** ভ্যাট ফাঁকি থেকে বাঁচতে কভিডের দোহাই, ভুট্টার তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করা চেষ্টা
** ৩১১ কোটি টাকার পণ্য বিক্রি ও ২৩৯ কোটি টাকার কেনাকাটার তথ্য গোপন
** পণ্যের বিক্রি মূল্য নামমাত্র ঘোষণা দিয়ে বেশি দামে বিক্রি করার অভিযোগ
চার বছরে প্রায় ৩১১ কোটি টাকা পণ্য বিক্রির তথ্য গোপন করা হয়েছে। যাতে ফাঁকি দেওয়া হয়েছে ভ্যাট। উৎসে ভ্যাট ফাঁকি দিতে প্রায় ২৩৯ কোটি টাকা কেনাকাটার তথ্য গোপন করা হয়েছে। শুধু ভ্যাট ফাঁকি নয়, অবৈধভাবে নেয়া হয়েছে রেয়াত। তবে ভ্যাট ফাঁকি থেকে বাঁচতে প্রতিষ্ঠান করোনার অজুহাত দেখিয়েছে। শুধু করোনা নয়, ভুট্টার এক আজগুবি তথ্য দিয়ে ভ্যাট কর্মকর্তাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। যদিও প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত পণ্যের সঙ্গে ভুট্টার কোনো সম্পর্ক নেই। বিক্রি তথ্য গোপন ও কেনাকাটার তথ্য গোপন করে প্রায় ৬০ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করেছে আহমেদ উড ক্রাফট প্রাইভেট লিমিটেড নামের নীলফামারী একটি প্রতিষ্ঠান। আহমেদ উড গ্রুপের এই প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট ফাঁকি প্রমাণিত হওয়ায় প্রায় ৯৫ কোটি টাকা সুদ ও জরিমানা করা হয়েছে। সম্প্রতি রংপুর ভ্যাট কমিশনারেট এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভ্যাট ফাঁকি প্রমাণিত হওয়ায় জরিমানা ও সুদ আরোপসহ প্রায় ১৫৫ টাকা আদায়ে চূড়ান্ত দাবিনামা জারি করেছে। এনবিআর সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
সূত্রমতে, আহমেদ উড ক্রাফটস প্রাইভেট লিমিটেড হলো কাঠ ও প্যানেল শিল্প এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সাথে যুক্ত একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি প্লাইউড, এমএফসি বোর্ড, এবং এক্রাইলিক প্যানেল সরবরাহ, কাঠ, ডেকিং ও ফ্লোরিং সামগ্রী তৈরি করে। ঢাকার বিভিন্ন প্রধান বাণিজ্যিক এলাকা ও শোরুমের মাধ্যমে তারা কাঠের প্যানেল সামগ্রী ও ইন্টেরিয়র সলিউশন সরবরাহ করে থাকে। চীন, ইতালি, ভারত এবং তাইওয়ান কাঁচামাল আমদানি করে। এর মধ্যে রয়েছে-পিভিসি রেজিন, এক্রাইলিক পলিমার, মোডিফাইড স্টার্চ আমদানি এবং কাঠ প্রক্রিয়াজাতকরণের রাসায়নিক। প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং জার্মানিতে বিলাসবহুল কাঠের তৈরি পণ্য ও প্যানেল সামগ্রী রপ্তানি করে। এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিক্রির তথ্য গোপন ও কেনাকাটার ক্ষেত্রে উৎসে ভ্যাট না কেটে ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ পায় রংপুর ভ্যাট কমিশনারেট। এরই প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটির ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত নিরীক্ষা করা সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। দুই ধাপে নিরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত এবং ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত নিরীক্ষা করা হয়। যাতে দুইটি পৃথক প্রতিবেদন দেওয়া হয়।
প্রথম প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটির ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত চার বছরের নিরীক্ষা করা হয়। এতে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি ৩১১ কোটি ৪০ লাখ ৪০ হাজার ৯০০ টাকা পণ্য বিক্রির তথ্য গোপন করেছে। যাতে ভ্যাট ফাঁকির পরিমাণ ৪০ কোটি ৬১ লাখ ৭৯ হাজার ২৪৭ টাকা। আহমেদ উড একটি লিমিটেড কোম্পানি। ভ্যাট আইন ও এনবিআরের আদেশ অনুযায়ী, লিমিটেড প্রতিষ্ঠান হিসেবে আহমেদ উড একটি উৎসে ভ্যাট কর্তনকারী সত্ত্বা। প্রতিষ্ঠানটি ২৩৯ কোটি ৭৮ লাখ ১১ হাজার ৪৯২ টাকার উপকরণ ক্রয় করলেও তা দেখানো হয়নি এবং তাতে কোন উৎসে কর্তন করেনি। যাতে ১৭ কোটি ৯৮ লাখ ৩৫ হাজার ৮৬১ টাকা উৎসে ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি ৮ কোটি ৫৪ লাখ ৯২ হাজার ৮৭ টাকা সেবা গ্রহণ করলেও তাতে উৎসে মূসক কর্তন করা হয়নি। যাতে প্রতিষ্ঠানটি ৭৪ লাখ ৪৮ হাজার ৮২৩ টাকা উৎসে ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। আবার প্রতিষ্ঠানটি ৮৪ হাজার ৭৪২ টাকা অবৈধ রেয়াত ও ১০ লাখ ৩২ হাজার ২৪৬ টাকা দাখিলপত্রে অতিরিক্ত সমাপনী জের দেখিয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত জের নয়। এই চার বছরে প্রতিষ্ঠানটি মোট ৫৯ কোটি ৪৮ লাখ ৩৫ হাজার ১৫১ টাকা ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে।
