রাজস্ব খাতে সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশ ঋণনির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে রাজস্ব সম্মেলন-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। আমির খসরু বলেন, রাজস্ব ব্যবস্থাকে আধুনিক, ‘ক্যাশলেস’ ও ‘কন্টাক্ট-ফ্রি’ করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার সংস্কার করছে।
আজকের এই সম্মেলন থেকে আমরা এই বার্তা নিয়ে যেতে চাই যে বাংলাদেশ এখন আর ঋণের উপর নির্ভরশীল দেশ থাকবে না। এটি এখন তার নিজস্ব অর্থায়নে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে ইনশাআল্লাহ। রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যের কথা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমাদের ৬ লক্ষ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরেছে। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আমির খসরু বলেন, ২০২৯ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশের সারিতে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ এবং ২০৩৪ সালে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গঠনের লক্ষ্য অর্জনে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়াতে হবে।
ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের উদ্দেশে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের ‘অর্থনীতির চালিকাশক্তি’ হিসেবে তাদের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করার আহ্বান জানান তিনি। মন্ত্রী বলেন, আমি আশা করব আপনারা সরকারের এই রাজস্ব লক্ষ্য অর্জনে সহযোগিতা করবেন। এটা কর কর্মকর্তাদের একার দায়িত্ব না। এটা ব্যবসায়ীদেরও দায়িত্ব আছে এখানে। সময়মতো কর ও ভ্যাট পরিশোধ করতে হবে। করদাতাদের প্রশাসনিক জটিলতা ও কর্মকর্তাদের আচরণ নিয়ে অভিযোগের কথা স্বীকার করে আমির খসরু বলেন, এসব সমস্যার দ্রুত সমাধানে সরকার কাজ করছে। এরপরেও যারা রাজস্ব পরিহারের সংস্কৃতিতে থাকতে চাইবেন, তাদের জন্য আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। যেন সৎ করদাতারা নিরুৎসাহিত না হন এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বিনষ্ট না হয়।
করদাতার পাশাপাশি রাজস্ব কর্মকর্তাদেরও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার ওপর জোর দেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, করদাতার যেমন আইন মেনে কর দেওয়ার দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি রাজস্ব কর্মকর্তারও আইন মেনে নিরপেক্ষভাবে সম্মানের সঙ্গে করদাতাকে সেবা দেওয়ার দায়িত্ব রয়েছে। পাশাপাশি আমাদের অ্যাকাউন্টেবিলিটি মেকানিজমও শক্তিশালী করতে হবে। একজন সৎ করদাতাকে হয়রানি করা এবং একজন অসৎ করদাতাকে অন্যায় সুবিধা দেওয়া—দুটি সমানভাবে অগ্রহণযোগ্য। রাজস্ব সংস্কারে উন্নয়ন অংশীদার, অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন আমির খসরু। তিনি বলেন, সংস্কার প্রক্রিয়ায় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং উন্নয়ন অংশীদারদের পরামর্শ ও সমালোচনা সংস্কারকে সমৃদ্ধ করছে।
রাজস্ব প্রশাসনের কাঠামোগত সংস্কারের কথা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কার্যক্রমকে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার পৃথক কাঠামোয় নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা আমাদের রাজস্ব প্রশাসনের সমগ্র স্থাপত্যে যুগান্তকারী সংস্কার হাতে নিয়েছি। আপনারা সকলেই জানেন, আমরা পুরাতন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) দুটি স্বতন্ত্র ও স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এর একটি হবে রাজস্ব নীতি বিভাগ এবং অন্যটি রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ। ২০২৫ সালে রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার কাজ আলাদা করতে এই কাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। আমির খসরু বলেন, রাজস্ব নীতি বিভাগ বিশেষজ্ঞ সংস্থা হিসেবে একটি সুষম, প্রতিযোগিতামূলক ও উন্নয়নবান্ধব কর কাঠামো তৈরিতে কাজ করবে। আর রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ রাজস্ব আহরণ, আইনের প্রয়োগ ও কর প্রশাসনের বাস্তবায়নমূলক দায়িত্ব পালন করবে। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস নয়। এটি আমাদের দর্শনের একটি মৌলিক পরিবর্তন, বলেন তিনি। করনীতি প্রণয়নে সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি অর্থনীতিবিদ, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, গবেষক, শিল্প ও বাণিজ্য সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার কথাও বলেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, যে নীতি বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন, তা কখনো কার্যকর হতে পারে না।
করজাল সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আমির খসরু বলেন, মাঠপর্যায়ে আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমসের কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন করদাতা চিহ্নিত করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত করদাতারা যাতে সঠিকভাবে কর দিতে পারেন, সেই পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে। কর অব্যাহতি ধীরে ধীরে কমানোর পক্ষে অবস্থান জানিয়ে তিনি বলেন, শিল্পায়নের প্রাথমিক পর্যায়ে কর অব্যাহতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও শিল্প খাত এখন পরিণত হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে। আমাদের ধীরে ধীরে এই অব্যাহতি কমাতে হবে। এটি শুধুমাত্র আমাদের রাজস্ব বাড়াবে না, বরং ব্যবসার জন্য একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড সৃষ্টি করবে। বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতির স্থিতিশীলতা যে জরুরি, তা স্বীকার করে মন্ত্রী বলেন, সরকার ব্যবসার পথে বাধা না হয়ে প্রবৃদ্ধিসহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে চায়।
এনবিআরকে শুধু রাজস্ব আদায়কারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে না দেখে ‘ব্যবসায়ীদের আর্থিক যাত্রার অংশীদার’ হিসেবে কাজ করার আহ্বান জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, রাজস্ব বোর্ড এখন কেবল রাজস্ব আদায়কারী প্রতিষ্ঠান নয়। আপনারা একজন ব্যবসায়ীর আর্থিক যাত্রার সঙ্গী। আপনাদের কর্মকাণ্ডে করদাতারা যেন কর দিয়ে গর্ববোধ করেন এবং সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সরাসরি অংশীদার হিসেবে নিজেদের মনে করেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিবের সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর অনলাইনে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এ সম্মেলনের উদ্বোধন করেন। পরে তিনি বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন।
