে কনটেইনারের চাপ আরও বাড়বে এবং বন্দরসহ দেশের সামগ্রিক লজিস্টিকস ব্যবস্থার ওপর চাপ তীব্রতর হবে।
