কক্সবাজারে বৈরী আবহাওয়া ও বৃষ্টিপাতের কারণে নির্ধারিত সময়ের প্রায় ১৫ দিন আগেই চলতি মৌসুমের লবণ উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। চাষিরা জানিয়েছেন, উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারদর কম থাকায় লক্ষ্যমাত্রা পূরণের আগেই তারা উৎপাদন কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন। এতে লবণচাষ ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত অন্তত ৫০ হাজার মানুষ চরম সংকটে পড়েছেন।
বৃহস্পতিবার দুপুরে কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীর হোয়ানক ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায়, বঙ্গোপসাগর ঘেঁষে বিস্তৃত কয়েকশ একরের লবণ মাঠে সাদা লবণের স্তূপ। বিশাল এ মাঠে হাতেগোনা কয়েকজন শ্রমিক লবণ সংগ্রহে কাজ করছেন। কোথাও কোথাও কালো পলিথিন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। শ্রমিকরা জানান, বৃষ্টির কারণে লবণ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় মাটি খুঁড়ে নিচে লবণ সংরক্ষণ করা হচ্ছে এবং কিছু অংশ গুদামে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ওই এলাকার চাষি নুরুল কবির বলেন, একবার বৃষ্টি হলে টানা ৭ থেকে ৯ দিন লবণ উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়। বৃষ্টিপাত না হলে তারা আরও বেশি লবণ উৎপাদন করতে পারতেন।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) দেওয়া তথ্যমতে, দেশে লবণের চাহিদা ২৭ লাখ ৩৫ হাজার টন। চলতি মৌসুমে (১৫ নভেম্বর থেকে ১৫ মে পর্যন্ত) কক্সবাজার সদর, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, পেকুয়া, চকরিয়া, ঈদগাঁও, টেকনাফ ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় ৬৮ হাজার ৫০৫ একর জমিতে লবণ উৎপাদন হয়েছে। ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত লবণ উৎপাদিত হয়েছে ১৪ লাখ ৫০ হাজার টন। গত মৌসুমে একই সময়ে যা ছিল ১৮ লাখ ২২ হাজার ১৬২ টন। চলতি মৌসুমে লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২৮ লাখ ১০ হাজার টন। কর্মকর্তারা তা অর্জিত হবে কিনা, তা নিয়ে শঙ্কিত।
মহেশখালীর হোয়ানক ইউনিয়নের কালালিয়া কাটা এলাকার বড় লবণচাষি নুরুল কবির প্রায় ৮০ একর জমিতে লবণ উৎপাদন করেন। তিনি জানান, প্রতি একর জমিতে তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় দেড় লাখ টাকা, আর প্রতি একরে উৎপাদন হয়েছে ২৫০ মণ লবণ। প্রতি মণ ২৬০ টাকা দরে বিক্রি করে আয় হয়েছে মাত্র ৬৫ হাজার টাকা, ফলে পুরো জমিতে তাঁর প্রায় ৭০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। নুরুল কবিরের ভাষ্য, মৌসুমের শুরুতে লবণের দাম ছিল মণপ্রতি ২০০ টাকা, যা শেষ সময়ে বেড়ে ৩০০ টাকায় পৌঁছালেও অকাল বৃষ্টিতে সব সম্ভাব্য লাভ নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি মনে করেন, আগামী ১৫-২০ দিন আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং দাম বাড়লে কিছুটা হলেও ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
কয়েক দিনের বৃষ্টিতে হারিয়ারঘোনার চাষি আনচার উল্লাহর ঘেরের ২৫০ মণ লবণ ভেসে গেছে। এর পর থেকে তিনি লবণ উৎপাদন বন্ধ করে দেন। আনচার উল্লাহ বললেন, এপ্রিল মাসে আরও ঝড়বৃষ্টি হবে, সেই আশঙ্কায় তিনি মাঠ সংস্কার করছেন না। একই পরিস্থিতির কথা জানান কুতুবজোমের চাষি নবাব মিয়াও। তিনি বলেন, মৌসুমের শুরুতে (নভেম্বর-ডিসেম্বর) ঘন কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহ ছিল। এ কারণে লবণ চাষিদের মাঠে নামতে ২০-২৫ দিন দেরি হয়েছে। এখন আবার বৈরী আবহাওয়ার কারণে ১৫-২০ দিন আগেই মাঠ ছাড়তে হচ্ছে। এ কারণে লবণ উৎপাদন এবার অর্ধেকে নেমে এসেছে। অধিকাংশ চাষি ঋণ ও দাদনের টাকায় লবণ উৎপাদনে নামেন। উৎপাদন কম হওয়ায় ঋণ পরিশোধ নিয়েই তাদের যত দুশ্চিন্তা।
চকরিয়ার লবণ চাষি গিয়াস উদ্দিনের দেওয়া তথ্যমতে, গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে উপজেলার ৭০০ থেকে ৮০০ একর মাঠে লবণ উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় আগে উৎপাদিত লবণও বিক্রি করা যাচ্ছে না। গিয়াস উদ্দিন বললেন, ‘এক মণ লবণ উৎপাদনে খরচ হয় ৩০০ টাকা, কিন্তু বিক্রি করতে হচ্ছে ২৫০-২৬০ টাকায়। লোকসান দিয়ে আর কত লবণ বিক্রি করব?’ এদিন টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা, রঙিখালী, ঝিমংখালী, খারাংখালী ও মৌলভীবাজার এলাকার বেশির ভাগ লবণ মাঠে উৎপাদন বন্ধ দেখা যায়। রঙিখালীর চাষি নবী হোসেন বলেন, ‘কালবৈশাখী ও বৃষ্টি কারণে তিন-চার দিন ধরে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এরপর ১০-১৫ দিনের জন্য মাঠ সংস্কার করে লাভ নেই।’
অপর চাষি জালাল আহমদ বলেন, আগামী ১৫ মে লবণ উৎপাদনের মৌসুম শেষ। এখন বৃষ্টির যা অবস্থা, লবণের দাম না বাড়লে চাষিরা নতুন করে উৎপাদন শুরুর ঝুঁকি নেবেন না। পরিস্থিতি বিবেচনায় দাম অন্তত মণপ্রতি ৪০০ টাকা হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। লবণ উৎপাদনে জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বিষয়ে শঙ্কিত বিসিক কক্সবাজার লবণ শিল্প উন্নয়ন কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভূঁইয়া। তিনি বলেন, ২৮, ২৯ ও ৩০ এপ্রিলের ভারী বর্ষণে শতভাগ লবণ মাঠ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর পর থেকে লবণ উৎপাদন বন্ধ আছে। বৃষ্টির পানিতে শত শত চাষির লবণ গলে (নষ্ট) গেছে।
জেলায় প্রান্তিক চাষির সংখ্যা প্রায় ৪২ হাজার উল্লেখ করে জাফর ইকবাল ভূঁইয়া আরও বলেন, চলতি মৌসুমে শুরুতেই শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশার কারণে চাষিদের লবণ উৎপাদনে নামতে ২০-২৫ দিন দেরি হয়। উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্যও পাওয়া যাচ্ছে না। মৌসুমের শেষ মুহূর্তে এসে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা দিশা হারিয়ে ফেলছেন।
