খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছে কয়েকটি ব্যাংক। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছে বেসরকারি ব্যাংকগুলো। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, ন্যাশনাল ব্যাংক ও আইএফআইসি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি সবচেয়ে বেশি। একই সঙ্গে এসব ব্যাংকের মোট ঋণের তুলনায় খেলাপি ঋণের হারও বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রভিশন ঘাটতির কারণে ব্যাংকের মুনাফা ও মূলধনের ওপর চাপ তৈরি হয়, ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে এবং আর্থিক দুর্বলতার ঝুঁকি বাড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণে বড় ঘাটতি রয়েছে। এসব ব্যাংকের প্রয়োজনীয় প্রভিশনের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৬৫ হাজার ২০৪ কোটি টাকা। এর বিপরীতে সংরক্ষণ করা হয়েছে ২ লাখ ১৬ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা। ফলে মোট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা। প্রভিশন ঘাটতির দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। ব্যাংকটির ঘাটতি ৮২ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। এরপর ন্যাশনাল ব্যাংকের ২৩ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা, আইএফআইসি ব্যাংকের ২১ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ১১ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা এবং ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) ৫ হাজার ৫ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে। এ ছাড়া স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ২ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা এবং মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ২ হাজার ৯৫ কোটি টাকা প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে।
ব্যাংকগুলোতে প্রভিশন ঘাটতির প্রধান কারণ খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়া। কোনো ঋণ খেলাপি বা ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণিতে পড়লে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, এর বিপরীতে নির্দিষ্ট হারে প্রভিশন রাখতে হয়। খেলাপি ঋণ দ্রুত বাড়লে প্রয়োজনীয় প্রভিশনের পরিমাণও বেড়ে যায়। অন্যদিকে ব্যাংকের আয় ও মুনাফা কমে গেলে সেই অর্থ থেকে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে প্রয়োজনীয় প্রভিশনের তুলনায় সংরক্ষিত প্রভিশনের ঘাটতি তৈরি হয়। ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির, যার পরিমাণ ৯৮ হাজার ৯১৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এরপর আইএফআইসি ব্যাংকের ২৮ হাজার ৫২০ কোটি ৪২ লাখ টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংকের ২৮ হাজার ২৭৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং প্রিমিয়ার ব্যাংকের ১১ হাজার ৭৫৪ কোটি ৭ লাখ টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে। ইউসিবির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১০ হাজার ৬৪৮ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।
এ ছাড়া স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৪ হাজার ৯২৯ কোটি ৪২ লাখ টাকা, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ৪ হাজার ৩৭৬ কোটি ৯৮ লাখ টাকা, এনআরবিসি ব্যাংকের ৩ হাজার ২১৮ কোটি ৭৮ লাখ টাকা, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের ২ হাজার ৮৫২ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ১ হাজার ৬১৬ কোটি ২৩ লাখ টাকা। এনআরবি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫৮৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর প্রভিশন ঘাটতিতে শীর্ষে থাকা ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ও ন্যাশনাল ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংক স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দিয়েছিল। তবে স্বতন্ত্র পরিচালকদের কেউ কেউ বিভিন্ন অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক নিরীক্ষায়ও এ ধরনের চিত্র উঠে এসেছে। ফলে এসব ব্যাংকের ঘুরে দাঁড়ানোর বদলে সংকট আরও বাড়ছে। ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতি ও খেলাপি ঋণের পরিমাণেও এর প্রতিফলন দেখা যায়।
প্রভিশন ঘাটতিতে রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ ব্যাংক
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতির চিত্র আরও নেতিবাচক। ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রয়োজনীয় মোট প্রভিশনের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩ হাজার ৩৫৯ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ব্যাংকগুলো সংরক্ষণ করেছে ২৮ হাজার ৭২৫ কোটি ২০ লাখ টাকা। ফলে মোট প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭৪ হাজার ৬৩৪ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে জনতা ব্যাংক পিএলসির। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭৫ হাজার ৭২৮ কোটি ৯১ লাখ টাকা। এর বিপরীতে প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে ৫০ হাজার ১৬০ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।
এরপর অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৩২ হাজার ১৩৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা এবং প্রভিশন ঘাটতি ১২ হাজার ৩৩৭ কোটি ৮১ লাখ টাকা। রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১৯ হাজার ৭৯০ কোটি ৫১ লাখ টাকা এবং প্রভিশন ঘাটতি ১০ হাজার ৭৫৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। এ ছাড়া বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৮ হাজার ১৫২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা এবং প্রভিশন ঘাটতি ৫ হাজার ৪৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা। বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (বিডিবিএল) খেলাপি ঋণ ৯৪৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকা এবং প্রভিশন ঘাটতি ৩২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।
বেসরকারি ১১ ব্যাংকের প্রভিশন উদ্বৃত্ত
রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে একমাত্র সোনালী ব্যাংক পিএলসির প্রভিশন উদ্বৃত্ত রয়েছে। ব্যাংকটির প্রয়োজনীয় প্রভিশনের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ১৩৬ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ১৩ হাজার ৮৩৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকা সংরক্ষণ করা হয়েছে। ফলে ব্যাংকটির প্রভিশন উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৬৯৭ কোটি ৯১ লাখ টাকা। অন্যদিকে, বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে ১১টির প্রভিশন উদ্বৃত্ত রয়েছে। এসব ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্বৃত্ত রয়েছে পূবালী ব্যাংকের। ব্যাংকটির প্রয়োজনীয় প্রভিশনের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২৩৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা, বিপরীতে সংরক্ষণ করা হয়েছে ৩ হাজার ৪৭৬ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। ফলে ব্যাংকটির প্রভিশন উদ্বৃত্ত রয়েছে ১ হাজার ২৪১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।
এরপর রয়েছে উত্তরা ব্যাংক। ব্যাংকটির প্রভিশন উদ্বৃত্ত ৪১৫ কোটি ৬২ লাখ টাকা। সিটি ব্যাংকের উদ্বৃত্ত ৩০৪ কোটি ৩ লাখ টাকা, প্রাইম ব্যাংকের ১৬১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা এবং ব্র্যাক ব্যাংকের ১৪১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের প্রভিশন উদ্বৃত্ত ১০০ কোটি ৪১ লাখ টাকা এবং সাউথইস্ট ব্যাংকের ৮৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা। এ ছাড়া আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের প্রভিশন উদ্বৃত্ত ১৬ কোটি ৭৬ লাখ টাকা, সিটিজেন্স ব্যাংকের ৯৪ লাখ টাকা এবং কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশের ১৫ লাখ টাকা। সবচেয়ে কম উদ্বৃত্ত রয়েছে মধুমতি ব্যাংকের, মাত্র ৩ লাখ টাকা। ব্যাংকটির প্রয়োজনীয় প্রভিশনের পরিমাণ ছিল ৩২৯ কোটি ১৭ লাখ টাকা। বিপরীতে সংরক্ষণ করা হয়েছে ৩২৯ কোটি ২০ লাখ টাকা।
