কমার্স ব্যাংকের ১৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থার নির্দেশ

আপ্যায়ন ব্যয় দেখিয়ে ৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ

বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে আমানত সংগ্রহের নামে ৪ কোটি টাকা ‘আপ্যায়ন ব্যয়’ দেখিয়ে আত্মসাতের প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ঘটনায় দুই কর্মকর্তাকে বরখাস্তসহ মোট ১৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত ২৫ আগস্ট ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বরাবর পাঠানো চিঠিতে এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে এক মাসের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করতে বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে দেখা গেছে, বিধিবহির্ভূতভাবে উত্তোলন করা ৪ কোটি টাকা প্রথমে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের আটজন, প্রিন্সিপাল শাখার চারজন ও দিলকুশা শাখার একজনসহ মোট ১৩ কর্মকর্তার হিসাবে ‘প্রণোদনা’ হিসেবে জমা দেওয়া হয়। পরে ১৪টি চেকের মাধ্যমে পুরো অর্থ নগদে তুলে নেওয়া হয়। বরখাস্তের নির্দেশ পাওয়া দুই কর্মকর্তা হলেন ব্যাংকের এসইভিপি দেলোয়ার হোসেন ও এসপিও হামিদুর রহমান। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাদের মাধ্যমেই ৪ কোটি টাকা নগদে উত্তোলন করা হয়।

অন্য ১১ কর্মকর্তা হলেন—এফএভিপি ইউসুফ সিদ্দিক উল্ল্যাহ, এভিপি সালেহ আমদেদ, অফিসার সরোয়ার, এফএভিপি সুজন দাস, এভিপি তাসনুবা মজুমদার, এভিপি আহসান হাবিব, পিও আদনান আশ শফিক, এফএভিপি মনিরুল হক, এসও রিফাতুল মুরসালিন, অফিসার সাইফুর রহমান ও এসও শাহিনুর রহমান। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট আমানতের অর্থ ফেরত আনা এবং ব্যাংক ব্যবস্থাপনার দায় নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতেও নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের এমডি মো. ওবায়দুল হক বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এক মাস সময় দিয়েছে। আমরা প্রক্রিয়ার মধ্যে আছি। তিনি বলেন, আসলে খুবই কম সুদে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের আমানত রাখা হয়েছে। কর্মকর্তারা যে অর্থ পেয়েছেন, তা প্রণোদনা হিসেবেই পেয়েছেন। আমাদের বোর্ডের এমন প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়ে সিদ্ধান্তগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকে লিখিত বক্তব্যের মাধ্যমে পাঠাব।

আমানত আনতে ৪ কোটি টাকা ‘আপ্যায়ন ব্যয়’

বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে জানা গেছে, গাজীপুর সিটি করপোরেশন বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে মাত্র আড়াই শতাংশ সুদে ১০০ কোটি টাকা আমানত রেখেছে। এর আগে অন্য একটি ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে ওই টাকা কমার্স ব্যাংকে রাখা হয়। এই আমানত সংগ্রহের বিপরীতে ৪ কোটি টাকা ‘আপ্যায়ন ব্যয়’ দেখিয়েছে ব্যাংকটি। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূলত সিটি করপোরেশনের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ঘুষ দিতে এই অর্থ ব্যবহার করা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ ও গাড়িচালকের মৌখিক সাক্ষাৎকার পর্যালোচনা করে তদন্তকারীরা দেখতে পান, গত ৭ জুন ব্যাংকের গাড়িতে করে বস্তায় ভরে ৩ কোটি ৪ লাখ টাকা রাজধানীর উত্তরা ক্লাবে নেওয়া হয়। পরদিন গুলশান ক্লাবে নেওয়া হয় আরও ৯৬ লাখ টাকা।

তদন্ত অনুযায়ী, এই ৪ কোটি টাকা ব্যাংক থেকে বের করতে ১৩ কর্মকর্তার হিসাব ব্যবহার করা হয়। প্রথমে তাদের হিসাবে বিভিন্ন অঙ্কের অর্থ ‘প্রণোদনা’ হিসেবে জমা দেওয়া হয়। গত ৪ জুন অফিস সময় শেষে সন্ধ্যা ৭টার দিকে অর্থ জমা দেওয়ার পর ৭ জুন প্রিন্সিপাল শাখা থেকে তা নগদে তুলে নেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে এ ধরনের অর্থ উত্তোলনকে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্তে আরও বলা হয়েছে, টাকা জমা দেওয়ার আগে ব্যাংকের এমডির ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হামিদুর রহমান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানান। তাদের কাছ থেকে আগেই স্বাক্ষর করা চেক সংগ্রহ করা হয়েছিল। হামিদুর রহমানের হিসাবেও টাকা জমা ও উত্তোলনের রেকর্ড পাওয়া গেছে। গাজীপুর সিটি করপোরেশন থেকে কম সুদে ১০০ কোটি টাকা আমানত আনতে ‘আপ্যায়ন’ বাবদ ৪ কোটি টাকা ব্যয়ের বিষয়টি ব্যাংকের এমডি মো. ওবায়দুল হক নিজেই একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে তুলে ধরেন। পরে পরিচালনা পর্ষদ এতে অনুমোদন দেয়। ওই প্রতিবেদনে এভাবে আমানত সংগ্রহকে ব্যাংকের সাফল্য হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।

মেয়াদ শেষের পরও ‘উজ্জীবন’ ক্যাম্পেইনে ব্যয়

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে আরও দেখা গেছে, ‘উজ্জীবন আমানত ক্যাম্পেইন’-এর মেয়াদ ১৪ মে ২০২৬ শেষ হলেও পরে পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়াই এই ক্যাম্পেইনের আওতায় ৪ কোটি টাকা প্রণোদনা হিসেবে ব্যয় করা হয়। প্রতিবেদনে এসইভিপি দেলোয়ার হোসেনের আগের কর্মস্থলের বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে। তিনি এর আগে এনআরবিসি ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন এবং গুরুতর আর্থিক অনিয়মের দায়ে চাকরিচ্যুত হন।

তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১-এ ৭৪ কোটি ৩৩ হাজার ৮০৪ টাকা আত্মসাৎ এবং ৭ লাখ ৩ হাজার ৯৫ মার্কিন ডলার মূল্যের রপ্তানি পণ্যের অর্থ দেশে ফেরত না আনার অভিযোগে মামলা চলমান রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের এক নিরীক্ষায় তার বিরুদ্ধে বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচারের অভিযোগও উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক গত ২৮ জুন এনআরবিসি ব্যাংক থেকে বরখাস্ত হওয়া দেলোয়ার হোসেনকে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক থেকেও বরখাস্তের নির্দেশ দেয়। তবে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তা বাস্তবায়ন করেনি। বর্তমানে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মো. ওবায়দুল হক। ব্যাংকটির চেয়ারম্যানও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আতাউর রহমান।

** ১০০ কোটি আমানতে ৪ কোটি টাকা ‘আপ্যায়ন ব্যয়’