হাওরে ফসল তলিয়ে যাওয়ায় সুনামগঞ্জের কৃষকরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। পানিতে নষ্ট হয়ে যাওয়া ধান তুলে নতুন করে বিপাকে পড়ছেন অনেকে—না ফেলতে পারছেন, না শুকাতে পারছেন। সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন বর্গাচাষীরা। চুক্তি অনুযায়ী জমির মালিককে ধান দেওয়া, আবাদে নেওয়া ঋণ শোধ করা এবং সারা বছর পরিবার চালানোর দুশ্চিন্তা একসঙ্গে ভর করেছে তাদের ওপর। হাওরজুড়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলেও কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৫০ হাজার টন ধানের ক্ষতি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) সকালে দেখার হাওরের গুয়াছুড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কনকনে বাতাসের মধ্যেও পানির ভেতর দাঁড়িয়ে ধান কাটছেন শ্রমিকরা। তাদের শরীর মাথা থেকে কোমর পর্যন্ত পলিথিনে মোড়ানো। কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে কৃষক রইছ মিয়ার চোখেমুখে স্পষ্ট দুশ্চিন্তার ছাপ। তিনি শ্রমিকদের দেখিয়ে কোমরসমান পানিতে ভাসমান ধানের ছড়ায় ভরা জমির দিকে ইঙ্গিত করেন। জানান, দেড় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে এবার আবাদ করেছিলেন। এখন তাকে তিনটি বড় চিন্তা ঘিরে ধরেছে—চুক্তি অনুযায়ী জমির মালিককে ধান দেওয়া, আবাদে নেওয়া ঋণ পরিশোধ করা এবং সারা বছর পরিবার নিয়ে টিকে থাকা। আরেক প্রবীণ কৃষক কমর আলী আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘কেমনে চলমু পরিবার লইয়া।’
হাওরে এমন অবস্থায় কৃষি বিভাগ বলছে, বুধবার বিকেল পর্যন্ত ৯ হাজার ৪৯ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতি হয়েছে। এই হিসেবে ৫০ হাজার টন ধানে ক্ষতি ২০০ কোটি টাকারও কম। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, উজানের পানিতে নদীর পানি বেড়েছে। হাওরের এই পানি কমতে এক সপ্তাহ সময় লাগবে। গত চার দিনের বৃষ্টি ও উজান থেকে থেকে আসা ঢলে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের বিভিন্ন হাওরের পাকা ধান ডুবে গেছে। ফলে হাওরজুড়ে কৃষকদের মধ্যে হাহাকার দেখা গেছে।
নলুয়ার হাওরের দাসনোওয়াগাঁও গ্রামের কৃষক সারদা চরন দাস জানান, তিনি ১৬ কেদার জমি আবাদ করেছিলেন। মাত্র এক কেদার জমির ফসল তুলতে পেরেছেন। গত দুই দিনের টানা বৃষ্টিতে সব জমি তলিয়ে গেছে। কৃষি শ্রমিক সংকট থাকায় তিনি অনেক চেষ্টা করেও ফসল ঘরে আনতে পারেননি। তিনি কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার সব শেষ হয়ে গেল। বোরো ফসলের ওপর নির্ভরশীল আমার পরিবার। ধারদেনা করে জমি আবাদ করেছিলাম। এখন সারাবছর কীভাবে চলব?’
সাবেক চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রনধির দাস নান্টুর সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, নলুয়ার হাওরের অধিকাংশ জমির ফসল এখনো কৃষকরা তুলতে পারেননি। শুরুতে জলাবদ্ধতা ও শ্রমিক সংকটের কারণে ধান কাটতে সমস্যায় পড়েন তারা। এরপর গত দুই দিনের টানা বৃষ্টিতে নিম্নাঞ্চলের প্রায় সব জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। তাঁর ধারণা, অন্তত দেড় থেকে দুই হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এদিকে নলুয়ার হাওরের কৃষক এখলাছ মিয়া, মধু মিয়া, গৌরাঙ্গ দাস ও হরিন্দ্র দাস জানান, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় ভারী বৃষ্টিতে তাদের ফসল সম্পূর্ণভাবে ডুবে গেছে। তারা অভিযোগ করেন, হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ এবার কার্যত মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে অতিবৃষ্টির কারণে জগন্নাথপুরের মইয়া ও পিংলার হাওরসহ উপজেলার বিভিন্ন হাওরে আধাপাকা ধানও পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে।
জগন্নাথপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাওসার আহমেদ বলেন, নলুয়ার হাওরের ৫০ ভাগ জমির ধান কাটা শেষ। জলাবদ্ধতা ও শ্রমিক সংকটের কারণে বহু কৃষক ধান তুলতে বেগ পাচ্ছেন। এরই মধ্যে টানা বৃষ্টিতে ফসলের কিছু ক্ষতি করছে। তবে এখনই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বলা যাচ্ছে না। নৌকা দিয়ে ধান তোলার চেষ্টা চলছে। এ বছর জগন্নাথপুর উপজেলায় ২০ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
