ব্যাংকের লভ্যাংশ বিতরণে এবারও কঠোর নীতি বজায় রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে ২০২৫ সালের জন্য যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দুই অঙ্কের ঘরে রয়েছে, তাদের কোনো লভ্যাংশ দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতিতে থাকা কয়েকটি ব্যাংকও এ বছর লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারেনি। এর ফলে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩৬টি ব্যাংকের মধ্যে মাত্র ১৬টি ব্যাংক লভ্যাংশ দিতে সক্ষম হয়েছে। আর দেশের মোট ৫২টি ব্যাংকের মধ্যে লভ্যাংশ দিতে পেরেছে মাত্র ১৮টি ব্যাংক।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দুরবস্থাগ্রস্ত ব্যাংক খাতের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে গত বছরের ১৩ মার্চ শেয়ারের বিপরীতে লভ্যাংশ ঘোষণার বিষয়ে একটি নীতিমালা জারি করা হয়। ওই নীতিমালায় বলা হয়, কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশ বা তার বেশি হলে সে ব্যাংক লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারবে না। বর্তমানে ২৯টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ২৯ শতাংশের ওপরে, যার মধ্যে ১৭টি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত। পাশাপাশি যেসব ব্যাংকের মূলধন বা প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে, তাদেরও লভ্যাংশ দেওয়ার সুযোগ নেই। এমনকি আগে যেসব ব্যাংক প্রভিশন সংরক্ষণে অতিরিক্ত সময় পেয়েছিল, তারাও এবার লভ্যাংশ দিতে পারেনি। গভর্নর পদে পরিবর্তনের পর এই কঠোর নীতি অব্যাহত থাকবে কি না—তা নিয়ে কিছু আলোচনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর নীতিই অনুসরণ করেছে।
এছাড়া মূলধন ভিত্তি শক্তিশালী এবং রেকর্ড মুনাফা অর্জনকারী ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ লভ্যাংশ প্রদানের সীমা নির্ধারণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো ব্যাংকই পরিশোধিত মূলধনের ৩০ শতাংশ বা নিট মুনাফার ৫০ শতাংশের বেশি লভ্যাংশ বিতরণ করতে পারবে না। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোকে পরবর্তী বছরের ৩০ এপ্রিলের মধ্যে তাদের আর্থিক বিবরণী চূড়ান্ত করতে হয়। ২০২৫ সালের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার শেষ দিন ছিল গতকাল। শেষ দিনে একীভূত হওয়া দুর্বল পাঁচটি ব্যাংকে আটকে থাকা বিভিন্ন ব্যাংকের অর্থের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা থেকেও ছাড় দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত বছর কঠোর নীতির কারণে নির্ধারিত সময়ে অধিকাংশ ব্যাংক আর্থিক বিবরণী চূড়ান্ত করতে পারেনি, ফলে সময়সীমা এক মাস বাড়ানো হয়েছিল। তবে এবার নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সব ব্যাংক তাদের আর্থিক বিবরণী চূড়ান্ত করেছে।
লভ্যাংশ দিয়েছে যেসব ব্যাংক
ব্যাংক খাতের নানা সংকটের মধ্যেও বেসরকারি খাতের ৬টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এবার সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ অনুমোদন করেছে। নগদ ও স্টক মিলে এ লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়। এ তালিকায় রয়েছে–ব্র্যাক, সিটি, পূবালী, ডাচ্-বাংলা, প্রাইম ও উত্তরা ব্যাংক। লভ্যাংশ বিতরণে পরের অবস্থানে থাকা যমুনা ব্যাংক দিয়েছে ২৯ শতাংশ। এর পরে রয়েছে যথাক্রমে ইস্টার্ন ব্যাংক ২৮ শতাংশ, এনসিসি ২৫, ব্যাংক এশিয়া ১৭, শাহ্জালাল ইসলামী ১৩, ট্রাস্ট ব্যাংক ১৩, এমটিবি ১২, সাউথইস্ট ব্যাংক ১০, ঢাকা ১০ এবং মিডল্যান্ড ৬ শতাংশ। পুঁজিবাজারে তালিকভুক্ত এসব ব্যাংকের বাইরে এবার কমিউনিটি ব্যাংক ও বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিয়েছে।
লভ্যাংশ দিতে পারেনি যেসব ব্যাংক
বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে লভ্যাংশ দিতে না পারার তালিকায় রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, যা একসময় ‘এ’ ক্যাটাগরিতে থাকলেও এবার ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নেমে এসেছে। একই তালিকায় রয়েছে আইএফআইসি, স্ট্যান্ডার্ড, ইউসিবি, মার্কেন্টাইল, এবি, আল-আরাফাহ ইসলামী, আইসিবি ইসলামিক, ন্যাশনাল, এনআরবি, এনআরবিসি, ওয়ান, প্রিমিয়ার এবং সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক। এছাড়া একীভূত হওয়ার কারণে পুঁজিবাজার থেকে তালিকাচ্যুত এক্সিম, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, সোশ্যাল ইসলামী, ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকও এ তালিকায় রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব ব্যাংককে একীভূত করে অকার্যকর ঘোষণা করলেও বিদেশি ব্যাংকের সঙ্গে ‘নস্ট্রো’ অ্যাকাউন্ট পরিচালনার সুবিধার কারণে এখনো তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হয়নি। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয় এমন ব্যাংকের মধ্যে বাংলাদেশ কমার্স, মেঘনা, মধুমতি, পদ্মা ও সীমান্ত ব্যাংকও লভ্যাংশ দিতে পারেনি। নিট মুনাফা করলেও সিটিজেনস ব্যাংক এবার লভ্যাংশ বিতরণ করেনি। অন্যদিকে সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে রূপালী, সোনালী, জনতা, অগ্রণী, বিডিবিএল, বেসিক, বিকেবি, রাকাব এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকও সরকারের কাছে লভ্যাংশ দিতে সক্ষম হয়নি।