সূত্রমতে, ফাঁকি দেওয়া এই ভ্যাট আদায়ে প্রতিষ্ঠানটি দাবিনামা সম্বলিত কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়। তবে প্রতিষ্ঠান জবাব না দিয়ে পুন:নিরীক্ষা করা এবং কমিটিতে প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিকে রাখার অনুরোধ করেন। এরই প্রেক্ষিতে কমিটি গঠন ও কমিটিতে প্রতিষ্ঠানের জেনারেল ম্যানেজার একেএম সাইফুল ইসলাম মন্টুকে রাখা হয়। কমিটি যাচাই শেষে প্রতিবেদন দেয়, তবে যাচাইয়েও কোন ভ্যাট কমেনি। ভ্যাট না কমায় প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি মন্টু সই করেনি। প্রতিষ্ঠানকে আবার দাবিনামা সম্বলিত কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়। প্রতিষ্ঠান জবাব দেয়। শুনানিতে প্রতিষ্ঠানের পক্ষে মূসক পরামর্শক মো. রেজাউল হাসান ও কর পরামর্শক শ্যামল চন্দ্র সরকার অংশ নেয়। চলতি বছরের ১৫ মার্চ শুনানিতে প্রতিষ্ঠানের পক্ষে মো. রেজাউল হাসান ও শ্যামল চন্দ্র সরকার বলেন, সিএ রিপোর্টে উল্লেখিত ভুট্টার বিক্রয়মূল্য বাদ দিয়ে এবং দাখিলপত্রের তথ্য যাচাই করে কর নির্ধারণের অনুরোধ করেন। তবে ভ্যাট কর্মকর্তারা দেখতে পান, প্রতিষ্ঠানের পণ্য তৈরি ও বিক্রির সঙ্গে ভুট্টার কোন সম্পর্ক নেই। কর্মকর্তাদের বিভ্রান্ত ও ভ্যাট ফাঁকি থেকে বাঁচতে প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা এই ধরনের তথ্য তুলে ধরেন। একইসঙ্গে ওই প্রতিনিধিরা ভ্যাট কর্মকর্তাদের বলেন, করনাকালীন সময়ে ব্যবসা পরিচালনা করার জন্য তারল্য সুবিধা বজায় রাখার জন্য বিক্রয় কম হওয়া সত্ত্বেও বেশি দেখানো হয়েছে। যদিও এই ধরনের তথ্যের কোন ভিত্তি পায়নি ভ্যাট কর্মকর্তারা। শুনানি, প্রতিষ্ঠানের জবাব ও অন্যান্য কাগজপত্র যাচাই শেষে সম্প্রতি রংপুর ভ্যাট কমিশনার বিচারাদেশ দেয়। যাতে ভ্যাট ফাঁকি প্রমাণিত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানকে ৫০ কোটি টাকা জরিমানা এবং ফাঁকি দেওয়া ভ্যাটের উপর ৪৩ কোটি ৫৬ লাখ ৪৭ হাজার ৫১ টাকা সুদ আরোপ করা হয়। ভ্যাট ফাঁকি, জরিমানা ও সুদসহ মোট ১৫৩ কোটি ৪ লাখ ৮২ হাজার ২০২ টাকা পরিশোধে চূড়ান্ত দাবিনামা জারি করা হয়।
অপর প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত নিরীক্ষা করা হয়। যাতে প্রতিষ্ঠানটির ৮ কোটি ৮২ লাখ ৫০ হাজার ১৭২ টাকার সেবা গ্রহণ করলেও ৬১ লাখ ৬৫ হাজার ৭০৭ টাকা উৎসে ভ্যাট কর্তন না করে ফাঁকি দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে আসে। এই ভ্যাট পরিশোধে দাবিনামা সম্বলিত কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়। প্রতিষ্ঠানের জবাব ও কাগজপত্র যাচাই শেষে ফাঁকি প্রমাণিত হওয়ায় ৬০ লাখ টাকা জরিমানা, ১ কোটি ১৪ লাখ ৬৮ হাজার ২১৫ টাকা সুদ আরোপ করে সম্প্রতি বিচারাদেশ দেয় রংপুর ভ্যাট কমিশনার। ফাঁকি দেওয়া ভ্যাট, জরিমানা ও সুদসহ মোট ২ কোটি ৩৬ লাখ ৩৩ হাজার ৯২২ টাকা পরিশোধে সম্প্রতি চূড়ান্ত দাবিনামা জারি করা হয়েছে।
এই বিষয়ে রংপুর ভ্যাট কমিশনারেটের একজন কর্মকর্তা বলেন, আহমেদ উড শুধু বিক্রয় তথ্য গোপন নয়, পণ্যের দাম অত্যন্ত কম ঘোষণা দিয়ে বেশি দামে বিক্রি করে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার অংশ হিসেবে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে আহমেদ উড গ্রুপের চেয়ারম্যানের আফতাব আহমেদ এর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি। জনি নামের প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে হলে তিনি পরে বক্তব্য দেবেন বলে ফোন কেটে দেন। পরে হোয়াটসঅ্যাপে বক্তব্যের বিষয় লিখে দিলে তিনি সিন করেন। কিন্তু কোন জবাব দেননি।
