অনলাইন গেমিং খাত আসবে করের আওতায়

বাজেট ২০২৬-২৭

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নতুন আয়ের উৎস খুঁজছে সরকার। এর অংশ হিসেবে দ্রুত সম্প্রসারিত অনলাইন গেমিং খাতকে করের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি আন্তর্জাতিক গেমিং প্ল্যাটফর্মে স্কিন, ক্যারেক্টার, ভার্চুয়াল কয়েন ও প্রিমিয়াম সুবিধা কিনতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেন। এ প্রেক্ষাপটে, আগামী অর্থবছর থেকে গেমিং ও ভার্চুয়াল কয়েনসংক্রান্ত সব ধরনের লেনদেনে ১৫ শতাংশ কর আরোপের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ সচিবালয়ে গত সোমবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে এ বিষয়ে একটি প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করা হলে তিনি এতে সম্মতি দেন বলে জানিয়েছেন এনবিআর কর্মকর্তারা। তাদের ভাষ্য, ডিজিটাল অর্থনীতিকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনা, অনলাইন লেনদেনের ওপর নজরদারি জোরদার করা এবং অনিয়ন্ত্রিত প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অর্থ বিদেশে চলে যাওয়া রোধ করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে অনলাইন গেমিং ও ডিজিটাল সেবার ওপর কর আরোপ করেছে। প্রতিবেশী ভারত অনলাইন গেমিংয়ে ২৮ শতাংশ জিএসটি চালু করেছে, পাকিস্তান আরোপ করেছে ডিজিটাল সার্ভিস ট্যাক্স ও ভ্যাট। এছাড়া ইন্দোনেশিয়া ডিজিটাল পণ্যে ১০ শতাংশ ভ্যাট আরোপের পাশাপাশি বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করেছে।

রাজস্ব কর্মকর্তারা জানান, গেমের ভেতরে কেনাকাটা (ইন-অ্যাপ পারচেজ), সাবস্ক্রিপশন ফি, ভার্চুয়াল গেমিং কারেন্সি এবং ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ওপর ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক আরোপের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। বর্তমানে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি ব্যবহারকারী আন্তর্জাতিক গেমিং প্ল্যাটফর্মে স্কিন, ক্যারেক্টার, ভার্চুয়াল কয়েন ও প্রিমিয়াম সুবিধা কিনতে অর্থ ব্যয় করছেন। কিন্তু এসব লেনদেনের অধিকাংশই করের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে। তাদের করজালে আনার চেষ্টা করছে সরকার। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্ট্যাটিসটার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের অনলাইন গেমিং বাজারের আকার বর্তমানে ২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। তবে এই খাতের বড় অংশের লেনদেন এখনো কর ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে। এনবিআর কর্মকর্তাদের ধারণা, এসব লেনদেনকে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে আনা গেলে একদিকে রাজস্ব বাড়বে, অন্যদিকে সীমান্ত পারের ডিজিটাল লেনদেন পর্যবেক্ষণও সহজ হবে। এসব লেনদেনে অন্তত ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ করা হলে এ খাত থেকে রাজস্ব আদায় হবে ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম নিম্ন পর্যায়ে থাকায় আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকেও রাজস্ব বাড়ানোর চাপ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ডিজিটাল খাতকে নতুন কর উৎস হিসেবে দেখছে সরকার। এনবিআরের কর্মকর্তারা বলেন, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ব্যাংক কার্ড ও অ্যাপ স্টোরের মাধ্যমে হওয়া পেমেন্টে স্বয়ংক্রিয় ভ্যাট কর্তনের ব্যবস্থা চালুর বিষয়েও আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করতে চাইলে গেমিং প্ল্যাটফর্মগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনার পরিকল্পনাও বিবেচনায় রয়েছে।

তথ্য অনুসারে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো প্রতিবেশী দেশ ভারতে অনলাইন গেমিংয়ে ২৮ শতাংশ জিএসটি আরোপের ফলে সরকারের রাজস্ব বেড়েছে। অবশ্য এর ফলে গেমিং কোম্পানিগুলোর ব্যয়ও বেড়েছে। এদিকে পাকিস্তান চালু করেছে ডিজিটাল সার্ভিস ট্যাক্স ও ভ্যাট। আর ইন্দোনেশিয়া ডিজিটাল পণ্যে ১০ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করে বিদেশি প্ল্যাটফর্মগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় এনেছে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, স্পষ্ট আইনি কাঠামো ছাড়া এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন কঠিন হবে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, কোন গেম দক্ষতানির্ভর আর কোনটি জুয়া বা বেটিংয়ের আওতায় পড়ে—এটি আগে সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। আইনি সংজ্ঞা পরিষ্কার না হলে কর আরোপ প্রক্রিয়া বিতর্কের মুখে পড়তে পারে। তিনি আরও জানান, দেশের ডিজিটাল ডাটা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এখনো পর্যাপ্ত শক্তিশালী নয়, ফলে টেনসেন্ট বা অ্যাক্টিভিশন ব্লিজার্ডের মতো বিদেশভিত্তিক গেমিং প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কার্যকরভাবে কর আদায় করা কঠিন হতে পারে। এছাড়া অতিরিক্ত কর আরোপ করলে ব্যবহারকারীদের একটি অংশ অবৈধ বা অননুমোদিত বেটিং প্ল্যাটফর্মের দিকে ঝুঁকতে পারে, যা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে যেতে পারে।

নীতিনির্ধারণ বিশ্লেষকদের মতে, শুধু কর আরোপ করলেই হবে না, এই খাতের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালাও প্রয়োজন। তারা বলছেন, গেমিং প্ল্যাটফর্মের বাধ্যতামূলক নিবন্ধন, পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় ভ্যাট কর্তন এবং গেমিং ও জুয়ার মধ্যে পৃথক আইনি কাঠামো তৈরি করা জরুরি। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, সঠিক নীতি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তোলা গেলে অনলাইন গেমিং খাত থেকে বছরে কয়েকশ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব। তবে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও আইনি প্রস্তুতি ছাড়া এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।